প্রাথমিক লক্ষণসমূহ

ছোট ছোট কিছু শারীরিক পরিবর্তন প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণসমূহ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। সেগুলো হলো—

সামান্য কাঁপুনি: হাত, আঙুল বা চিবুকে সামান্য কাঁপুনি একধরনের প্রাথমিক লক্ষণ। তবে ভারী ব্যায়ামের পর কিংবা কিছু ওষুধ খাওয়ার পর এমন সামান্য কাঁপুনি হতে পারে, যা স্বাভাবিক।

হাতের লেখা: সময়ের সঙ্গে হাতের লেখার পরিবর্তন হতে থাকে এবং তুলনামূলক ছোট হতে থাকে।

হাঁটতে-চলতে অসুবিধা: হাঁটাচলায় অসুবিধা আরেকটি প্রকট ও প্রাথমিক লক্ষণ। মাংসপেশি বিশেষ করে জয়েন্টের মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়ায় এমন সমস্যা শুরু হয়।

ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা: দেখা যায় রোগীরা আগের চেয়ে সামনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না এবং দাঁড়াতে গিয়ে নিকটতম কোনো কিছুর সাহায্য নিতে হচ্ছে।

ঘুমের সমস্যা: গভীর ঘুম না হওয়া পারকিনসন্স রোগের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ। এদের অনেককেই দেখা যায়, রাতে বিছানায় বাঁকা হয়ে শুতে কিংবা পাশ ফিরতে অসুবিধা হয়।

নির্দিষ্ট কিছু খাবারের গন্ধ না পাওয়া: একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই কলা এবং নির্দিষ্ট কিছু আচারের গন্ধ ঠিকমতো পাচ্ছেন না।

মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন: মুখের কিছু কিছু পেশি দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে মুখের অভিব্যক্তিগুলোর পরিবর্তন হতে থাকে। মনোযোগ দিয়ে দেখলে হতাশ অভিব্যক্তি চোখে পড়বে। রোগীর মানসিক অবস্থা ভালো হলেও মনে হতে পারে মন খারাপ।

কাজেই প্রাথমিক এসব লক্ষণ দেখামাত্রই একজন স্নায়ু্রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সম্ভাব্য কারণসমূহ

স্নায়ুকোষের ক্ষতির সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। তারপরও সাম্প্রতিক গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে পারকিনসন্স রোগের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে:

জেনেটিক্যাল বা বংশগত: বেশির ভাগ সময় স্নায়ুকোষের এই বিঘ্ন বা ক্ষয়ক্ষতি উত্তরাধিকারসূত্রে সঞ্চালিত হয়। পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা পারকিনসন্স রোগ আছে, এমন পরিবারের সদস্যদের বেশি হয় অন্যদের তুলনায়।

পরিবেশগত কারণ: সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, কীটনাশক ও হার্বিসাইড সরাসরি এই রোগের জন্য দায়ী হতে পারে। তা ছাড়া, অটোমোবাইল এবং শিল্পদূষণও এর কারণ হতে পারে।

ওষুধের ধরন: নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ পারকিনসন্স রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। দেখা গেছে এগুলো বন্ধ করার পর অবস্থার উন্নতি ঘটছে।

মস্তিষ্কের কিছু রোগ: মস্তিষ্কের কিছু রোগ যেমন; প্রোগ্রেসিভ সুপাররাইউলার পাির্স, একাধিক সিস্টেম অ্যাট্রোফি এবং কর্টিকোবাসাল ডিগ্রেশন পার্কিনসন্স রোগের জন্য দায়ী।

সেরিব্রোভাসকুলার রোগ: মস্তিষ্কের এই ধরনের রোগগুলো ক্রমাগত ছোট ছোট স্ট্রোক সৃষ্টি করে যার কারণে মস্তিষ্কের কিছু অংশ মরে যায় এবং পারকিনসন্স রোগের সম্ভাবনা তৈরি করে।

রোগটির নির্ণয় কীভাবে?

একজন অভিজ্ঞ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, লক্ষণ এবং উপসর্গগুলো বিশ্লেষণ করে অস্থায়ীভাবে রোগটি শনাক্ত করেন।

এরপর স্নায়বিক এবং শারীরিক পরীক্ষা যেমন; ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার (ডেট) স্ক্যান এবং স্পেক্ট স্ক্যান, কিছু ইমেজিং পরীক্ষা যেমন; এমআরআই, সিটি, মস্তিষ্কের আলট্রাসাউন্ড এবং পিইটি স্ক্যান করে চূড়ান্তভাবে রোগটি নির্ণয় করতে হয়।

অন্যদিকে কারবিডোপা-লেভোডোপা পরীক্ষাটি লক্ষণসমূহের উল্লেখযোগ্য উন্নতি নির্ণয় করতে সহায়তা করবে।

প্রাথমিক লক্ষণসমূহ প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা গেলে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে অনেকখানি। নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ এবং কিছু থেরাপির সাহায্যে রোগীকে স্বাভাবিক রাখা যায়। চিকিৎসার শুরুতেই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রোগী ও তাঁর পরিবারের সবাইকে অবহিত করতে হবে।

তবে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। যদিও পারকিনসন্স রোগটি প্রতিরোধের জন্য শতভাগ প্রমাণিত কোনো পন্থা এখনো জানা যায়নি। সম্ভাব্য কিছু কার্যকারণ এড়িয়ে এবং স্বাস্থ্যসম্মত কিছু জীবনাচার চর্চার মাধ্যমে এ রোগে আক্রান্তের সম্ভাবনা কমানো যায়। পর্যাপ্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চা, সাঁতার ও সাইক্লিং পারকিনসন্স প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। কাজেই নিয়মিত হাত, পা, ঘাড় এবং শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা দরকার। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও ভিটামিনযুক্ত সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। যতটা পারা যায় নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। ভিটামিন ডি ও সি যুক্ত খাবার গ্রহণ করুন। কারণ, এটি পারকিনসন্স রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন