চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ নিতে যাওয়া বিশিষ্ট নাগরিকদের ‘এক-এগারোর কুশীলব’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে।
গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্ধারিত আলোচনার পর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিশিষ্ট নাগরিকদের সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগের সমালোচনা করা হয় বৈঠকে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, এক-এগারোর কুশীলবেরা সংলাপের এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন প্রথম আলোকে জানান, অনির্ধারিত আলোচনায় বলা হয়, সুশীল সমাজের কিছু লোক সংলাপ নিয়ে কথা বললেও দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রলবোমা হামলায় সাধারণ মানুষের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিছু বলছেন না। আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানোর বিষয়ে তাঁরা নীরব রয়েছেন।
এ সময় আরও বলা হয়, ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্নারা সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ সময় হরতাল-অবরোধের কারণে ১৫ লাখ পরীক্ষার্থী যে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারছে না, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু বলেননি।
৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকের মতবিনিময় সভায় জাতীয় সংকট নিরসনে জাতীয় সংলাপের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এর আলোকে সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসনকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে গতকাল চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিশিষ্ট নাগরিকদের ওই বৈঠক সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গত রোববার সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ইদানীং বুদ্ধিজীবীরা কেউ কেউ একটু সরব হয়েছেন। কতিপয় বুদ্ধিজীবী সংলাপ নিয়ে যতটা সরব, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার বিরুদ্ধে ততটাই নীরব।
গতকালের বৈঠকে একজন মন্ত্রী বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বলেন, ‘তারা নিজেরাই কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। উনি (খালেদা জিয়া) নিজেই নিজেকে অবরুদ্ধ করেছেন।’
আরেকজন মন্ত্রী বর্তমান নাশকতা ও সহিংসতা বন্ধে নতুন আইন প্রণয়নের কথা বললে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, নতুন আইন করার প্রয়োজন নেই। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, দ্রুত বিচার আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন—এই চারটি আইনের সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগ করা গেলে চলমান সন্ত্রাস ও নাশকতা বন্ধ হবে। এ লক্ষ্যে কাজ চলছে বলেও মন্ত্রিসভাকে জানান তিনি।
টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ: গতকালের বৈঠকে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা৷ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কার্যসম্পাদনে পেশাগত ও কারিগরি সহায়তা দেবে ওই অধিদপ্তর।
সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা এ বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, বিলুপ্ত বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ডের (বিটিটিবি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিদপ্তরে সমন্বয় করা হবে। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিটিটিবি বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লি. (বিটিসিএল) এবং বাংলাদেশ সাব মেরিন কেব্ল কোম্পানি লি. (বিএসসিসিএল) গঠন করা হয়। বিলুপ্ত বিটিটিবির সব সম্পদ, দায় ও জনবল বিটিসিএলে স্থানান্তর করা হয়।
পরে বিসিএস (টেলিকম) ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। এ ছাড়া বিসিএস টেলিকম ক্যাডারের ২১ জন কর্মকর্তা অন্য ক্যাডারে আত্তীকরণের নির্দেশ চেয়ে আরও দুটি রিট করেন। এ সমস্যা সমাধানে সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়।
পরামর্শক কমিটি বিলুপ্ত বিটিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত সরকারের নীতি প্রণয়নে কারিগরি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীনে স্থায়ী কাঠামো হিসেবে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব করে। বৈঠক সূত্র জানায়, টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর গঠন করায় বিসিএস টেলিকম ক্যাডার বিলুপ্ত হচ্ছে না। এত দিন এটি বিলুপ্ত না হলেও নিয়োগ বন্ধ ছিল।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, অধিদপ্তর গঠনের বিষয়টি সাধারণত মন্ত্রিসভায় আসার কথা নয়। কিন্তু ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী বিবেচনায় এটি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, গতকালের সভায় শিল্প মন্ত্রণালয় সরকারি করপোরেশন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় আইনের খসড়া উত্থাপন করা হলেও তা মন্ত্রিসভা ফেরত পাঠিয়েছে। মন্ত্রিসভা বলেছে, এত দিনেও ওই আইনটি প্রয়োগ করা হয়নি। ওই আইনের অধীনে একটি পরিষদ থাকলেও এর সর্বশেষ সভা কবে হয়েছে, তা সংশ্লিষ্টরা জানাতে পারেননি। মন্ত্রিসভা আরও বলেছে, প্রতিটি করপোরেশনের নিজস্ব আইন আছে। তাই সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে কি না, তা যাচাই করতে ছয় মন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন