default-image

শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে শিশু আইন সংশোধনের প্রস্তাব উঠেছে। এ ছাড়া শিশুদের তাদের সুরক্ষার অধিকারগুলো জানানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন বক্তারা। পাশাপাশি শিশুদের ওপর নির্যাতন বন্ধে পরিবার-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানোর কথা উঠে এসেছে এক গোলটেবিল আলোচনায়।

গতকাল বৃহস্পতিবার ব্লাস্ট, সেভ দ্য চিলড্রেন ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে শিশু আইন, ২০১৩-এর প্রস্তাবিত খসড়া সংশোধনী পর্যালোচনার কথা বলেন বক্তারা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন বলেন, আইন করে আইনের সুরক্ষা দিয়েও লাভ হয় না। দরকার সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। এ জন্য গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশু আইন সংশোধন করে তা যেন কেবল দেখানোর জন্য না হয়। আইনের ধারার মধ্যে তা যেন আটকে না রাখা হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া যে অপরাধ, সেটা সবাইকে বুঝতে হবে।

পারিবারিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম। তিনি বলেন, শিশুরা ভালো কিছু শিখলে তার প্রভাব বড় হলেও থেকে যায়। শিশুদের কাছ থেকেও শেখার আছে। শিশুদের কথা শুনতে হবে। শিশুরা অনেক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে নাছিমা বেগম বলেন, পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি সম্মিলিত প্রয়াস ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

শিশু অধিকারবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সহসভাপতি আরমা দত্ত বলেন, ‘শিশু অধিকার আইনগুলোর বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে। পাশ্চাত্য দেশের শিশুরা তাদের অধিকার ও আইনগুলো সম্পর্কে জানে। আমাদের দেশেও শিশুদের নিজেদের সুরক্ষাদানকারী আইন সম্পর্কে জানাতে হবে।’

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, শিশুরা ভুল করলে তাদের সংশোধন করার জন্য বিকল্প ভাবতে হবে। মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শিক্ষকদের নিয়োগপত্রে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া যাবে না, তা উল্লেখ থাকতে হবে। প্রশিক্ষণেও তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আইনের প্রয়োগের কথাও বলেন তিনি।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের অ্যাডভোকেসি ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং উপদেষ্টা ও আইনজীবী তাজুল ইসলাম। তিনি শিশু আইন সংশোধনের কথা উল্লেখ করে আইনকে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান শিশু আইনের বড় অংশটি শিশুদের অপরাধসংশ্লিষ্ট। আইনের একটি অধ্যায়ে শিশুদের সুরক্ষার জন্য যা আছে, তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানান তিনি। তাজুল ইসলাম বলেন, আইনগত সুরক্ষা দরকার এবং বিদ্যমান শিশু আইনের সংশোধন দরকার।

সেভ দ্য চিলড্রেনের সেক্টর ডিরেক্টর আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার একটি অভীষ্টেও বলা আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। শিশুদের সুরক্ষার যে সূচক রয়েছে, সেখানে নজর দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, আইনি কাঠামোর সুরক্ষার পাশাপাশি পজিটিভ প্যারেন্টিং মেথডকে জনপ্রিয় করতে হবে। একটি সামাজিক পরিবর্তন দরকার, বড় পরিসরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। যারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তাদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

শিশুদের মানসিক নির্যাতনের প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিশুদের আবেগের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। ছেলেশিশু কাঁদলে তাদের থামিয়ে দেওয়া হয়। মেয়েশিশু জোরে হাসলেও তাকে বাধা দেওয়া হয়। এটা একধরনের মানসিক নির্যাতন। মানসিক নির্যাতন শিশুর নৈতিক উন্নতিতে বাধা দেয়। এতে শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। আচরণে পরিবর্তন ঘটে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনও কমিয়ে আনার কথা বলেন তিনি।

‘শিশুদের ওপর যা হয়, তাকে শাস্তি না বলে নির্যাতন বললে অনেক বেশি সহজ হয়। আমি এটাকে কখনোই শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করতে চাই না। রাষ্ট্রীয় বিধির বাইরে কেউ শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে না।’
মোহাম্মাদ আমীরুল হক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের চেয়ারপারসন তাওহিদা জাহান বিশেষ শিশুদের প্রতিও আলাদা যত্ন নেওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, বিশেষ শিশুদের মানসিক বয়সের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আইনেও তাদের আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া ভাষার মাধ্যমে শিশুদের ওপর নির্যাতন হয় জানিয়ে বলেন, ভাষা এখন প্রতিনিয়ত নির্যাতনের মাধ্যম হয়ে যাচ্ছে। শিশুকে শাসন করতে হবে ইতিবাচক ভাষায়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মাদ আমীরুল হক বলেন, ‘শিশুদের ওপর যা হয়, তাকে শাস্তি না বলে নির্যাতন বললে অনেক বেশি সহজ হয়। আমি এটাকে কখনোই শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করতে চাই না। রাষ্ট্রীয় বিধির বাইরে কেউ শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, শিশুদের ওপর নির্যাতন নিরসনের জন্য শিশু আইনের একটি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে এটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম সূচনা বক্তব্যে বলেন, কোনো শিশু যেন কোনোভাবে অবদমিত না হয়। শুধু স্কুল নয়, অভিভাবকেরা সম্মিলিতভাবে সচেতন থাকলে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হবে।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন