শহরে এক টুকরা আলোর উৎস

বিকেল হলেই পাঠকাতর পড়ুয়ারা ছুটে আসেন পাঠাগারটিতে। কেউ খুঁজে পছন্দের বইটি পড়েন। কেউ বাসাবাড়িতে নিয়ে যান। কেউ পড়েন পত্রপত্রিকা। কেউ গবেষণা, অনুসন্ধানের তথ্য খোঁজেন বইয়ের পাতায়।

শিল্প-সংস্কৃতির এক টুকরা স্নিগ্ধ পরিবেশ সব সময় বিরাজ করে মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতেছবি: প্রথম আলো

একসময় টিনের বাংলো ধাঁচের ঘরটি এখন একতলা পাকা দালান। তাতে হয়তো আদল পাল্টেছে, কিন্তু ভেতরটা সেই আলোর বাতিঘর হয়েই আছে। একাধিকবার এই বাতিঘর দুর্যোগ, দুর্বিপাকে পড়েছে। নানা সংকটে আলো নিবু নিবু করেছে। কিন্তু কখনোই নিভে যায়নি। বরং শহরের বুকে টিকে আছে এক টুকরা আলোর উৎস হয়ে।

পড়ুয়াদের কাছে ভালো লাগার প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরি। সাহিত্যানুরাগী, পাঠক, শিল্প-সংস্কৃতির মানুষ এবং জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত উদ্যোগ, চেষ্টায় আলোর উৎসটি জেগেই আছে।

গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৬ সালে সাহিত্যানুরাগী সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতির মানুষ মিলে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। সেই থেকে মূল্যবান গ্রন্থের সমাবেশ ঘটতে থাকে। পাঠাগারটির অবস্থানও শহরের প্রায় মধ্যখানে। স্থানটিও মনোরম। পুরোনো কিছু গাছপালা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ছায়াসুনিবিড় পরিবেশটি এখনো বজায় আছে। পাঠাগারটির সামনের গোলপুকুর সে–ও এক আলাদা সৌন্দর্যের উপাদান। জেলা পরিষদের অঙ্গনে মর্যাদার একটি স্থান হয়ে আছে এই পাঠাগার।

প্রতিষ্ঠার দেড় দশকের মাথায়ই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে গ্রন্থাগারটি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রন্থাগার তছনছ করে ফেলে। সব দুর্লভ, প্রাচীন, মূল্যবান গ্রন্থ হারিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শেষে আবার পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করা হয়েছে বইয়ে বইয়ে। অনেক ধরনের বইয়ে পাঠাগারটি পাঠকের পাঠতৃষ্ণা মেটানোর মতো যোগ্য হয়ে ওঠ। সে রকম সময়ে আবারও দুর্যোগ। ১৯৮৪ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদের প্রলয়ংকরী বন্যায় পুরো শহরই তলিয়ে যায়। বাদ যায়নি পাবলিক লাইব্রেরিও। তিলতিল করে সমৃদ্ধ হওয়া বইয়ের জগৎ বানের জলে আবারও নষ্ট হয়েছে। পুরোনো মুদ্রণ ও নিউজ প্রিন্ট বইয়ের কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পাঠাগারটি বই হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। কিন্তু পাঠাগারটি পথ হারায়নি। আবারও স্থানীয় সাহিত্যানুরাগীরা এগিয়ে আসেন। সবকিছু প্রায় নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। বাড়তে থাকে বইয়ের সমাবেশ। গল্প-উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, ইতিহাস, আত্মজীবনী, গবেষণাগ্রন্থ, সাহিত্য সাময়িকীসহ নানা ধরনের বইয়ে ভরে ওঠে আলোঘরের অন্তরাত্মা। পড়ুয়াদের চাহিদা পূরণে পাঠাগারটি পালন করতে থাকে তার দায়।

বিকেল হলেই পাঠকাতর পড়ুয়ারা ছুটে আসেন পাঠাগারটিতে। কেউ খুঁজে পছন্দের বইটি পড়েন। কেউ বাসাবাড়িতে নিয়ে যান। কেউ পড়েন পত্রপত্রিকা। কেউ গবেষণা, অনুসন্ধানের তথ্য খোঁজেন বইয়ের পাতায়। পাঠাগারটির সৈয়দ মুজতবা আলী মিলনায়তনে মাঝেমধ্যেই বসে সাহিত্যের নানা রকম আড্ডা। কখনো নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। কখনো কোনো লেখকের জন্ম-মৃত্যুদিন পালন। শিল্প-সংস্কৃতির এক টুকরা স্নিগ্ধ পরিবেশ এখানে সব সময়ই ছড়ানো থাকে।

এই দীর্ঘ সময়ে হাজারো পাঠকের মননকে সমৃদ্ধ করেছে এই পাঠাগার। এটা অনুমান করা যায় পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক শোভাময় রায় সজলের কথা থেকেও। মানুষটি পাঠাগারটির অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন সেই ১৯৮১ সাল থেকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক পুরোনো পাঠক এসে যখন বলেন এই লাইব্রেরি আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে, এরা এই লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করে নিজেদের সামনে চলার পথ খুঁজে পেয়েছে; তখন খুবই ভালো লাগে। এখান থেকে কী পেলাম, পেলাম না। তার চেয়ে বড় কিছু হচ্ছে এই লাইব্রেরির কারণে অনেকেই বইয়ের সাথে যুক্ত থাকতে পারছে।’

সাহিত্যের ছোট কাগজ কোরাস সম্পাদক কবি মুজাহিদ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই লাইব্রেরির কাছে আমার অনেক ঋণ। অনেক উপকৃত হয়েছি আমি। প্রয়োজনীয় বই, কোনো তথ্য-উপাত্ত পেতে লাইব্রেরিতে ছুটে আসি। যদিও পাঠক এখন কমছে। তা সত্ত্বেও মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরির বিকল্প আর কিছু এখনো গড়ে ওঠেনি।’

শুরুতে পাঠাগারটি ছিল টিনের বাংলো ধাঁচের। ২০১০ সালে পুরোনো ঘর ভেঙে নতুন একতলা পাকা দালান তৈরি হয়েছে। তবে নতুন দালান হলেও কখনো কখনো নিবু নিবু হয়ে পড়ে বাতিঘরের সলতেটি। মনে হয় বুঝি নিভেই গেল। ২০১৯ সালে আর্থিক সংকটে পড়ে প্রায় পাঁচ মাস বন্ধ ছিল। কিন্তু এই দুর্যোগও স্থায়ী হতে পারেনি। শিল্প-সাহিত্যের নানা পর্যায়ের মানুষই নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা অনেকেই এগিয়ে আসেন। পাঠাগারটির দরজা খোলা রাখতে বৈঠকে বসেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এগিয়ে আসেন স্থানীয় সাংসদ নেছার আহমদ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান, পৌর মেয়র মো. ফজলুর রহমান, মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এম এ আহাদ, সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম, স্থানীয় ব্যবসায়ী সুমন আহমদ, সৈয়দ মুনিম আহমদসহ দেশ-বিদেশের আরও অনেকেই। এককালীন প্রায় চার লাখ টাকা সংগ্রহ করে পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। সচল হয়ে উঠেছে লাইব্রেরিটি।

তবে সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। গ্রন্থাগারিক শোভাময় রায় বলেন, আর্থিক সংকটে নতুন বই সংগ্রহ কমে গেছে। পাঠক এসে নতুন বই খোঁজে। বিভিন্ন ধরনের সাময়িকী দরকার। লাইব্রেরি পরিচালনার জন্য স্থায়ী একটি আয়ের উৎসও দরকার। ভবনটিকে ঊর্ধ্বমুখী তিনতলা করে মিলনায়তন করা গেলে সেখান থেকে স্থায়ী আয় হতে পারে। ভবনটিতে পানিরও ব্যবস্থা নেই।

সপ্তাহে বুধবার বন্ধ। অন্য ছয় দিন শীতকালে বিকেল তিনটা-সাতটা, গ্রীষ্মকালে বিকেল চারটা-আটটা পর্যন্ত লাইব্রেরিটি খোলা থাকে। কম করেও ১০-১২ জন পাঠক নিয়মিত থাকছেন। লাইব্রেরিতে আজীবন ৩৭৪, সাধারণ সদস্য ৩০ ও ছাত্র সদস্য আছেন ৫ জন। লাইব্রেরিটি চলছে এই সদস্যদের ফি, জেলা পরিষদ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এককালীন অনুদানে। সব ধরনের বই আছে ১২ হাজারের মতো। হাজারখানেক বই পুরোনো হয়ে গেছে। যা বাঁধাই করা প্রয়োজন। পত্রিকা নিয়মিত আছে ছয়টি। লাইব্রেরিতে বসে বইপড়া ছাড়াও সদস্যরা বাসাবাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। লাইব্রেরি পরিচালনার জন্য ৩০ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি আছে। পদাধিকারবলে এই কমিটির সভাপতি হচ্ছেন জেলা প্রশাসক। ব্যবস্থাপনায় একজন গ্রন্থাগারিক, একজন সহকারী গ্রন্থাগারিক ও একজন অফিস সহায়ক আছেন।

লাইব্রেরি পরিচালনা পর্ষদের সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক, প্রাবন্ধিক এবং সাহিত্যের ছোট কাগজ ফসল সম্পাদক মো. আবদুল খালিক। তিনি বলেন, প্রায় ৬৫ বছর ধরে এই পাবলিক লাইব্রেরি এ অঞ্চলে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ, জ্ঞানার্জন ও শিল্প-সংস্কৃতিকেন্দ্রিক বিনোদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একটা সময় ছাত্রছাত্রী, গৃহিণীসহ বয়স্ক মানুষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে বই আদান-প্রদান করেছেন। সময়ের ব্যবধানে আগের মতো গ্রন্থাগারকেন্দ্রিক পাঠাভ্যাস, বই আদান-প্রদান ও চর্চা অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু বইয়ের আকর্ষণ একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এখনো কিছু মানুষ লাইব্রেরিতে আসেন। পাঠাগার আন্দোলনে এই লাইব্রেরি বড় একটি উদাহরণ।