default-image

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে। যাঁর ফেসবুক পোস্ট কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত, সেই ঝুমন দাশের মা নিভা রানী দাশ আজ বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন।

আদালতের বিচারক শ্যাম কান্ত সিংহ মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী দেবাংশু শেখর দাশ মামলা এবং আদালতের বিচারকের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার সময় নিভা রানী দাশের ঘরেও হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় হামলাকারীরা তাঁর ছেলের বউ সুইটি রানী দাশকে লাঞ্ছিত ও মারধর করেন। নিভা রানী দাশ থানায় মামলা দিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করায় আমরা আদালতে মামলা করেছি।’

বিজ্ঞাপন

নিভা রানী দাশের মামলার আরজিতে আসামি হিসেবে ৭২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত আসামি রাখা হয়েছে আরও দুই হাজার। এর মধ্যে নাসনি গ্রামের শহিদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীনকে এই মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে নিভা রানী দাশ উল্লেখ করেছেন, তাঁর ছেলে ঝুমন দাশ আপনের ফেসবুকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্টের জের ধরে গত ১৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আসামিরা ও কয়েক হাজার সন্ত্রাসী ধারাইন বাজারে ধারাইন নদীর পাড়ে ভোলানগর গ্রামে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিলিত হন। তাঁরা ঝুমন দাশের ফাঁসি চান, গ্রেপ্তার চান বলে স্লোগান দেন। একই সঙ্গে তাঁর বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘোষণা দেন। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ ধারাইন বাজার ও ভোলানগর গ্রামের লোকজন সেখানে আসেন। তাঁরা ঝুমন দাশকে পুলিশে সোপর্দ করা হবে বলে সন্ত্রাসীদের জানান এবং পরে তাঁকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। তখন আসামি ও সন্ত্রাসীরা পরদিন ১৭ মার্চ তাঁদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট করবে বলে হুমকি দিয়ে যান। তিনি সে রাতে শাল্লার ঘুঙ্গিয়ারগাঁওয়ে তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন।

মামলার এজাহারে নিভা রানী দাশ আরও উল্লেখ করেন, ১৭ মার্চ সকালে আসামিরা দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালান। এই হামলার নেতৃত্ব দেন নাসনি গ্রামের স্বাধীন মিয়া ও ফখর উদ্দিন ওরফে ফুক্কনসহ অন্য আসামিরা। এ সময় ঝুমন দাশের স্ত্রী সুইটি রানী দাশকে লাঞ্ছিত ও মারধর করা হয়। তিনি বাম হাতের কনুইয়ে আঘাত পেয়েছেন। এ সময় তাঁর গলায় থাকা এক ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন ও ঘরের ট্রাংকে থাকা ৫৮ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আসামিরা একই সময় গ্রামের ৮৫টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে মন্দিরও ভাঙচুর করা হয়।

নিভা রানী দাশ বলেছেন, তিনি ২৫ মার্চ নিজে শাল্লা থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু পুলিশ সেটি মামলা হিসেবে নেয়নি। এ কারণে তিনি আদালতে মামলা করেছেন।

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু সুফিয়ান বলেছেন, ‘একই ঘটনা ও বিষয়বস্ত নিয়ে থানায় আগে দুটি মামলা হয়েছে। সেগুলোর কার্যক্রম চলমান আছে। তাই নিভা রানী দাশের অভিযোগটি আমরা আদালতে পাঠিয়েছি। এখন আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমরা সেটিই করব।’

হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগে ১৭ মার্চ সকালে শাল্লা উপজেলার কাশিপুর, দিরাই উপজেলার নাসনি, সন্তোষপুর ও চণ্ডীপুর গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ লাটিসোঁটা নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের পাশের ধারাইন নদীর তীরে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে সেখান থেকে শতাধিক লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালান।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শাল্লায় সংখ্যালঘুদের গ্রামে হামলার ঘটনায় এর আগে থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। ১৮ মার্চ দুটি এবং ২২ মার্চ একটি। ১৮ মার্চ করা দুটি মামলার একটির বাদী শাল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল করিম। এই মামলায় অজ্ঞাত ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলাটি করেন নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার। এই মামলায় ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়।

নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার ঘটনায় ২২ মার্চ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ঝুমন দাশের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেছেন শাল্লা থানার এসআই আবদুল করিম। ঝুমন দাশ ১৭ মার্চ থেকে কারাগারে আছেন। নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার মামলায় পুলিশ এ পর্যন্ত ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে হামলার মূল ইন্ধনদাতা ও মামলার প্রধান আসামি শহিদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীনকে (৫০) পাঁচ দিনের এবং ২৮ জনকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন