বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ দেশে সব সময়ই দুর্বলের ওপর ক্ষমতার ‘ভার’ বেশি অনুভূত হয়। বগুড়ার ঘটনা তার চাক্ষুষ সাক্ষী। ছাগলের মালিক সাহারা বেগমের ভাষ্য, বাগানের ফুলগাছ খেয়ে ফেলার অভিযোগে ইউএনও সীমা শারমিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে জরিমানা করা হয়।

আর ইউএনও সীমা শারমিন প্রাথমিকভাবে বলেন, ‘ফুলগাছ খাওয়ায় জন-উপদ্রব আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনেকবার ছাগলের মালিককে ডেকেছি, কিন্তু তিনি আমার কাছে আসেননি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট আইনে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।’

এবার ‘অনুপস্থিতি’ ও অনেকবার ডাকার পরও ছাগলের মালিকের না আসার বিষয়টিকে মেলাতে পারেন। একটি বিষয় স্পষ্ট যে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ছাগলের ফুলগাছ খেয়ে ফেলার অপরাধের সুরাহা করার সময় মালিকের বিষয়ে খোঁজখবর একটু কমই করা হয়েছে। ছাগল যেহেতু মানুষের ভাষায় আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারবে না, তাই তার মালিককে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। নইলে বিচারের বিষয়টি একতরফা হয়ে যায়।

জরিমানা পরিশোধের বাস্তবতা সাহারা বেগমের না থাকাতেই কিন্তু পরে ইউএনও-কেই জরিমানা পরিশোধ করতে হয়েছে, ছাগল ফিরিয়েও দিতে হয়েছে। ইউএনও সীমা শারমিনের দাবি, জরিমানার টাকা আদায়ের জন্য সাহারাকে বারবার ডাকা হলেও তিনি আসেননি। বাধ্য হয়ে সংশোধনের জন্য অর্থদণ্ড করেছিলেন, তাঁকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। তিনি এ-ও বলেছেন, ‘পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ছাগলের মালিক অসহায়, জরিমানার অর্থ শোধ দেওয়ার মতো তাঁর সামর্থ্য নেই।’

অর্থাৎ খোঁজখবরটা বিচার করার সময় বা আগে করা হয়নি। মানবিক দিক বিবেচনা করা হয়েছে, তবে অর্থদণ্ড দেওয়ার পর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যতই বলুন না কেন, শাস্তি দেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, আইনের ভাষায় অর্থদণ্ডও এক ধরনের শাস্তিই। আর সংশোধন করার আরও নানা উপায় বের করা যায়। তার জন্য ছাগল খোঁয়াড়ে না দিয়ে অন্যের জিম্মায় আটকে রাখার কি খুব প্রয়োজন ছিল?

ক্ষমতার মাহাত্ম্য এই যে তা প্রদর্শনে ব্যাপক আত্মতুষ্টি মেলে। এর আগে মাস্ক না পরায় ভরা হাটে বয়স্ক ব্যক্তিকে কান ধরে ওঠবস করানোর ছবিও আমরা দেখেছি। উদাহরণ দিতে গেলে এমন ঘটনা আরও মিলবে। সাধারণ মানুষকে হয়রানির মধ্য দিয়ে ক্ষমতার চর্চাটি হচ্ছে কি না, সেটির পর্যালোচনা এখন খুবই প্রয়োজন। নইলে হয়তো অচিরেই সামন্তবাদী একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার গলায় মালা পরাতে বাধ্য হতে হবে।

default-image

এ দেশে ছাগলের জন-উপদ্রব কতটুকু গুরুতর অপরাধ—সেই প্রশ্ন ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি প্রসঙ্গ ওঠে, যেসব ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি গুরুতর জন-উপদ্রব সৃষ্টি করে থাকেন, তাঁদের বেলায় যথাযথ কর্তৃপক্ষ আসলে কতটা সরব? এই যেমন ৯টি গভীর নলকূপ বসানোর জন্য শতকোটিরও বেশি টাকা খরচ করার প্রস্তাব। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, ‘আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্ন্যান্স’ নামের একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের ৩টি পৌরসভায় মাত্র ৯টি গভীর নলকূপ বসানো ও সেগুলো থেকে পানি সরবরাহে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। ‘অনুমাননির্ভর’ এই খরচ দেখিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এতে একেকটি গভীর নলকূপের পেছনে ব্যয় পড়ছে ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি এ রকম খরচের প্রস্তাবকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করেছে।

অথচ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যদি ভূ-উপরিভাগের পানি পরিশোধন প্ল্যান্ট নির্মাণ করে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়, সে ক্ষেত্রে মোট খরচ পড়বে ৭ থেকে ১০ কোটি টাকা। আর যদি গভীর নলকূপ বসিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূগর্ভের পানি কয়েক শ মানুষের মধ্যে বিতরণের প্রকল্প নেওয়া হয়, তাতে সব মিলিয়ে খরচ পড়বে ৫০ লাখ টাকার মতো। এ ছাড়া তিন সিটি করপোরেশন ও একটি পৌরসভায় মোট ছয় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য এলজিইডি খরচ ধরেছে ১৯৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে খরচ পড়বে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই খরচকে ‘অত্যধিক’ আখ্যায়িত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

একটি বিষয় স্পষ্ট যে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বেশ আকাশ-কুসুম কল্পনা বা তাদের ভাষায় ‘অনুমান’ করেছে। অবশ্যই সেই অনুমানের ভিত্তি সরকারের অর্থ। সেই উৎস অবশ্যই অপরিসীম নয়। তা নিয়ে এত অনুমান করার কী প্রয়োজন ছিল? একটু পরিকল্পিত প্রস্তাব বানিয়ে কি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো যেত না? তাহলে অন্তত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবলীলায় করা হেলাফেলাটা চোখের জন্য পীড়াদায়ক হতো না।

সরকারি কর্তৃপক্ষের এ ধরনের কর্মকাণ্ডও জনমনে বেশ উপদ্রব তৈরি করে। যতই বলা হোক, এটি স্রেফ ‘প্রস্তাব’—তারপরও তা কিন্তু চূড়ান্ত করার জন্য বিবেচনা করতেই জমা দেওয়া হয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতাও যেহেতু ভালো নয়, তাই মনে আশঙ্কা হতেই পারে যে—সরকারের টাকাগুলো দিয়ে কী যে হচ্ছে! এক ধরনের উদ্বেগ ও তারপর হতাশা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু এহেন জন-উপদ্রব নিয়ে কি কখনো বিচার বসেছে? কোনো ধরনের দণ্ড বা শাস্তি হয়েছে?

যদি এ ধরনের উপদ্রবকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিষ্কলুষ’ ঘোষণা করার পরিকল্পনা থাকে, তবে তা দ্রুতই করে ফেলা উচিত। নইলে নাগরিকের মনে অযথাই ‘উপদ্রব’ তৈরি হয়। আর সেটি করার পরিকল্পনা না থাকলে ছাগলের পাশাপাশি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মানুষদের সৃষ্ট জন-উপদ্রবেরও প্রতিবিধান করার অনুরোধ রইল। পরিশেষে আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার প্রয়োগ শক্তিমত্তা ভেদে সবার ওপর সমানরূপে বর্ষিত হোক!

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন