default-image

মিতবাক মানুষটি এতই নিভৃতচারী ছিলেন যে হেঁটে আসার সময় যেন দূর থেকে তাঁর আগমন টের পাওয়া যেত না। আর কাছাকাছি এলে তাঁর দিকে তাকাতে হতো ওপরের দিকে দৃষ্টি মেলে। এ ছাড়া ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী মানুষটির মুখচ্ছবি দেখা যেত না। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে অনন্য শিল্পকৃতি রেখে শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ আমাদের ছেড়ে গেলেন আজ তিন বছর পূর্ণ হলো। নীরবেই যেন পার হয়ে গেল তিনটি বছর। কিন্তু নিভৃতি যতই থাকুক, ব্যক্তি সফিউদ্দীনের মতো তাঁর কীর্তির দিকে তাকাতে হলেও আমাদের ওপরের দিকে দৃষ্টি মেলেই দেখতে হবে।

সফিউদ্দীন আহমেদ চল্লিশের দশক থেকে খ্যাতিমান চিত্রকর হিসেবে পরিচিত। তিনি আমাদের কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রকর। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সহযাত্রী ও আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ দেশের ছাপচিত্রকলার তিনিই শিল্পগুরু। ছাপাই ছবির প্রসার ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি লন্ডনে চিত্রচর্চা ও শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই শিক্ষা তাঁর সৃষ্টির ভুবনকে নতুন মাত্রা দান করেছিল। লন্ডনে তিনি যে একক প্রদর্শনী করেন, তাতে তাঁর শক্তিমত্তা শিল্পবোদ্ধাদের কাছে নবচেতনায় উন্মোচিত হয়েছিল। তিনি তেলরঙেও সিদ্ধহস্ত শিল্পী।

শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ ১৯২২ সালে ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪২ সালে কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুল থেকে চারুকলায় স্নাতক এবং ১৯৫৮ সালে যুক্তরাজ্যের সেন্ট্রাল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস থেকে এচিং ও এনগ্রেভিংয়ে সম্মানের সঙ্গে ডিপ্লোমা লাভ করেন। তিনি দেশে-বিদেশে বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৫ সালে কলকাতা একাডেমি অব ফাইন আর্ট প্রদত্ত একাডেমি প্রেসিডেন্ট পদক, ১৯৪৭ সালে ভারতের পাটনার শিল্পকলা পরিষদ প্রদত্ত ‘দ্বারভাঙ্গা মহারাজার স্বর্ণপদক’, ১৯৬৩ সালে চারুকলায় অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত ‘প্রেসিডেন্ট পদক’, ১৯৭৮ সালে চারুকলায় অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৯৬ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) ছাপচিত্র বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

২০০৮ সালে ৮৬তম জন্মবার্ষিকীতে বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের উদ্যোগে বাংলাদেশে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী হয়। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর সৃষ্টিসমগ্র নিয়ে ‘শিল্পের অশেষ আলো’ শিরোনামে দুই পর্বে দুটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।


শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের চারুশিল্পের ভূবনে এক মহিরুহের মতো ছায়া বিলিয়ে গেছেন। আশি পেরিয়েও শিল্পচর্চায় সক্রিয় ছিলেন এই কর্মবীর। তবে, জীবন সায়াহ্নে এসে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগেছেন। আমাদের আধুনিক শিল্প-আন্দোলনের অন্যতম এই পথিকৃৎ শিল্পভুবনে অশেষ আলো ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২০ মে চিরবিদায় নেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন