ঢাকার ধামরাইয়ের কুল্লা ইউনিয়নের সিতি গ্রামের দিনমজুর কোরবান আলী এখন বেকার। তাঁর সংসার চলছে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। অথচ কোরবান আলীর গ্রামেই সম্প্রতি অতি দরিদ্রের কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় সড়ক পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে; যা করানোর নিয়ম অভাবী মানুষ দিয়ে।
ধামরাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইজিপিপির আওতায় গ্রামের অতি দরিদ্র জনসাধারণের কর্মসংস্থানের জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কুল্লা ইউনিয়নে ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর চার লাখ টাকায় সিতি গ্রামের খোরশেদ আলীর বাড়ি থেকে মরণের বাড়ি পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ, আট লাখ টাকায় মামুরা তমসের আলীর বাড়ি থেকে বরদাইল রূপনগর খাল পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ এবং ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় দক্ষিণ ফোর্ডনগরের আনসার আলীর বাড়ি থেকে বেঙ্গল কার্পেট মিল হয়ে ফোর্ডনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে অতি দরিদ্রদের দিয়ে কাজ করানোর কথা।
শ্রমিকের পরিবর্তে যন্ত্রের ব্যবহার করে সরকারি অর্থ তছরুপ: পিআইও কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিতি গ্রামের খোরশেদ আলীর বাড়ি থেকে মরণের বাড়ি পর্যন্ত সড়কের পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে প্রতিদিন ৫০ জন করে, দক্ষিণ ফোর্ডনগরের আনসার আলীর বাড়ি থেকে বেঙ্গল কার্পেট হয়ে ফোর্ডনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে প্রতিদিন ৬০ জন এবং মামুরা তমসের আলীর বাড়ি থেকে বরদাইল রূপনগর খাল পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে প্রতিদিন ১০০ জন করে শ্রমিকের কাজ করার কথা। এভাবে তিনটি প্রকল্পের আওতায় মোট ২১০ জন শ্রমিকের সপ্তাহে পাঁচ দিন করে ৪০ দিনের কর্মসংস্থান করা হয়। কিন্তু প্রকল্পগুলোতে কোনো শ্রমিক নিয়োগ না করে খননযন্ত্র ব্যবহার করে মাটি কাটা হয়েছে।
ফোর্ডনগর গ্রামের আবদুস সালাম ও শুকুর আলীসহ কয়েকজন বলেন, ‘দুই মাস দইরা এলাকায় খুব একটা কাজ নাই। এর ওপর অবরোধ আর হরতালে আমাগো না খাইয়া মরবার দশা অইচে। এই বিপদের সময় রাস্তায় মাটি কাটার কাজ পাইলে বাইচা যাইতাম।’
খননযন্ত্রের মালিক ও চালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মাধ্যমে তিনি সড়কের মাটি কাটার কাজ পেয়েছেন। যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে মাটি কাটার বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন ১২ হাজার টাকা। মামুরা তমসের আলীর বাড়ি থেকে বরদাইল রূপনগর খাল পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে তাঁর লেগেছে ৩৪ দিন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিদিন ১২ হাজার টাকা করে মামুরা তমসের আলীর বাড়ি থেকে বরদাইল রূপনগর খাল পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণে ৩৪ দিনে খরচ হয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ বাবদ আরও এক লাখ টাকা খরচ হলেও মোট বরাদ্দের তিন লাখ টাকাই বেঁচে গেছে। একইভাবে খননযন্ত্র ব্যবহারের ফলে অন্য দুটি প্রকল্পেও বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
কাজে অনিয়মের অভিযোগ: সিতি গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, পুনর্নির্মাণের নামে বাড়িগাঁও-সিতি সড়কের মরণের বাড়ি থেকে খোরশেদের বাড়ি পর্যন্ত এক ফুট থেকে দেড় ফুট উঁচু করে মাটি ফেলা হয়েছে। তবে সড়কের প্রশস্ততা রয়েছে আগের মতোই।
ওই গ্রামের প্রদীপ ও ভজন মন্ডলসহ অনেকে বলেন, মাস খানেক আগে খননযন্ত্র দিয়ে সড়কের পাশের জমি থেকে মাটি কেটে সড়কে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া খননযন্ত্র পাহারার জন্য তাঁদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়েছে।
একই গ্রামের বলরাম মন্ডল বলেন, কপির আবাদ নষ্ট করে সড়কসংলগ্ন তাঁর জমি থেকে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার চেষ্টা করা হয়। পরে তিনি নিজ খরচে ৫০ ফুটের মতো সড়ক বেঁধে দিয়ে কপির আবাদ রক্ষা করেন।
দক্ষিণ ফোর্ডনগরের আনসার আলীর বাড়ি থেকে বেঙ্গল কার্পেট হয়ে ফোর্ডনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। ফোর্ডনগর মডেল টাউন এলাকা থেকে আনসার আলীর বাড়ি পর্যন্ত সড়কের মাত্র এক হাজার ফুট অংশে মাটি ফেলেই কাজ শেষ করা হয়েছে।
মামুরা তমসের আলীর বাড়ি থেকে বরদাইল রূপনগর খাল পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ কাজেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কেটে তড়িঘড়ি রাস্তার কাজ শেষ করা হয়েছে বলে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
ইউপি চেয়ারম্যান যা বললেন: অভিযোগ অস্বীকার করে কুল্লা ইউপি চেয়ারম্যান কালীপদ সরকার বলেন, সড়ক তিনটি পুনর্নির্মাণ কাজে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি করা হয়নি। কাগজে-কলমে সব হিসাব সঠিক আছে।
শ্রমিকের পরিবর্তে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটা প্রসঙ্গে কালীপদ সরকার বলেন, প্রতিদিন ২০০ টাকা পারিশ্রমিকে শ্রমিকেরা কাজ করতে রাজি না হওয়ায় যন্ত্রের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: এসব অভিযোগ নিয়ে কথা বলার জন্য ফোন করা হলে ধামরাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) দিলীপ কুমার সাহা কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ইজিপিপি প্রকল্পে এলাকার অতি দরিদ্র লোকজন দিয়ে মাটি কাটানোর কথা। এর ব্যত্যয় ঘটলে এবং কাজে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন