default-image

প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় বাংলাদেশের আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি ‘আমার আশা, শিগগিরই ঢাকায় আমাদের দেখা হবে’ বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। শহিদুল আলমের আটকের এক শ দিন উপলক্ষে অরুন্ধতী এই চিঠি দিয়েছেন। গতকাল ১৩ নভেম্বর মঙ্গলবার শহিদুল আলমের আটকের এক শ দিন হয়েছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে শহিদুল আলমকে গত ৫ আগস্ট রাতে তাঁর ধানমন্ডির বাসা থেকে তুলে নেয় ডিবি। ‘উসকানিমূলক মিথ্যা’ প্রচারের অভিযোগে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। গত ১২ আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে আছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাঁর জামিন আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট।

প্রতি, শহিদুল আলম, চম্পাকলি ২/৫, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ—সম্বোধন করে অরুন্ধতী লিখেছেন, “আপনাকে তুলে নেওয়ার ১০০ দিনেরও বেশি পার হয়ে গেল। আপনার বা আমার দেশে কঠিন সময় যাচ্ছে। তাই প্রথমে যখন শুনলাম অজ্ঞাত লোকেরা বাড়ি থেকে আপনাকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে, তখন সবচেয়ে খারাপ ভয়টাই পেয়েছিলাম। ...”
উদ্বিগ্ন অরুন্ধতী লিখেছেন, ‘আমি কি সত্যিই আপনাকে লিখছি? হয় তো না। যদি লিখতে পারতাম, ‘প্রিয় শহিদুল, আপনার কারা কুঠুরি যতই নিঃসঙ্গ হোক, জানবেন, আমাদের নজর আপনার ওপর আছে। আমাদের সজাগ চোখ আপনাকে খুঁজছে’, শুধু এটুকু ছাড়া বেশি কিছু বলার দরকার হতো না। ...‘সত্যিই যদি এই চিঠি পৌঁছাতে পারতাম, তাহলে আপনাকে বলার দরকার হতো না কয়েক দশক ধরে আপনার কাজে, আপনার আলোকচিত্রে এবং আপনার লেখায় আমাদের এ অঞ্চলের মানবতার বিশদ মানচিত্র খোদিত হয়ে আছে। আমাদের চেতনায় চিত্রিত হয়ে আছে সেই মানবতার যন্ত্রণা, ত্রাস ও বিধ্বস্ত দশা এবং এর নির্বুদ্ধিতা ও নির্দয়তা, এর তুমুল খ্যাপাটে জটিলতা। আপনার কর্ম যেমন ভালোবাসায় উদ্দীপ্ত ও জ্বলজ্বলে, তেমন তার মর্মে আছে সেসব ঘটনা উন্মোচনের ইচ্ছা এবং প্রত্যক্ষদর্শীর রাগ থেকে জন্মানো প্রশ্ন, যেসব ঘটেছে আপনারই সামনে। যারা আপনাকে কারাগারে বন্দী করে রেখেছে, তারা আপনার কাজের মূল্য সম্পর্কে পরিষ্কার না। আমরা শুধু আশা করতে পারি, নিজেদের খাতিরেই একদিন তারা হয়তো বুঝবে।’

অরুন্ধতী লিখেছেন, “আপনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এই যে আপনি (কথিত) ফেসবুক পোস্টে আপনার দেশের (সরকারের) সমালোচনা করেছেন। আপনাকে আটক করা হয়েছে কুখ্যাত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারায়। এই আইনে ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়’, তাহলে তার বিচার করতে পারবে।”

“এটা কেমন ধরনের আইন? এই উদ্ভট, বাছবিচারহীন, সব্বাইকে-নিশানা-করা, মাছ ধরার জালের মতো আইন? যে দেশটা নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, সেখানে এই আইনের কাজ কী? রাষ্ট্রের ‘সঠিক ভাবমূর্তি’ কী বা তা কী হওয়া উচিত, তা নির্ধারণের অধিকার কি একক কারও? বাংলাদেশের কি কেবল একটাই আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি আছে বা থাকবে? ৫৭ ধারা মোসাহেবি ছাড়া আর সব ধরনের কথাকে অপরাধ বানিয়ে ফেলতে পারে। এটা কেবল বুদ্ধিজীবীদের ওপরই আঘাত না, এটা বুদ্ধিবৃত্তির ওপর আঘাত।”

চিঠিতে ভারতের প্রসঙ্গ টেনে লেখক খোলা চিঠিতে লিখেছেন, “ভারতেও চিন্তার ওপর এ ধরনের আক্রমণ মেনে নেওয়ায় অভ্যস্ত করা হয়েছে। ভারতেও বাংলাদেশের আইসিটি অ্যাক্টের মতো আইনের বলে দফায় দফায় ছাত্রছাত্রী, প্রতিবাদকর্মী, আইনজীবী ও অধ্যাপকদের আটক করা হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে করা মামলার মতো তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাগুলোও ঠুনকো ও হাস্যকর। পুলিশ ভালো করেই জানে, উচ্চ আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খালাস দিতে পারেন। কিন্তু ওরা আশা করে, বছরের পর বছর কারাবন্দী থাকতে থাকতে আপনার মতো মানুষদের মনোবল ভেঙে পড়বে। ”

“তাই আপনার জন্য লেখা এই চিঠিতে আমার যোগ করতে ইচ্ছা করছে, প্রিয় সুধা, প্রিয় সাঁইবাবা, প্রিয় সুরেন্দ্র, প্রিয় সোমা, প্রিয় মহেশ, প্রিয় সুধীর, প্রিয় রোনা, প্রিয় অরুণ, প্রিয় ভার্নন এবং প্রিয় তারিক, প্রিয় আইজাজ, প্রিয় আমির, প্রিয় কোপা, প্রিয় কমলা, প্রিয় মাধবী, প্রিয় মাসে, প্রিয় রাজু এবং আরও শত শত প্রিয় নাম।”

ভারতের শাসকগোষ্ঠীর নমুনা তুলে ধরে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, “ভারতেও আমাদের শাসকেরা সেক্যুলারিজম ও সমাজতন্ত্রের সব নাম-নিশানা মুছে ফেলছে। শাসনকাজের ভয়াবহ ব্যর্থতা এবং ঘনীভূত হওয়া গণ-অসন্তোষ থেকে চোখ সরাতে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী (সরকার নয়, সরকারের মালিক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) সুপ্রিম কোর্টকে তোয়াজ ও হুমকি দিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের আদেশ আদায় করতে চাইছে। এভাবে প্রতিষ্ঠানের পর প্রতিষ্ঠান—আমাদের আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের বছরে রাজনীতিবিদদের ধর্মকর্ম তুঙ্গে ওঠা এক অদ্ভুত বিষয়।”

“এখানে, আমরাও পোড়ামাটি নির্বাচনের সাক্ষী হতে যাচ্ছি। তারা এখন মাছ ধরার জাল পাতবে, বিরোধীদের ধ্বংসের জন্য জুজুভয়ের ছায়ানৃত্য চালাবে।” ...“কপাল ভালো, আমরা ব্যাপক বহুমুখী জাতি। আমরা আমাদের বৈচিত্র্য এবং বহুমুখীনতা দিয়ে তাদের মোকাবিলা করব।”

সবশেষে আশাবাদী অরুন্ধতী লিখেছেন, “প্রিয় শহিদুল, আমার বিশ্বাস স্রোত ঘুরে যাবে। এটা হবেই। হতেই হবে। এই নির্বোধ, স্বল্প দৃষ্টি নৃশংসতা পথ করে দেবে মমতা ও দূরদৃষ্টিকে। আমাদের পৃথিবীটাকে গ্রাস করা এই বিশেষ ব্যাধি, কুস্বাস্থ্যের এই মৌসুম ফুরাবে।”

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0