সংস্কৃতির বিস্তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। সরকার এর অভিভাবক নয়, কিন্তু সংস্কৃতিচর্চায় নীতিনির্ধারণ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বড় ভূমিকা রাখে। সেই কাজে চ্যালেঞ্জ অনেক।

সংস্কৃতি বিষয়ে বড় কাজটি করে থাকে সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া শিক্ষা, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বড় কাজ করে থাকে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ এসব মন্ত্রণালয় মিলে সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কিন্তু কম নয়। তবু দেশের সাংস্কৃতিক চর্চার অবস্থা ভালো নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আছে পেশাদারি, জবাবদিহি ও আন্তরিকতার অভাব।

লোকসংস্কৃতিবিদ ও বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে সাংস্কৃতিক পরিবেশ ঠিক না থাকলে এর খেসারত দিতে হয় সবাইকে। জঙ্গিবাদ, মাদক ও সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রগুলোতে পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটছে বলে মনে করছেন তিনি।

অবশ্য নতুন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের লক্ষ্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। এ লক্ষ্যেই তাঁরা কাজ করছেন। শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সংস্কৃতিকে আরও যুক্ত করে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কাজ করাও তাঁদের লক্ষ্য।

সংস্কৃতির উন্নয়নে পিছিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সংস্থা বা দপ্তর আছে ১৭টি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি), চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, বিটিভি, বেতারসহ ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। আবার মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে শিশু একাডেমী, যারা সংস্কৃতিচর্চায় শিশুদের এগিয়ে নিতে কাজ করে থাকে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ড।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান করা, বিশেষ দিবস পালন ও উৎসব উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন। নিজেদের ওয়েবসাইটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালে যে ২৮টি অর্জনের কথা বলেছে, তার অধিকাংশই উদ্‌যাপনকেন্দ্রিক।

এ ছাড়া আছে জাদুঘর ও গ্রন্থাগারের কাজ। গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের কাজ খুব একটা নেই। এসব খাতে বাজেটও কম। আর অনেক বছর ধরে গণগ্রন্থাগারের সংখ্যা ৭১টিতে আটকে আছে। এই মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কার্যক্রম বেশ বিস্তৃত। বর্তমানে সারা দেশে ৪৫২টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি আছে। কিন্তু এসব পুরাকীর্তি রক্ষণাবেক্ষণের মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাজ বিনোদন সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বেতারের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো নির্মিত হচ্ছে পুরোনো ধারায়। তাই দর্শকমন ভরছে না। চলচ্চিত্রে চলছে মন্দা। আছে চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণের ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভ। সেগুলোও চলছে ঢিমেতালে।

বিনোদন সংস্কৃতির দুরবস্থা

বিনোদন সংস্কৃতির বড় অংশ বেসরকারি খাতে। সরকারের দায়িত্বের জায়গা সেখানে নীতি ও সহায়তা দিয়ে পরিবেশ সৃষ্টির। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিকভাবে পরিচালনা করা। দুটো ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ কমছে। এফডিসিতে চলচ্চিত্রের শুটিং হয় কদাচিৎ। গত তিন বছরে মুক্তি পাওয়া দেশীয় সিনেমার সংখ্যা অর্ধেকে নেমে গেছে। আছে যৌথ প্রযোজনা ও বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানি নিয়ে বিতর্ক। দর্শক এমন ছবি দেখতে চান, তবে চলচ্চিত্রশিল্পে যুক্ত ব্যক্তিরা বাজারের সংরক্ষণ চান।

অন্যদিকে সিনেমা হলগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির হিসাব অনুযায়ী গত ২০ বছরে ১ হাজার ২৬১টি হল বন্ধ হয়েছে। চালু আছে সিনেমা হল ১৭৪টি। বিভিন্ন উৎসবের সময় খোলা হয় আরও ২৬টি। প্রদর্শক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভালো মানের বিদেশি সিনেমা দেখানোর সুযোগ অবারিত করা উচিত।

চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বলছেন, শহরের মানুষ এখন সিনেপ্লেক্সে যায়, যেখানে ভালো পরিবেশে তুলনামূলক ভালো মানের কিছু সিনেমা দেখানো হয়। আর যেসব ছবি হলে আসছে, সেগুলোর বেশির ভাগ থেকে বিনিয়োগ ফেরত পাচ্ছেন না প্রযোজকেরা। ফলে নতুন ছবি নির্মাণে আগ্রহ হারাচ্ছেন প্রযোজকেরা। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের নেতা বেলায়াত হোসেন মনে করেন, চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের কর্মকাণ্ডও সিনেমার অগ্রগতির জন্য বাধা।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, চলচ্চিত্রের দর্শকদের আবার ফিরিয়ে আনা একটি চ্যালেঞ্জ। এ নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। এফডিসির আধুনিকায়নে প্রায় সাড়ে তিন শ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছেন। ভালো সিনেমার জন্য সরকারি অনুদান আরও বাড়ানোর চিন্তা আছে। সিনেমা হলগুলো আধুনিকায়নের জন্যও প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

তবে এফডিসির হিসাব বিভাগের পদস্থ সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর ধরে লোকসান দিচ্ছে।

টেলিভিশনের বিনোদনেও নেই সুখবর। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বেতারের সংবাদের পাশাপাশি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

অবশ্য বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুন অর রশীদ বলেন, আগে বিটিভি একা ছিল। তখন শিল্পী, কলাকুশলীসহ সব সৃজনশীল মানুষের মনোযোগ ও আগ্রহ ছিল বিটিভির দিকে। এখন এতগুলো চ্যানেল। ফলে তাঁরাও বিভিন্ন দিকে গেছেন। তবে সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময় লোকগুলোকে বিটিভির অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বেসরকারি টেলিভিশনের বিনোদনকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ জন্য মানুষ ভারতীয় চ্যানেলগুলোর দিকে বেশি ঝুঁকছে। নব্বই দশকজুড়ে গানের বাজারের রমরমা অবস্থা থাকলেও এখন মন্দাবস্থা।

জনসাধারণের মেধা ও সৃজনশীল সম্পদের আইনগত সুরক্ষা দেওয়া হয় কপিরাইট নিবন্ধনের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে আগের অধ্যাদেশটি (আইন) সংশোধন করে কপিরাইট আইন করা হয়। বর্তমানে সেই আইন যুগোপযোগী না হওয়ায় আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে।

শিল্পকলার চর্চা শহরমুখী

মঞ্চনাটক, গান, নৃত্য, যাত্রাশিল্পের মতো পরিবেশনা শিল্পগুলোর চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। তবে এগুলো নিয়ে গবেষণার কাজটি তেমন হচ্ছে না।

মঞ্চনাটক আগের জৌলুশ হারিয়েছে। প্রথম সারির কয়েকটি বাদ দিলে বেশির ভাগ নাট্যদলই মঞ্চে দর্শক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের জেলা শহরগুলোতেও কাজ করছে শিল্পকলা একাডেমি। তবে সেই কার্যক্রমগুলো মূলত অবকাঠামোগত। ৪৪টি জেলায় পর্যায়ক্রমে উন্নত মঞ্চ, এসি, জেনারেটর, লাইট ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করছে তারা। বাকি ২০টি জেলার জন্যও পরিকল্পনা আছে। ১০টি উপজেলায় চলছে পাইলট প্রকল্প।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী মনে করেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাজেট বাড়ালে এ কর্মযজ্ঞ চালিয়ে নেওয়া তাঁদের জন্য কঠিন হবে না।

একসময় পাড়া বা মহল্লাকেন্দ্রিক নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হতো। এলাকাভিত্তিক জমজমাট পাঠাগার, ক্লাব, শিশু-কিশোর সংগঠনসহ বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল। কিন্তু এসব প্রায় বন্ধ হতে চলেছে। একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আক্ষেপ করেছেন, এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কৃতিচর্চা কমে গেছে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের পরামর্শ হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার বাইরে যেসব সহশিক্ষা কার্যক্রম হয়, সেগুলো পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

লোকজ সংস্কৃতি

বাংলাদেশের গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ছিল বেশ সমৃদ্ধ। লোকসংস্কৃতিবিদ শামসুজ্জামান খানের মূল্যায়ন হলো, গ্রামে আগে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জারি-সারিগানের অনুষ্ঠান ও যাত্রাপালার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলো চালাত। কিন্তু এখন সেটা আর হয় না। বাংলাদেশ যাত্রা শিল্প উন্নয়ন পরিষদের হিসাবে দেশে তিন শতাধিক যাত্রাদল ছিল, এখন ৩০টি দলও সংগঠিত হচ্ছে না।

বাজেট আর নীতির কথা

সংস্কৃতি নিয়ে বড় কাজটি করে থাকে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। কিন্তু অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের তুলনায় এই মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ তুলনামূলক অনেক কম। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ আছে ৫১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৯০ কোটি টাকা বেতন-ভাতাসহ পরিচালনা খাতে ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে।

তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মধ্যম সারির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এটা ঠিক যে এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট কম। কিন্তু যে কাজের হিসাবে বাজেট রাখা হয়, সেটাও অনেক সময় সঠিকভাবে খরচ করা যায় না।

বর্তমানে যে জাতীয় সংস্কৃতিনীতি আছে, সেটি হয়েছিল ২০০৬ সালে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এই নীতি একদিকে যুগোপযোগী নয়, অন্যদিকে কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) অনুযায়ী করা হয়নি। অর্থাৎ কোন কাজ কবে ও কীভাবে করা হবে, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা নেই। এ জন্য নীতিটি যুগোপযোগী করা দরকার।

আগামী পর্ব: অভিবাসন

অভিমত
সরকারকে জায়গা ছাড়তে হবে, দায়িত্বও নিতে হবে
আবুল মোমেন:কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

default-image

ভাষার অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের প্রশ্নেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালির দ্বন্দ্বের শুরু হয়েছিল। পাঞ্জাবি-অধ্যুষিত পাকিস্তান সরকার ও তাদের দোসররা কখনো আমাদের তাদের সমকক্ষ ভাবতে পারেনি। গোড়া থেকেই বৈষম্য আর বঞ্চনার শুরু। ফলে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধই ছিল ভরসা, যাতে মূল উপাদান হয়ে ওঠে সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। শেষ পর্যন্ত ওদের আগ্রাসন আর আমাদের প্রতিরোধ রণাঙ্গন পর্যন্ত গড়িয়েছিল।

কিন্তু স্বাধীন দেশে বাঙালির মুক্তি চেতনার বীজ বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্রমেই প্রতিকূলতার চাপে পড়েছে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির কদর তো বাড়ছেই, তার ওপর পরীক্ষা আর মুখস্থবিদ্যার চাপে স্কুল থেকেই সংস্কৃতিচর্চা একেবারেই নির্বাসিত হয়ে পড়েছে। বিপুল ছাত্রের চাপ সামলাতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরীক্ষা, ডিগ্রি আর সনদের মধ্যে আটকে গেছে। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যে শরীর-মনের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য যেসব খোরাক-রসদ দরকার, তার কিছুই দিতে পারে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এদিকে রাজনীতিও বহুকাল ধরে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খেতে খেতে আর ছাত্ররাজনীতি দখলদারি ও টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে পড়ে সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ হারিয়ে ফেলেছে। এর ওপরে সমাজে একদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীল মতবাদের প্রভাব বাড়ায় এবং অন্যদিকে বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজারের আগ্রাসনে ভোগবাদিতার প্রসার ঘটায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উদার মানবিক সংস্কৃতিচর্চা ভেতরে-বাইরে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। যে সংস্কৃতি একদিন দরিদ্র বাঙালি সৃষ্টি ও রক্ষা করেছিল, তা আজ মধ্যম আয়ের জাতি বিসর্জন দিতে বসেছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এ অবস্থায় সরকার কী করতে পারে? সংস্কৃতি কোনো আরোপিত বিষয় নয়, জীবনযাপনের দ্বারা সৃষ্ট লালিত হয়। ভাষা ও সংস্কৃতি সব সময় গতিশীল, তাই এর রূপান্তর, পরিবর্তন, উত্তরণ ঘটবেই এবং তাতে গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকবেই। তাহলে সরকারের কাছে কাম্য হলো সুস্থ সংস্কৃতির ধারা বহমান রাখা এবং তার অনুকূলে ভূমিকা পালন। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অঙ্গনে সবটা জুড়ে যদি সরকার বিরাজ করতে বা আধিপত্য করতে চায়, তাহলে সমাজের মধ্যে যে বহুমুখী সাংস্কৃতিক উপাদান, সত্তা ও সম্ভাবনাগুলো আছে, সেগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

ক্ষমতা স্বভাবতই সমাজে দৃশ্যমান শক্তিশালী অংশগুলোর সঙ্গে আপসের পথ ধরে আর ক্ষমতার সঙ্গে আপস করে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলে, তাতে সৃজনশীল ব্যতিক্রমী বিচিত্র বিষয় ও ভাবনা ধারণ-লালনের সুযোগ কমবে। সংস্কৃতির প্রবাহ সংকুচিত, এমনকি ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়বে—যার লক্ষণ আমরা এখন দেখছি।

আমরা চাই, অমানবিক সাম্প্রদায়িক ও অতি রক্ষণশীলতার হস্তক্ষেপ থেকে সংস্কৃতির মূলধারাকে রক্ষায় সরকার পাশে থাকুক। মূলধারাকে রক্ষা করতে হলে ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন উঠবে। সেদিক থেকে এই অঞ্চলের প্রত্ন ইতিহাস ও নিদর্শন চিহ্নিত করা এবং তা রক্ষা করে এসবের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটাতে হবে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বস্তুগত ও অবস্তুগত সব নিদর্শন রক্ষায়, এ নিয়ে গবেষণা ও সৃজনশীল কাজে তা ব্যবহারে সরকারের ভূমিকা থাকবে পৃষ্ঠপোষকের। সমাজে মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন জীবনচর্যার বাতাবরণ তৈরিও একটি জরুরি কাজ। সৃজনশীল ভাবুক ও সাধক, শিল্পী ও বৃত্তিজীবীদের মনের জানালায় যদি কপাট পড়তে থাকে, তাদের ভাবনা ও সৃজনের আঙিনা যদি সংকুচিত হতে থাকে, তবে যতই ভোগ-ব্যসনেরÿক্ষমতা কিংবা দরদালানের চাকচিক্য বাড়ুক জাতির মানসিক দারিদ্র্য এবং মানুষ হিসেবে তার অবক্ষয় ঠেকানো যাবে না।

সুস্থ প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচিত হবে সমাজকে আরও জায়গা দেওয়া, সৃষ্টিশীল মানুষদের স্বাধীনতার পরিসর বাড়তে দেওয়া এবং শিক্ষাকে স্বদেশ ও সংস্কৃতিচর্চার সমন্বয়ে প্রাণবন্ত মানবিক ও গভীরতায় সমৃদ্ধ হতে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের বিশ্ব নাগরিক হওয়ার পথও খোলা রাখতে হবে। আর সমাজের জ্ঞান ও কৃষ্টিচর্চায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কাজের মাধ্যমে সার্থক ভূমিকা পালন করতে পারে, তার জন্য আর্থিক, আইনগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক আনুকূল্য ও সমর্থন সাধ্যমতো বাড়িয়ে যেতে হবে সরকারকে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন