ঢাকা নগরে বাস করা শ্রমিকেরা মানসম্মত আমিষ পান না। আমিষ বলতে তাঁদের বেশির ভাগের পছন্দ মাছ। কিন্তু দুর্মূল্যের বাজারে জোটে কেবল পচা মাছ। এসব মাছ নোংরা পানি দিয়ে টাটকা রাখার চেষ্টা চলে বলে তা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ায়।

‘তিন প্রধান মাছের প্রজাতির মূল্য চক্রের মানচিত্রায়ণ: পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে করণীয়’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়ামুল নাসেরের নেতৃত্বে এ গবেষণা হয়। ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে শুরু করে গবেষণা শেষ হয় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে। গত বছর মূল প্রতিবেদনটি তৈরি হয়।

অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘শ্রমিকদের অধিকারসংক্রান্ত আলোচনায় মজুরিসংক্রান্ত বিষয়টিই প্রাধান্য পায়। তাঁদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এসব বিবেচনায় আসে না। এ গবেষণা তাই ভিন্ন রকমের। নিম্ন আয়ের মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের একটি দিক এখানে উন্মোচিত হয়েছে।’

গবেষণায় যেসব শ্রমিকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, তাঁদের মধ্যে ৪৫ শতাংশই নারী তৈরি পোশাকশ্রমিক। এ ছাড়া দিনমজুর, রিকশাচালক, বাসের চালক ও সহকারী, গৃহকর্মে সহায়তাকারী নারী, ভ্যানচালক, রাঁধুনিও আছেন। শ্রমজীবী মানুষদের খানাভিত্তিক জরিপ, দলভিত্তিক আলোচনা, শ্রমিকদের এলাকার মাছের বাজার, আড়ত এবং মাছের উৎপাদনস্থল পরিদর্শনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকা, গুলশান, বাড্ডা, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর ও বাসাবো এলাকার বস্তি এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব এলাকার শ্রমজীবী মানুষেরা যেসব বাজার থেকে মাছ কেনেন, সেসব বাজারও ছিল তথ্য সংগ্রহের জায়গা। বড় আড়তের মধ্যে কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী ও মেরুল-বাড্ডার আড়তে গিয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করেন গবেষকেরা। আর মাছ উৎপাদনের উৎসে যেসব এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা, সেসবের মধ্যে আছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া, শ্রীপুর ও রাজেন্দ্রপুর।

গবেষক এম নিয়ামুল নাসের গবেষণাটি সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু আমাদের মূল কর্মশক্তির উৎস যাঁরা, তাঁরা কতটুকু মাছ পাচ্ছেন, যেসব মাছ পাচ্ছেন সেগুলোর মান কেমন, তা জানতেই এই গবেষণা।’

ঢাকার শ্রমজীবী মানুষের বেশির ভাগ গ্রাম থেকে আসা। মাছ পছন্দের ক্ষেত্রেও তাই তাঁদের পছন্দ নদীর ছোট মাছ। গবেষণায় দেখা যায়, তাঁদের পছন্দের প্রথম তিন মাছ হলো পুঁটি, ট্যাংরা ও মলা। তবে তাঁরা প্রধান যে তিন ধরনের মাছ বেশি পান, সেগুলো হলো চাষের পাঙাশ, কই আর তেলাপিয়া। মোট ১৩ থেকে ১৭ প্রজাতির মাছ তাঁরা কিনতে পারেন। এসবের দাম ৭৫ থেকে ২২০ টাকা কেজি। গবেষণায় দেখা যায়, শ্রমিকদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ ক্রেতা নারী এবং ৫৪ শতাংশ পুরুষ। তাঁরা কোনো বড় বাজারে যেতে পারেন না। বস্তির কাছের ছোট বাজার থেকে মাছ কেনেন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পুঁটি ও ট্যাংরার মতো মাছগুলোর বেশির ভাগেরই মান খারাপ। এগুলো বিকেলে বা সন্ধ্যায় দূর থেকে আসার কারণে পচা থাকে। ভাগাপ্রতি ২০ থেকে ৪০ টাকায় এসব বিক্রি হয়। তবে থাই পাঙাশ, কই ও তেলাপিয়ার মান কিছু ভালো থাকে। শ্রমিকদের বাজার করার সময় মূলত সন্ধ্যার পর। আর সে কারণেই মানসম্মত মাছ তাঁদের ভাগ্যে প্রায় জোটে না।

শ্রমিকদের স্বল্প বেতন এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় শ্রম দিতে বাধ্য করার একটি চিত্র এই গবেষণায় ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন। তিনি বলেন, ‘কম মজুরির কারণে একজন শ্রমিক ভালো বাজারে যেতে পারেন না। আবার পোশাক কারখানায় আট ঘণ্টা কাজের কথা থাকলেও অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা তাঁকে করতে হয়। এই দুই ঘণ্টা কাজ ইচ্ছাধীন বলা হলেও শ্রমিকেরা এটা করতে আসলে বাধ্য হন।’

গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট পাঙাশের ক্ষেত্রে স্থানীয় পাইকার ও ঢাকার আড়তদার কেজিপ্রতি ৮ শতাংশ করে লাভ করেন। আর ১৪ শতাংশ লাভ গোনেন খুচরা দোকানি। চাষের কই মাছের ক্ষেত্রে খুচরা দোকানির লাভ সবচেয়ে বেশি, ২৯ শতাংশ। যেসব বাজারে শ্রমিকেরা যান, সেখানে ফ্রিজের কোনো ব্যবস্থাই নেই। আড়তদারের কাছে থেকে আনা বরফে মাছ রাখা হয়। তবে সেটি গলে গেলে সতেজ রাখতে যে পানি ব্যবহার করা হয়, তার মান বেশ খারাপ। আর পানির মান নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার কোনো মাথাব্যথাও নেই। বিক্রেতাদের স্যানিটেশনের কোনো ব্যবস্থাও নেই।

গবেষণায় স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা এসব বাজার পর্যবেক্ষণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী বাজার সৃষ্টি এবং সেগুলোর নজরদারি করারও সুপারিশ আছে।

শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, মজুরি ও গবেষণার সুপারিশ নিয়ে কথা হয় তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত সময় কাজ করানোর বিষয়টি হয়তো ঠিক না।’ মেয়রের মন্তব্য, ‘ঢাকার আশপাশের যেসব এলাকা আছে, সেখানে শ্রমিকেরা নিরাপদ আমিষ পান। কিন্তু ঢাকার বাজার পরিবেশ এখনো আশানুরূপ না।’

বাজারগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা নেবে বলেও আশ্বাস দেন মেয়র।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0