বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২৮ ডিসেম্বর খাদিজার মেয়ের তিন মাস পূর্ণ হবে। খাদিজা জানালেন, স্বামী আলী শাহরুফ মো. জীম সার্বক্ষণিক তাঁকে সহযোগিতা করেন। মেয়েকে দেখার জন্য শাশুড়ি বাসায় থাকছেন। পরিবারের সদস্যরাই চান, খাদিজা নিজের পায়ে দাঁড়াক। খাদিজার পরীক্ষা শেষ হয় গত ৩ অক্টোবর। ১০ অক্টোবর মেয়ের জন্ম হওয়ার কথা থাকলেও আগেভাগেই জন্ম হওয়ায় বিপাকে পড়েছিলেন খাদিজা। তবে নিজের মনোবল ও পরিবারের সহায়তায় সব সামলেও নিয়েছেন তিনি। স্নাতকেও ভালো ফল ছিল খাদিজার।

খাদিজা ও শাহরুফের বিয়ে হয় গত বছরের মার্চ মাসে। হাসপাতালে খাদিজার পরীক্ষা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য হাতে খুব কম সময় পাওয়া গিয়েছিল। হাসপাতালে বসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যালয়ে আইটি বিভাগে কর্মরত শাহরুফ স্ত্রীর পরীক্ষার দরখাস্ত লিখেছিলেন। পরীক্ষার দিন সকালে তা যথাযথ স্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন শাহরুফের চাকরিসূত্রে পরিচিতজনেরা।

ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক রুনা লায়লা হাসপাতালে সেদিন ‘পরীক্ষার ডিউটি’ দিয়েছিলেন। পরীক্ষার পর টেলিফোনে এই শিক্ষিকা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘এ পরীক্ষার্থী আবার প্রমাণ করেছেন, মায়েরা সবই পারেন।’

default-image

চতুর্থ হওয়ায় মন খারাপ শাম্মীর

অন্যদিকে পাওয়ারলিফটিংয়ে চতুর্থ হওয়ায় মনটা একটু খারাপ শাম্মী নাসরিনের। তিনি আগেরবার বাংলাদেশ পাওয়ারলিফটিং অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। ফলে তিনি পুরস্কার বিজয়ীদের একজন ছিলেন। এবার পুরস্কার পাননি।

পাওয়ারলিফটিং মূলত একটি শক্তির খেলা, যা তিনটি লিফটে সর্বোচ্চ ওজনের তিনটি প্রচেষ্টা নিয়ে হয়ে থাকে। এতে স্কোয়াট মানে ঘাড়ে, বেঞ্চ প্রেস মানে শুয়ে বুকের ওপর এবং ডেডলিফট মানে মাটি থেকে ওজন তুলতে হয়। গতবার শাম্মী এই তিনে ২৬৫ কেজি ওজন তুলেছিলেন। এবার তিনটিতে ২৮২ দশমিক ৫ কেজি ওজন তুললেও শাম্মীর নিজের শারীরিক ওজন অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় কিছুটা বেশি হওয়ায় তিনি পিছিয়ে যান।

শাম্মী বললেন, ‘আমি আসলে বুঝতে ভুল করেছিলাম, আমি আরও ওজন তুলতে পারতাম, সে ক্যাপাসিটি আমার ছিল। শারীরিক ওজনের (৬৩ কেজির কিছু বেশি) দিক দিয়ে পিছিয়ে যেতে পারি, তা মাথায় ছিল না। তাহলে আমি ওজন তোলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম।’

default-image

হাসতে হাসতে শাম্মী বললেন, ‘যারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে, তাদের বয়স ২৪, ২৫ বা ২৬ হতে পারে। তারা আমার সন্তানের বয়সী। আমার এখন যে বয়স, এই বয়সে অনেক নারীর হাড় ক্ষয় থেকে শুরু করে নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। অথচ আমি এখনো কঠিন একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছি, এটাই অনেক। অন্য প্রতিযোগী মেয়েরাও বলে, “আন্টি, আপনাকে দেখেই আমরা খেলার সাহস পাই।” তারপরও প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে না পেরে মন খারাপ লেগেছে। বেশি ছবি না তুলেই বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলাম। তবে এখন আবার নিয়মিত জিম করছি।’

আগেরবার বাংলাদেশ পাওয়ারলিফটিং অ্যাসোসিয়েশনের ফেসবুক পেজে ‘বাংলাদেশ পাওয়ারলিফটিং ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২০’ শাম্মীকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে অন্যদের প্রতিযোগিতায় নাম নিবন্ধনের জন্য আহ্বান জানিয়েছিল।

default-image

তিন সন্তানের মা শাম্মী। মেয়ে হৃদিশা মৌরিন পড়ছে অষ্টম শ্রেণিতে। শাম্মী জানালেন, নভেম্বরের ৫ তারিখ ছিল নারীদের খেলার কোয়ালিফাই রাউন্ড। এ রাউন্ডে জিততে পারলেই চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণ করা যাবে। অন্যদিকে একই দিনে আগে থেকেই ঠিক হয়ে ছিল বড় ছেলে তানভীর ফয়সলের বিয়ের দিন। হল বুকিংসহ সব ঠিক। বিয়ে বা প্রতিযোগিতার তারিখ কোনোটারই পরিবর্তন হবে না। তবে অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাব্যক্তিরা শাম্মীকে সকালে খেলায় অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ১৭ ডিসেম্বর।

শাম্মী বললেন, ‘ছেলের বিয়ের জন্য বাসাভর্তি মেহমান। কোয়ালিফাই রাউন্ডের আগের রাতে পরের দিন দুপুর পর্যন্ত কে কী খাবে, তা রান্না করি। রাতে ঘুমাতে পারিনি। সকালে খেলতে যাই। খেলা শেষ হতে হতে বেলা দুইটা বেজে যায়। তারপর দেখা গেল, ছেলের বাসরঘরের জন্য বেডশিট কেনা বাকি। তখন মার্কেটে গিয়ে তা কিনি। তারপর যাই পারলারে। তবে এটাও ঠিক, সব সামলে অনুষ্ঠানে আমি ঠিকই সবার আগে গিয়ে উপস্থিত হই।’

শাম্মীর ছোট ছেলে সাজিদ ইকবাল দুই বছর আগে বিয়ে করেছেন। এ ছেলের বউ থাকেন কানাডায়। ছেলে আপাতত দেশেই আছেন। শাম্মী বললেন, ‘প্রতিযোগিতার দিন ছোট ছেলে, এই ছেলের শাশুড়ি, বড় ছেলে, বড় ছেলের বউ, মেয়েসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা গুলশান শুটিং ক্লাবে উপস্থিত থেকে আমাকে সাহস জুগিয়েছে। ছেলের বউ পা টিপে দেওয়া, একটু পরপর কিছু না কিছু খাওয়ানোসহ বিভিন্ন সেবাযত্ন করে। তাই প্রতিযোগিতায় আরেকটু ভালো করতে পারলে মনটা বেশি খুশি হতো। তবে আমার ছেলে ও ছেলের বউ, স্বামী, মেয়ে সবাই খুব খুশি।’

default-image

মূলত শাম্মী নিজের শরীর ঠিক ও ফিট রাখার জন্যই পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে ছোট ছেলের সঙ্গে জিমে গিয়ে ব্যায়াম করা শুরু করেছিলেন। এর মধ্যে ছেলে জিমে যাওয়া বাদ দিলেও তিনি তা ধরে রেখেছেন। এসএসসি পাস শাম্মী কিশোরী বয়সেই পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন শামসুল হককে। জানালেন, স্বামীসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ভালো আছেন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে পাওয়ারলিফটিং খেলাটি শুরু করেন বাংলাদেশ পাওয়ারলিফটিং অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল মোমিনুল হক। শাম্মী নাসরিন ২০১৯ সালে প্রথম প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন