বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

সুপ্রাচীনকাল থেকে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ড পৃথিবীব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেছিল এবং খ্যাতি লাভ করেছিল মূলত তাঁতবস্ত্রের জন্য। এখন পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে যা জানা গেছে, তাতে মনে করা হয়, বাংলাদেশের তাঁতশিল্প অন্তত আড়াই হাজার বছরের কিংবা তার চেয়েও প্রাচীন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র (খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক), নাম না-জানা লেখকের পেরিপ্লাস অব আথ্রিয়ান সি ইত্যাদি গ্রন্থে বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের নানা বিবরণ পাওয়া যায়। মহাস্থানগড় (খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক), চন্দ্রকেতুগড় (খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়-প্রথম শতক) ইত্যাদি প্রত্নস্থান থেকে যেসব প্রত্নবস্তু, বিশেষ করে পোড়ামাটির ফলকচিত্র এবং ভাস্কর্য পাওয়া গেছে, তা দেখেও তৎকালীন বাংলার বস্ত্রশিল্পের উৎকর্ষ সম্পর্কে ধারণা করা যায়। এমনকি, হাজার বছরের পুরোনো প্রাচীন বাংলা ভাষার উদাহরণ চর্যাপদেও তাঁতশিল্পের উল্লেখ আছে।

কিংবদন্তির মসলিনের কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। প্রাচীন রোমান সামাজ্য থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলায় উৎপন্ন মসলিনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, অন্তত উনিশ শতক পর্যন্ত বাংলা ছিল ‘পৃথিবীর তাঁতঘর’। দেশি-বিদেশি বণিকদের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশে বাংলার তাঁতবস্ত্র পৌঁছে গিয়েছিল এবং সূক্ষ্ম মসলিন কিংবা নকশাদার জামদানি সব দেশেই অতি কাঙ্ক্ষিত পণ্য হিসেবে পরিগণিত হতো।

কিন্তু ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের মিলের তৈরি সুতা ও কাপড় ভারতবর্ষে আসতে শুরু করে এবং ক্রমশ বাংলাদেশের হস্তচালিত তাঁতের বাজার নষ্ট হয়ে যায়। বিশ শতকের গোড়ায় সূক্ষ্ম মসলিনের বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু কালের পরিক্রমায়, নানা বাধাবিপত্তি কাটিয়ে, ধারাবাহিকতা বজায় রেখে টিকে থাকে জামদানি। এর রহস্য কী? জামদানির কি বিশেষ কোন ‘জাদু’ আছে, যে কারণে পরম্পরা রক্ষা করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে জামদানি?

৩.

মসলিনের একটি ধরন হলো জামদানি। যেসব মসলিন বয়নের সময় তাঁতেই নকশা তোলা হতো, তা জামদানি নামে পরিচিত হতো। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের ইতিহাসে নকশার প্রেক্ষাপটে জামদানি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবন্ত ধারা।

শিল্পী ও গবেষক হিসেবে ঢাকাই জামদানি নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল এবং ১৫ বছর ধরে আমি জামদানি নিয়ে জানার ও বোঝার চেষ্টা করছি। এই দীর্ঘ ও বিচিত্র যাত্রায় আমার যে অভিজ্ঞাতা হয়েছে তাতে আমি বুঝতে পেরেছি, জামদানি শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পমাধ্যম কিংবা নিছক শিল্পপণ্য নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জামদানির বিশেষ গুরুত্ব আছে–এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরো অনেক কিছু।

২০১৩ ইউনেসকো জামদানি বয়নশিল্পকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ বা ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন অ্যাক্ট) আইনের আওতায় জামদানি বাংলাদেশের, বিশেষ করে ঢাকা অঞ্চলের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত বলে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই দুই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের এবং এর ফলে জামদানিশিল্পের পুনরুজ্জীবন ও বিকাশ লাভের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

৪.

শীতলক্ষ্যা নদীতীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁও উপজেলা জামদানি বয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শত শত বছর ধরে মূলত এই এলাকার মুসলমান তাঁতিদের হাতে জামদানি বয়নশিল্প বিশেষ উৎকর্ষে পৌঁছেছে। জামদানি বয়ন করা হয় সনাতন গর্ত তাঁতে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন তাঁত। এই তাঁতের নির্মাণ খরচ খুবই কম। সাধারণ বাঁশ-কাঠ ইত্যাদি দিয়েই এই তাঁত তৈরি করা যায়। মিহি সুতার কাজের জন্য এই তাঁত খুবই উপযোগী। কিন্তু বোধগম্য কারণেই এই তাঁতে উৎপাদনের পরিমাণ অত্যন্ত কম হয়। কিন্তু পরিবেশবান্ধব এই গর্ত তাঁতে স্থানীয় তাঁতিদের শ্রম ও মেধায় আজও ঢাকাই জামদানি তৈরি হয়ে থাকে।

জামদানির উৎস ও বিবর্তন নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। কারও মতে, জামদানির নকশায় ইরান, ইরাক ও তুর্কিস্তানের কার্পেট ও লৌকিক নকশার প্রভাব সর্বাধিক। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, পারস্য প্রভাব থাকলেও স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এই শিল্পের সূত্রপাত ও বিকাশ ঘটেছিল এবং এখন এটা একান্তভাবেই বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্পসম্পদ।

জামদানি সম্পর্কে বেশ কিছু চমকপ্রদ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় হাকিম হাবিবুর রহমানের (১৮৮১-১৯৪৭) স্মৃতিচারণায়। তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমাদের বাল্যকাল পর্যন্ত জামদানির উত্তম ধরনসমূহের মধ্যে ‘আশরাফিবুটি’, ‘মাছিবুটি’, ‘জালিদার এবং লহরিয়া’ নামের সাদা রঙের জামদানি তৈরি হতো এবং এটিই হচ্ছে প্রাচীন ধারা।’ ১৯৪৫ সালে তিনি বলেছেন, ‘...আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে পর্যন্ত জামদানি শুধু সাদাই তৈরি হতো, অবশ্য শাড়ির হাসিয়ায় লাল-কালো (সুতার) কাজ সূক্ষ থেকে সূক্ষতর হতো এবং জমিন সাদা থাকত এবং এটাই ছিল আসল রীতি। আমার বাল্যকালে ...ঐ সময় পর্যন্ত শুধু সাদা জমিনের জামদানি তৈরি হতো।’

হাকিম হাবিবুর রহমানের ভাষ্যে আরও নতুন যে তথ্য পাওয়া যায় তা হলো, উনিশ শতকের শেষ দশক বা বিশ শতকের শুরুতে নবাব সলিমুল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহে রঙিন জামদানি তৈরি হওয়া শুরু করেছিল এবং ক্রমশ তা জনপ্রিয়ও হয়েছিল।

ক্রমশ সূক্ষ্ম ঢাকাই মসলিন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, ধনিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় টিকে থাকে জামদানি। কিন্তু বিশ শতকেই ক্রমশ জামদানির উৎপাদন ও ব্যবহার মূলত শাড়িতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর জামদানির নকশা ও বুননের মানও আগের তুলনায় ভালো নয় বলে মনে করেন তাঁতি এবং গবেষকেরা।

তবে ইদানীং কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। পুরোনো জামদানির নকশা এবং সূক্ষ্ম সুতা সংগ্রহ করে অনেকেই জামদানি তাঁতিদের দিয়ে অতি উৎকৃষ্ট মানের জামদানি শাড়ি তৈরি করছেন। সেসব শাড়ি দিয়ে জামদানি প্রদর্শনী হচ্ছে, বিপণিবিতানে সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে এবং ধনিক শ্রেণির ক্রেতারা তা সংগ্রহ করছেন। সম্প্রতি জাঁকজমকপূর্ণ জামদানি ফেস্টিভ্যাল (২০১৯), মসলিন ফেস্টিভ্যাল (২০১৬) দেশি-বিদেশে বিশেষ সাড়া ফেলেছে ও বিপুলসংখ্যক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বাইরেও জামদানি নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। এমনকি সরকারি উদ্যোগে মিহি মসলিনের পুনঃপ্রচলন ঘটানোর চেষ্টা অনেকটা এগিয়েছে বলে পত্রিকা মারফত জানা গেছে। এসব উদ্যোগ ও তৎপরতা জামদানির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

৫.

ইউরোপে আঠারো শতকে শিল্পবিপ্লবের পর পৃথিবী জুড়ে হস্তশিল্প বা কারুশিল্পের ওপর এর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তাঁতশিল্প, বিশেষ করে মসলিন ও জামদানির বাজার ও উৎপাদন প্রক্রিয়া এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু প্রতিকূল সময়ের স্রোতেও নিজগুণে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে টিকে আছে মসলিনের একটা ধরন জামদানি। আবার, একুশ শতকের নতুন প্রেক্ষাপটে এই জামদানিশিল্পের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সমকালীন বাস্তবতায় ঐতিহ্যবাহী জামদানি দিয়ে বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি সম্ভব হলে শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

জামদানি মানে তো শুধু শাড়ি নয়, কিংবা এটা শুধু নারীদের বিষয় নয়, পুরুষদের পোশাক কিংবা আধুনিক জীবনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ঘর সাজানোর কিংবা লাইফস্টাইল পণ্য তৈরি করতে পারলে জামদানির বাজার বৃদ্ধি পাবে। আশার কথা এই যে, সম্প্রতি বৈচিত্র্যময় জামদানি পণ্য নিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে এবং সেসব পণ্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করছে। উদাহরণ হিসেবে যথাশিল্প-এর কথা বলা যায়। তাদের জামদানি স্কার্ফ, জামদানি নোটবুক, পর্দা, কুশন কাভার, স্মার্ট স্টেশনারি বক্স ইত্যাদি দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। এসব উদ্যোগ জামদানিশিল্পের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

শাড়ির পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় জামদানি পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হলে জামদানিশিল্পের জন্য তা নতুন প্রাণের জোয়ার বয়ে আনতে পারে। এ জন্য নাগরিক ডিজাইনার, উদ্যোক্তাসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষ ভূমিকা আছে। জামদানি তাঁতিরা সম্মান ও স্বীকৃতি পেলে, তাদের তৈরি পণ্য দেশে-বিদেশে বিক্রয় হলে এবং তাঁতিরা যথেষ্ট সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি ধারাবাহিকতা বজায়ে রেখে প্রবাহমান থাকবে বলে আশা করা যায়।


শাওন আকন্দ: শিল্পী ও গবেষক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন