রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনে চারটি নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য ও আইসিটি সেন্টারের প্রশাসকের বাড়িতে গিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে একদল লোক। নিয়োগ নিয়ে এই সংকটের মূলে রাজনৈতিক চাপের সংস্কৃতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিভিন্ন সময় নিয়োগের তথ্য ঘেঁটেও তেমন তথ্য মিলেছে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের সংস্কৃতি তো আর এক দিনে গড়ে ওঠেনি। কাজেই এসব মনোভাব পাল্টাতে সময় লাগবে। সবাইকে বুঝতে হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে দেশ রক্ষা করা যাবে না। এ বিষয়ে সরকারকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার, এরপর আওয়ামী লীগের দুই মেয়াদের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, নিয়োগ নিয়ে সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের চাপে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ নিয়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের বিদায় ঘণ্টাও বেজেছে।
২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তৎকালীন উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের আমলে বিভিন্ন বিভাগে প্রায় ২০০ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। পরে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই চার বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞাপিত পদের চেয়ে বাড়তি নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির সিন্ডিকেট সভায় তৃতীয় শ্রেণির ১৪৫টি পদের বিপরীতে ১৮৪ জনকে নিয়োগ অনুমোদন করা হয়। এর দুই দিন পর তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হয়। তখন চাকরিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি চাকরিপ্রত্যাশীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনে ভিড় করতে থাকেন। একপর্যায়ে সহ-উপাচার্যের দপ্তরে ভাঙচুর হয়; উপাচার্যের বাসভবনে বিক্ষোভ ও প্রশাসন ভবনে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা এ ঘটনা ঘটান। চাপের মুখে ওই দিনই অস্থায়ী ভিত্তিতে ২৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর দুই দিন পর উপাচার্য আবদুস সোবহানের মেয়াদ শেষ হয়।
এর আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে উপাচার্য ফাইসুল ইসলাম ফারুকী রাতারাতি ৫৪৪ জনকে অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেন। স্থানীয় বিএনপির নেতাদের চাপের মুখেই উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই নিয়োগ কেলেঙ্কারি ঘটান। ওই ঘটনা নিয়ে সমালোচনা ও আন্দোলনের মুখে ফাইসুলকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন ও সহ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান দায়িত্ব পান ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি। নিয়োগ নিয়ে শুরু থেকেই তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সময় দলীয় প্রার্থীদের নিয়োগ না দেওয়ায় ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা বিভিন্নভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন উপদপ্তর সম্পাদক ডাবলু সরকার উপাচার্য দপ্তরে এসে বলেন, দল ক্ষমতায় থাকতে চাকরিপ্রত্যাশী নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পেলে এবং এর জেরে তাঁরা ভাঙচুর করলে, তার দায়ভার তিনি নেবেন না। এরপর ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল ডাবলু সরকার (তখন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) উপাচার্য দপ্তরে উপস্থিত হয়ে দলীয় প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে তাঁকে চাপ দেন। আগের দিন ১৫ এপ্রিল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাংসদ ওমর ফারুকও উপাচার্য দপ্তরে এসে টেবিল চাপড়িয়ে হুমকি দিয়ে যান।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক এম কায়েস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নিয়োগের যে নিয়ম ও রীতি রয়েছে, তা অনুসরণ করেই নিয়োগ হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকেও স্বচ্ছ হতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় দেখলে হবে না। যোগ্যতা দেখতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন