শুভ জন্মদিন সিস্টার লুসি হল্ট

কেক কেটে সিস্টার লুসির জন্মদিন উদ্‌যাপন করছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজয়র রহমান। বুধবার বিকেলে বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনের লাইব্রেরিতে
ছবি: প্রথম আলো

বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও হেঁটেই নিজের ঘর থেকে মিশনের লাইব্রেরিতে এলেন সিস্টার লুসি হল্ট। পায়ে চপ্পল পরনে সাদামাটা শাড়ি আর মেরুন রঙের কার্ডিগান। বুধবার বিকেলে বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনের ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার কক্ষটিতে তখন অনেকেই হাজির। কেক, ফুল আর উপহার নিয়ে হাজির হয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান। সঙ্গে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। কেক কাটা হলো, তাঁকে কেক খাওয়ালেন জেলা প্রশাসক। ফুল দিয়ে জানানো হলো শুভেচ্ছা। লুসি হল্টের হাতে তুলে দেওয়া হলো বয়স্ক ভাতার কার্ড, আর্থিক সহায়তা। সবাই সুর করে বললেন, ‘শুভ জন্মদিন সিস্টার লুসি হল্ট।’

জন্মদিনের অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দুই সহকারী কমিশনার সুব্রত বিশ্বাস দাস, নাজমুল হুদা ও প্রবেশন কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন অক্সফোর্ড মিশনের চার্চের জ্যেষ্ঠ ফাদার ফ্রান্সিস পান্ডে, কনিষ্ঠ ফাদার জন হালদারসহ অন্যরাও।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা পেয়ে অসুস্থতা ছাপিয়ে সিস্টার লুসির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উচ্ছলতা নিয়ে সিস্টার লুসি বাংলাদেশে তাঁর ৬০ বছরের জীবন নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছা পোষণ করেন, জেলা প্রশাসকের কাছে পৃষ্ঠপোষকতা চান। জেলা প্রশাসন থেকে তাঁকে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেন এস এম অজিয়র রহমান।

জেলা প্রশাসক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমন এক মানবদরদি মানুষ আমাদের বরিশালে আছেন, বাংলাদেশে আছেন, এটা সত্যি আমাদের সবাইকে গর্বিত করে। তাঁর আর্থিক, চিকিৎসা ও অন্য যেকোনো প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য একজন চিকিৎসককে নিয়মিত শারীরিক চেকআপ ও চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

তাঁর পুরো নাম লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্ট। স্বদেশ, স্বজনদের ভুলে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের মায়ায় এখানেই ৬০ বছর ধরে রয়েছেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা, চিরকালের মতো মিশে যেতে চান বাংলার প্রকৃতিতে। তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ গণভবনে ডেকে নিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেন এ দেশের নাগরিকত্ব। তিনি বাংলা বলেন, বাঙালিদের মতো শাড়ি পরেন, বাঙালিদের সেবা করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশময় জীবন তাঁর, তবু তিনি ৫৭ বছর ধরে ভিসা নিয়েই এ দেশে থেকেছেন।

সিস্টার লুসির জন্ম ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের সেন্ট হ্যালেন্সে। বাবা জন হল্ট ও মা ফ্রান্সিস হল্ট। দুই বোনের মধ্যে ছোট লুসি। তাঁর বড় বোন রুৎ অ্যান রেভা ফেলটন স্বামী ও তিন ছেলে নিয়ে তিনি ব্রিটেনেই বসবাস করেন। লুসি ১৯৪৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক (দ্বাদশ) পাস করেন। তিনি ১৯৬০ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন। যোগ দেন বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনে। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পড়াতেন। এরপর আর দেশে ফিরে যাননি। ৫৭ বছর ধরে বরিশাল ছাড়াও কাজ করেছেন যশোর, খুলনা, নওগাঁ, ঢাকা ও গোপালগঞ্জে।

বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনের দক্ষিণ দিকটায় বারান্দার এক অংশে টিনের ছোট্ট ঘর, জরাজীর্ণ। ছোট্ট একটি কাঠের চৌকি, কাঠের দুটি টেবিল। শোবার চৌকিতে পাতলা তোশক বিছানো, একটি বালিশ আর কম দামের কম্বল। পাশে শেলফে কিছু বই ও পুরোনো ডায়েরি। এটাই সিস্টার লুসির থাকার জায়গা।

২০০৪ সালে অবসরে যান সিস্টার লুসি। ওই বছরই তিনি ফিরে আসেন বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনে। এই অবসরজীবনেও দুস্থ শিশুদের মানসিক বিকাশ ও ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এসব শিশুর জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের কাজ করেন।