বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুরুতেই বই দুটির প্রেক্ষাপট, এই দুই শিল্পীর অর্জন, তাঁদের সাধনা থেকে শুরু করে, ব্যক্তি, পারিবারিক জীবন, মানবিক গুণাবলি, স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের অনেক অজানা খুঁটিনাটি দিক আকর্ষণীয় সরস বাচনভঙ্গিতে তুলে ধরেন মতিউর রহমান। তিনি রাজনৈতিক ও সাংবাদিক জীবনে দেশ–বিদেশের বহু কৃতি মানুষের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক হয়েছে। তাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ তাঁর হয়েছে। শুধু পেশাগত দায়িত্ব থেকে নয়, ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেও তিনি অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রথম আলোর সঙ্গে দেশের সব মাধ্যমের শিল্পী, শিল্পের নেপথ্যের মানুষদের একটি গভীর হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে। সেই সূত্রে তিনি ২০১৫ সালে সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার সংগীতজীবনের অর্ধশত বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। একইভাবে ২০১৯ সালে অভিনয়জীবনের ৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অভিনয়শিল্পী কবরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। এই দুটিই প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায় ছাপা হয়েছিল।

default-image

রুনা লায়লার সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, একজন মানুষ যখন নিজের কাজের ক্ষেত্রে খুব উচ্চতর স্থানে উঠতে সফল হন, তখন তিনি নিজের ছাড়াও অনেক বিষয়ে অনেক গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হন, রুনা লায়লার সঙ্গে কথা বলে তাঁর সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে। উপমহাদেশের সংগীত, সংগীতের সঙ্গে যুক্ত মানুষসহ বিভিন্ন বিষয়ে রুনার যে অগাধ জ্ঞান, তা অনেকেরই অজানা। এর পাশাপাশি নিয়মিত তিনি মানুষকে নানাভাবে সহায়তা করেন। কাশ্মীরে একটি হাসপাতাল করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহর আমন্ত্রণে ভারতের শিল্পীরা যখন অনুষ্ঠানের জন্য পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন, রুনা এককথায় বিনা পারিশ্রমিকে অনুষ্ঠান করেছেন। কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছেন এক অনুষ্ঠানে। তাঁর কথা শুরুর আগেই লতাজি নিজেই এগিয়ে এসেছেন। আর রুনার অনুষ্ঠান দেখে ভারতের বিখ্যাত সাংবাদিক খুশবন্ত সিংয়ের সেই বিখ্যাত কথা ‘রুনাকে দাও ফারাক্কার সব পানি নিয়ে যাও’ এমন বহু অজানা তথ্য দিলেন। গোপন রাখলেন না বলিউডের সুদর্শন নায়ক শশী কাপুরের প্রতি রুনার অন্য রকম অনুরাগের কথাও। তাই নিয়ে বেশ রসিকতা হলো রুনা লায়লার সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বামী অভিনেতা আলমগীরের সঙ্গে।

আলমগীর অবশ্য নিজেও রেহাই পেলেন না। কবরী প্রসঙ্গে আলোচনায় তাঁর প্রথম নায়িকার সঙ্গে আলমগীরের সম্পর্ক সহ–অভিনেতার সীমা ছাড়িয়ে কতটা গভীর হয়েছিল, সেই রসিকতাও থাকল মতিউর রহমানের কথায়।

default-image

তবে সাক্ষাৎকারের একপর্যায় কবরী যেভাবে ‘আমি একেবারে একলা মানুষ’ কথাটি বলেছিলেন, তা তাঁকে খুবই বিস্মিত করেছিল। মতিউর রহমান বললেন, তিনি মিষ্টি মেয়ে, অতুলনীয় জনপ্রিয়তা, চারপাশে এত মানুষ; তবু কেন তিনি এমন একাকী? এই কথা কৌতূহলী করে তুলেছিল। অনেক প্রশ্ন করেছেন। অনেক ব্যক্তিগত কথা, চলচ্চিত্রশিল্পের কথা, রাজনীতির কথা অনেক মানুষের কথা বলেছিলেন। পরে একান্ত ব্যক্তিগত এবং অন্য অনেকে যুক্ত বলে তাঁর কিছু কথা পরে বাদ দিতে বলেছেন। তবু এই সাক্ষাৎকার রুপালি পর্দার চিরচেনা মিষ্টি মেয়েটির নেপথ্যের এক অন্য রকম মানুষের ছবিই পাঠকের কাছে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। পরে তিনি ভারতের স্বনামখ্যাত অভিনয়শিল্পী ও কবি মীনা কুমারীর লেখা একটি কবিতা কবরীকে নিবেদন করে আবৃত্তি করেন।

এরপরে বই দুটির ওপরে খোলামেলা মন্তব্য করতে গিয়ে অনেকেই দেশের শিল্প–সংস্কৃতির ইতিহাস, অবদানও তুলে ধরেছেন। আর শিল্পীদের জীবন নিয়ে এ ধরনের আরও বই প্রকাশের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।

রুনা লায়লা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই সাক্ষাৎকারের জন্য তিনি সম্মানিত বোধ করেছেন। মানুষ তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। তবে তিনি জোর দিলেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করার প্রতি। বললেন, দেশে নতুন প্রতিভার অভাব নেই। তবে তারা প্রয়োজনীয় সুযোগ পাচ্ছে না। নতুন শিল্পীদের জন্য তিনি সব সময় তার সহায়তা অব্যাহত রাখবেন বলে জানালেন। ধন্যবাদ জানালেন আয়োজনের জন্য। রুহের মাগফিরাত কামনা করলেন কবরীসহ প্রয়াত সবার।

রুনা লায়লাকে মধ্যমণি করে মঞ্চে এলেন খুরশীদ আলম, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, আবিদা সুলতানা, সামিনা চৌধুরী, শুভ্র দেব, বাপ্পা মজুমদার, দিনাত জাহান মুন্নি ও কোনাল। সমবেত কণ্ঠের সুর ভেসে গেল সন্ধ্যার বাতাসে ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব...।’

নন্দিত অভিনেতা আলমগীর বললেন, কবরীর না থাকায় এই অনুষ্ঠান অপূর্ণ থেকে গেল। শুধু সহ–অভিনেতা বা বন্ধু নয়, সহজ করে বললেন ‘কবরীর চ্যালা ছিলাম’। বহু ঘটনার স্মৃতিচারণা করে কবরীর স্বভাবের বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে তার উদার হৃদয়ে দিকটিকে উন্মোচিত করলেন তিনি। বললেন কাজের প্রতি কবরীর গভীর নিষ্ঠার কথা।
রুনা লায়লার গান সম্পর্কে তিনি শুধু বললেন, সান্নিধ্যের কারণে ঘরোয়া মুহূর্তে রুনা লায়লার মাঝেমধ্যে গাওয়া ধ্রুপদি গান যখন তিনি শোনেন, তখন আক্ষেপ হয় এ ধরনের গান রুনাকে দিয়ে বিশেষ গাওয়ানো হয়নি। এতে শ্রোতারা এবং সংগীতভুবনও অনেক বঞ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যক্তি মানুষ হিসেবে রুনা লায়লা এমন সাধারণ, বাড়িতে এমনভাবে তিনি থাকেন যে অচেনা কেউ এলে তাঁকে চিনতেই পারবেন না। আর মানুষের জন্য রুনার সহায়তা কারার যে গুণ, সেটি তাঁকেও অনুপ্রাণিত করেছে মানুষের জন্য কাজ করতে।

শিল্পী খুরশীদ আলম বলেন, ‘রুনা সম্পর্কে একটি কথাই বলব, সে দেশে এল, আর দেশের সব শিল্পী দাঁড়িয়ে গেল।’ অর্থাৎ অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে গান কারার রীতি এ দেশে রুনা লায়লাই প্রবর্তন করেছেন।

default-image

কবরী সম্পর্কে বলেন, কবরী কিছুটা মেজাজি ছিলেন বটে, তবে খুব সহজে চারপাশের সব মানুষকে বিশ্বাস করতেন। অনেকেই তাঁর সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখেনি। এ কারণেই তাঁর দুঃখ ছিল গভীর।

default-image

শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, শিল্পীদের নিয়ে আমাদের এখানে এমন বই বিশেষ প্রকাশ হয়নি। দেশের গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক আন্দোলনে শিল্পীদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা আছে। কোনো প্রকাশনা না থাকায় তাঁদের অবদানের কথা পরে কেউ জানতে পারে না। এই বই দুটি শুধু আগ্রহী পাঠকই নন, পরবর্তী গবেষকদের জন্যও তথ্যের উৎস হিসেবে কাজ করবে।

default-image

অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, শিল্পী হিসেবে কবরী ও রুনা লায়লার মূল্যায়ন করার কিছু নেই। তাঁরা কিংবদন্তি। তাঁরা বিশেষ প্রতিভা নিয়েই জন্মেছেন, তবে চর্চা ও পরিশ্রম করে সাফল্যের শীর্ষে এসেছেন। তিনি রুনা লায়লার দীর্ঘ জীবন এবং কবরীর আত্মার শান্তি কামনা করেন।

default-image

সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন, রুনা লায়লা শিল্পী হিসেবে যেমন অতুলনীয়, তেমনি মানুষ হিসেবেও। খুব সহজ ও সাধারণ জীবন যাপন করেন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের তিনি যেভাবে অনুপ্রাণিত করেন, সেটি তাঁর কাছে শিক্ষণীয়। আর কবরী ছিলেন তাঁর জায়গায় অনন্য, তা–ই থাকবেন।

default-image

শুভেচ্ছা জানিয়ে আলোচনায় আরও অংশ নেন শিল্পী আবিদা সুলতানা, সামিনা চৌধুরী ও অভিনেতা ফেরদৌস। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর কালচারাল ইভেন্ট অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স সমন্বয় কবির বকুল।

default-image

এত শিল্পীর সমাগম যেখানে, সেই আয়োজন গান ছাড়া শেষ হবে, এটা তো নিতান্তই লবণ ছাড়া ব্যঞ্জনের শামিল।

default-image

অতএব রুনা লায়লাকে মধ্যমণি করে মঞ্চে এলেন খুরশীদ আলম, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, আবিদা সুলতানা, সামিনা চৌধুরী, শুভ্র দেব, বাপ্পা মজুমদার, দিনাত জাহান মুন্নি ও কোনাল। সমবেত কণ্ঠের সুর ভেসে গেল সন্ধ্যার বাতাসে ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব...।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন