তারেকের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। বছর তিনেক ধরে তিনি কাভার্ড ভ্যান চালান। পরিবারে তাঁর তিন ভাই, দুই বোন ও মা-বাবা। কাভার্ড ভ্যান চালিয়ে ১৫ হাজার টাকার মতো পেতেন। নিজের খরচ বাদ দিয়ে মা–বাবার কাছে পাঠাতেন ৮-৯ হাজার টাকা।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বেঁচে ফেরা তারেক বিস্ফোরণের মুহূর্তের বর্ণনা দেন। বলেন, ৪ জুন বিস্ফোরণের সময় তিনি কর্মরত অবস্থায় ডিপোতে ছিলেন। কেমিক্যালভর্তি কনটেইনার থেকে বেশি দূরে ছিলেন না তিনি। হঠাৎ সেখানে আগুন দেখতে পান। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরণ ঘটে।

তারেক বলেন, বিস্ফোরণের পর ছিটকে পড়ে যান। তাঁর পেট, হাত ও পা জখম হয়। আগুন ধরে যায় শরীরের বিভিন্ন অংশে। পরে অচেতন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন থেকে হাসপাতালে দিন কাটছে তাঁর।

হাসপাতালে তারেকের বিছানার পাশে বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বড় ভাই ওমর ফারুক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই যে বেঁচে ফিরেছেন, এটাই বেশি। ঘটনাস্থলে ভাইয়ের সঙ্গে থাকা কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবরে দেখেছেন। সে হিসেবে তাঁর ভাই নতুন জীবন পেলেন।

সীতাকুণ্ডে অগ্নিকাণ্ড থেকে সৃষ্ট এই কেমিক্যাল বিস্ফোরণের পর আহত ব্যক্তিদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। একে একে ৪৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আজ নাগাদ এখন এই হাসপাতালে ১৩ জন ভর্তি আছেন। তাঁদের মধ্যে চক্ষু বিভাগে সাতজন, সার্জারিতে একজন, অর্থোপেডিকে দুজন ও বার্ন ইউনিটে তিনজন।
তারেক আছেন বার্ন ইউনিটে। তাঁর বিছানার পাশেই শোয়া দগ্ধ মো. আমিরুল ইসলাম (৩৩)। তিনি বিএম কনটেইনার ডিপোর রিসিভার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিস্ফোরণে তাঁর নিতম্ব পুড়ে সেখানে বেশ ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া হাত, পা, পিঠ ও চোখ জখম হয়।

আমিরুল জানালেন, পরিবারে তাঁর দুই মেয়ে। একজনের বয়স ছয় বছর, আরেকজনের মাত্র ২২ মাস। সবাই গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে থাকেন। তাঁর একার আয়েই চলে পরিবার। সংসারে টানাপোড়েন। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।
কথা বলতে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠেন আমিরুল। বলেন, ডিপোতে খেটে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতন পেতেন। এর মধ্যে বিস্ফোরণে আহত হলেন। এখন সামনের দিনগুলোতে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তিনি দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

বার্ন ইউনিটে আছেন অর্পণ কর (২৫) নামে ডিপোর আইসিডি বিভাগের তত্ত্বাবধায়কও। তিন বছর ধরে তিনি ডিপোতে কর্মরত। বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। তাঁর কোমর, হাত, পা ও পিঠ পুড়ে গেছে। চোখেও সমস্যা হয়েছিল। চোখের যন্ত্রণা কমে এসেছে। তবে পোড়ার ক্ষত এখনো শুকায়নি।

অর্পণ প্রথম আলোকে বলেন, ৪ জুন ছিল এক ভয়াবহ রাত। ডিপোতে যে যার কাজে ব্যস্ত। এর মধ্যেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। থেমে যায় সবকিছু। তাঁকে অচেতন অবস্থায় লোকজন হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এখন কিছুটা সেরে উঠেছেন। তবে আরও কত দিন থাকতে হবে, তা জানেন না। অর্পণ জানেন না, কবে কাজে ফিরতে পারবেন।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রাজীব পালিত বলেন, হাসপাতালে ভর্তি ১৩ জনের কারও চোখে সমস্যা আবার কারও কাটা–ছেঁড়া ও পোড়া-ক্ষতের সমস্যা আছে। তাঁদের কবে নাগাদ ছাড়পত্র দেওয়া হবে, রোগীর অবস্থা দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন