default-image

শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ২০ শতাংশ শিশু শ্রম দিচ্ছে। এ খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাভুক্ত করে শিশুশ্রম বন্ধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারকে কাজ শুরু করার সুপারিশ করেছেন বক্তারা। আজ সোমবার বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি) ও প্রথম আলোর ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত মালামাল ও ধারালো জিনিস বহন, রাসায়নিক নিয়ে নাড়াচাড়া করাসহ নানা কারণে এ খাত শিশুদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ।

‘শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিদ্যমান শিশুশ্রম নিরসনের পথ অনুসন্ধান’ শিরোনামের গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনে সহযোগিতা করেছে উইনরক ইন্টারন্যাশনালের ক্লাইম্ব প্রকল্প। সভায় বক্তারা বলেন, এ খাত এত দিন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রম আইনে শনাক্তও হয়নি। সরকার সদ্য এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করতে চাইলে এ খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আলোচনা সভার সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, শুঁটকি উৎপাদনে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হয়। নজরদারির জন্য কাজের স্থল পরিদর্শন করতে চাইলে আগে থেকেই তথ্য পেয়ে যান শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মালিকেরা। তাঁরা সাময়িকভাবে শিশুশ্রমিকদের সরিয়ে রাখেন। শিশুশ্রম নিরসনে দায়িত্ববোধ থেকে গণমাধ্যম সংবাদ প্রচার করে।

বিজ্ঞাপন
default-image

অনুষ্ঠানে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে শিশুশ্রমের ওপর গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুন নবী।

গবেষণায় বলা হয়, কক্সবাজার সদর ও মহেশখালী উপজেলায় শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের প্রসার সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে নাজিরটেক শুঁটকিপল্লিতে মোট শুঁটকি উৎপাদনের ৯৩ শতাংশ হয়ে থাকে। এ শিল্পে ১৪ হাজার ৩৬৬ জনের মতো শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে ২০ শতাংশ শিশু, ৬৩ শতাংশ নারী, বাকিরা পুরুষ। শিশুশ্রমিকদের ৪১ শতাংশের বয়স ১৪ বছরের নিচে। ৫৯ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। শিশুশ্রমিকদের মধ্যে আবার মেয়েশিশুর সংখ্যা বেশি, ৭২ শতাংশ। গবেষণাটির জন্য ৪৬১ জন শিশুশ্রমিকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

default-image

মোহাম্মদ নুরুন নবী জানান, নদীভাঙনসহ দারিদ্র্যের কারণে এলাকা ছেড়ে শুঁটকিপল্লির আশপাশে বসতি গড়ে তোলা মানুষের সন্তানেরাই এ পেশায় যুক্ত হয়েছে। ছেলেরা বিকল্প নানা পেশা খুঁজে নিতে পারে বলে এখানে মেয়ের সংখ্যা বেশি। মালিকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা শিশুশ্রমিকদের নিতে না চাইলে মা শ্রমিকেরা কাজ করতে অনাগ্রহ দেখান। তাই ইচ্ছা থাকলেও শিশুশ্রমিকদের কাজে রাখতে বাধ্য হন। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে শিশুরা শারীরিক ও যৌন হয়রানির শিকার হন বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। ২০২৫ সালের মধ্যে সব খাত থেকে শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্য রয়েছে। শিশুদের জন্য কোনো কর্মক্ষেত্র থাকা উচিত নয়। শ্রম আইনে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম তালিকায় এত দিন শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্প ছিল না। এখন নতুন করে যে ছয়টি খাতকে এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শনাক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্প রয়েছে। খুব শিগগির এটা গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে।

ইনসিডিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ কাউন্সিলের সদস্য এ কে এম মাসুদ আলী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে সংস্কার আনতে হবে। শিশুশ্রমকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। এখন এ খাতে শিশুশ্রম নিরসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু না হলে কোনো লাভ হবে না।

default-image

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ কাউন্সিলের কো-চেয়ার সালমা আলী বলেন, শিশুশ্রমসহ যেকোনো বিষয়ে গবেষণা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সাক্ষ্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। এ থেকে আইনি সহায়তা দেওয়া যায়, সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দেওয়া যায়।

বিসিসিপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ শাহজাহান ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে যোগাযোগনীতি প্রয়োগ ও কৌশল নির্ধারণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, কোনো কাজে কৌশলগত যোগাযোগ তখনই সম্ভব, যখন লক্ষ্য ঠিক করা হয়। শিশুশ্রম নিরসনের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই যাঁদের নিয়ে কাজ করতে হবে; শিশু, বাবা–মা, মালিকপক্ষ এবং নীতিনির্ধারক প্রত্যেককেই ভালোভাবে বুঝতে হবে।

বিজ্ঞাপন

উইনরক ইন্টারন্যাশনালের ক্লাইম্ব প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম জামান খান শিশুশ্রম নিরসনে অর্থনৈতিক দিকটিকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সঙ্গে মুনাফা জড়িত। শিশুদের নিয়োগ দিলে কম টাকায় কাজ করানো যায়। কম শ্রমমূল্য দিয়ে উৎপাদিত পণ্য প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিতে পারলে লাভবান হওয়া যায়। এই প্রবণতার কারণে শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও জাতি জনশক্তি হারাচ্ছে। শিশুশ্রম নিরসনের বিষয়টিকে সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যুক্ত করা প্রয়োজন।

default-image

উইনরক ইন্টারন্যাশনালের সিভিক এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট বিশেষজ্ঞ মো. তানভীর শরীফ বলেন, শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে শিশুশ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তারা আট–নয় ঘণ্টা রোদে সরাসরি কাজ করে। পানিতে কাজ করতে করতে আঙুলের ফাঁকে ঘা হয়ে যায়।

বিসিসিপি–ক্লাইম্ব প্রকল্পের টিম লিডার আবু হাসিব মোস্তফা জামাল শুঁটকিশিল্পে শিশুশ্রমিকের ওপর একটি ভিডিও উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

মন্তব্য করুন