default-image

ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার কড়া সম্প্রদায়ের কৃষ্ণ আর বাবলী কড়া। প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার সময় কৃষ্ণ কড়া বাবলীকে বলেছিলেন, ‘হাম তরা পেসিন কারউইও এ্যাখনে তয় হামার নাজের মে গির গেনে’ (আমি তোকে ভালোবাসি, তুই আমার নজরে পড়েছিস)। উত্তরে বাবলী বলেছিলেন, ‘তরা হামে পেসিন লায় কারউইও, হামার পিছু পিছু লায় ঘুর হামার সাং (আমি তোকে ভালোবাসি না, আমার পেছনে ঘুরিস না)।’

সংসার পাতার আগে কৃষ্ণ আর বাবলীর ওই কথোপকথন হয় কড়া সম্প্রদায়ের ‘কড়া’ ভাষায়। এখন তাদের ঘরে আছে চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া এক ছেলে। তবে সে বান্দরবানের কোয়ান্টাম স্কুলে পড়ে। তাই তাকে থাকতেও হয় সেখানে। গত বছর কারাম পূজায় যখন বাড়িতে ঘুরতে এসেছিল, তখন নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারেনি সে। কৃষ্ণ আর বাবলীর ভাষ্য, কড়া ভাষার বর্ণমালা না থাকায় বাংলায় লেখাপড়া করা তাদের ছেলে কড়া ভাষার চর্চা করতে পারে না। ছোটবেলায় মুখে শোনা ভাষাও এখন সে ভুলে গেছে।

কৃষ্ণ আর বুবলী থাকেন বিরল উপজেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা হালজাই ঝিনাইকুড়ি গ্রামে। এ গ্রামের ২২ পরিবারের ৭৭ জন সদস্য শুধু টিকিয়ে রেখেছেন কড়া ভাষা। তাঁরা বলছেন, প্রতিদিনকার প্রয়োজনে এখন তাঁদের বাংলা ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশতে হয়। ফলে সারা দিন বাংলাতেই বেশি কথা বলা হয়। কড়া ভাষার পরিসর তাই দ্রুতই কমে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গতকাল শনিবার গ্রামে গিয়ে কথা হয় কড়া সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে। বাবলী ভালোবেসে যে কৃষ্ণ কড়াকে বিয়ে করেছিলেন, সেই কৃষ্ণ কড়াই (৩০) এই সম্প্রদায়ের প্রথম বিদ্যালয়ে যাওয়া ব্যক্তি। মাধ্যমিক পাস করে এখন তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলা ভাষায় কৃষ্ণ কড়া বলছিলেন, ‘প্রথম যখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হই, স্যাররা পর্যন্ত আমার কথা শুনিয়া হাসত। ধীরে ধীরে স্যারদের সহযোগিতায় বাংলা ভাষা শিখেছি। এখন নিজের ভাষা বলতে লাগি, শুদ্ধ ভাষা হয়্যা যায়।’

বর্তমানে এই গ্রামের মোট ৯ জন পড়াশোনা করছে। বেশিরভাগের পেশা কৃষি। গ্রামের বাসিন্দা বিমান কড়া (৫৫) নামে একজন বলেন, ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে নবীর মোহাম্মদ নামের একজন ব্যবসায়িক কাজে দিনাজপুরের ঘুঘুডাঙ্গা এলাকায় এসেছিলেন। তাঁর ছেলে ফুল মোহাম্মদ চৌধুরী একসময় এখানকার জমিদার হয়ে ওঠেন। মূলত এই জমিদারের অধীনেই জঙ্গল কাটার কাজ করতেন কড়ারা। তাই তাঁদের ভাষার প্রবাদ প্রবচনেও কৃষির ছাপ আছে।

তবে ভাষার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাদ প্রবচনও এখন হারাতে বসেছে। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা কিনা কড়া (৭৩) কয়েকটি প্রবাদ শোনালেন। সম্প্রদায়ের বিবাহযোগ্য মেয়ের বাবার প্রতি ঘটকেরা প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় বলতেন, ‘কাহরিয়া গাছুয়াকে কাহরিয়া পেক গেলো, তঁয় কাহরিয়া বেচমে কি লায়, আবদিনকো বেটরা ঢেল দেইকে, ঝাটুয়া থুনে, তালি মারো। তঁয় এ্যাখনে কাহরিয়া হামানিকে খিলামে কি লায় (বরইগাছে বরই পেকে আছে, যুবক ছেলেরা ঢিল ছুড়ছে, মেয়েকে বিয়ে দেবেন কি না?)।’

কড়াদের ভাষা প্রসঙ্গে দিনাজপুর সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদুল হক বলেন, কড়াদের ভাষা মূলত ভারতের ভোজপুরি ভাষার অপভ্রংশ। প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে চর্চার ক্ষেত্র থাকলে তাদের ভাষা কিছুটা হলেও টিকিয়ে রাখা যেত।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন