বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নাম শুনলে অন্তত ঠাওর হবে যে এই আইন আমার–আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা দিতেই তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ আপনার ব্যক্তিগত তথ্য আরও সুরক্ষিত হবে। বাস্তবের দুনিয়ায় যতই অনিরাপদ বোধ করুন না কেন, ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় আপনার সুরক্ষা থাকবে। কিন্তু এই মোহ ভেঙে যাচ্ছে খবরের ভেতরে ঢুকলে। আইনের প্রাথমিক খসড়ায় বলা হচ্ছে, সম্মতি নিয়ে যেকোনো তথ্য সরকার নিতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারবে। পুরো বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবেন সরকারের নিয়োগ দেওয়া একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর অধীনে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তথ্য সংগ্রহের কাজ করতে না পারলে এ দায়িত্ব তৃতীয় কোনো পক্ষকে দিয়ে করাতে পারবেন তাঁরা।

প্রশ্ন হলো, আমার ব্যক্তিগত যেকোনো তথ্য আমি কেন সরকারকে দেব? আর সরকার কেনই–বা সব ব্যবহার করবে? যদিও সম্মতির বিষয়টি সর্বাগ্রে রাখা হয়েছে, কিন্তু সেটির তোয়াক্কা করা হবে তো? নাকি আমার–আপনার ব্যক্তিগত হাই–হ্যালো হয়ে যাবে আলু–পটোলের মতো সস্তা? এসব প্রশ্ন ওঠে, কারণ, এ দেশে আইন সবার জন্য সব সময় সমান থাকে না। ব্যক্তিভেদে কখনো কখনো তা এতটাই অসমান হয় যে কাউকে কাউকে দিনের পর দিন গরাদের পেছনে থাকতে হয়। আর অন্যদিকে নিয়মের দৃষ্টান্তমূলক ব্যতিক্রম ঘটিয়ে কেউ কেউ রাতারাতি মুক্ত হয়ে ফুলের তোড়া পান। যদিও জ্ঞান–বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে শুনে আসছি, ব্যতিক্রম কখনো নাকি দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ হতে পারে না। কিন্তু ব্যতিক্রমের সংখ্যা যখন অগণিত হয়ে যায়, তখন?

ফলে নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য, মেলায় পাওয়া মুড়িমুড়কি হয়ে যাওয়ার ভয় থেকেই যায়। কারণ, এ দেশে ফোনালাপ ফাঁস, ফেসবুক মেসেঞ্জারের কথাবার্তা আমজনতার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটানো খুবই সহজ। কেউ না কেউ তো তা করেনও। ব্যক্তিগত তথ্য ব্যক্তিগত না থাকার ভয় থেকেই নাগরিকেরা এখন আরও সুরক্ষিত অ্যাপ ব্যবহারের উপায় খোঁজেন। এই ‘খোঁজ’ আশঙ্কা থেকেই করা হয়। কারণ, আমরা সবাই অনুভব করি, সিন্দুক ভাঙা ওয়ান–টুর ব্যাপার কোনো কোনো ক্ষেত্রে।

আবার প্রতিকারের ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকলেও একটি কথা ছিল। সাধারণ নাগরিক নির্ধারিত পন্থায় সেবা না পেলে বা বৈষম্যের শিকার হলে বিচার পাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো কারণে যদি ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয় বা কোনো অসংগতি দেখা দেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আদালতে যেতে পারবেন না। তাঁকে অভিযোগ করতে হবে সংশ্লিষ্ট ডাইরেক্টর জেনারেলের কাছে। ডাইরেক্টর জেনারেল যদি দেখেন সরল বিশ্বাসে তাঁর অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব ফাঁস করে দিয়েছেন, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। তবে আর কেউ ফাঁস করলে ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ পাবেন।

এই ‘সরল বিশ্বাস’–এর সংজ্ঞা কী হবে? কোনো কিছুর ‘ফাঁস’ কি ‘সরল’ বিশ্বাসে হয়? আর কেউ যদি বোঝেন যে নিজের গরল বিশ্বাসকে ‘সরল’ প্রতীয়মান করতে পারলেই বেঁচে যাওয়া যাবে, তবে আর ‘গ’–এর জায়গায় ‘স’ বসাতে সমস্যা কোথায়? এটি একেবারে বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো হয়ে গেল, যেখানে নায়ক অপরাধ করলেও তার সর্বোচ্চ শাস্তি হয় না। ভালো আচার–আচরণের জন্য নির্ধারিত সাজাও কমে আসে। উল্টো কারাগারের ফটক থেকে বের হয়ে নায়ক পায় নায়িকাসহ একটি সুখী পরিবার! এ দেশে এমন বাস্তব উদাহরণ ঢের আছে। সুতরাং বিশ্বাস সরল, নাকি গরল—তার বিচার আদালত করলেই কি ভালো হতো না? তখন অন্তত একজন নাগরিক নিজের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাইতে পারতেন।

এমন আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো অন্যান্য দেশে হওয়া একই ধরনের আইনের উদাহরণ দেবেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় উদাহরণ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর জন্য জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর)। জিডিপিআরে আইনি প্রতিকার আদালতে পাওয়ার প্রবিধান আছে। চাইলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। সেই সুযোগ থাকলে আর একচ্ছত্র ক্ষমতা কারও হাতে থাকে না। আর কে না জানে, একচ্ছত্র ক্ষমতাই স্বেচ্ছাচারিতার মূল।

গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকের হাতেই সব ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাই এমনভাবে তৈরি যে নাগরিকদের হাতে থাকবে নাটাই। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যত্যয় হলে নাটাই বা ঘুড়ি কোনোটাই আর নাগরিকের হাতে থাকে না। নাগরিকেরা তখন শুধু ঘুড়ি ওড়ানো দেখে যায় আর অবচেতনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এখন খসড়া আইন অনুসরণ করে ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণও যদি সরকারের হাতে চলে যায়, তবে সেই দীর্ঘশ্বাসও আটকে রাখতে হবে। নাগরিকেরা হয়ে যাবে সুতোয় নাচানো পুতুলের মতো, একেবারে ‘যেমনে নাচাও, তেমনে নাচি’!

জনগণের ইচ্ছা–অনিচ্ছার প্রতিফলন এমনিতেও এই বঙ্গে কমই দেখা যায়। আমাদের ট্যাঁকের খবর না নিয়েই যখন–তখন বাড়ে চাল–ডাল–তেলের দাম। কখনো আবার আমাদের সুবিধা–অসুবিধা অগ্রাহ্য করার দৃষ্টান্তও দেখা যায়। এবার আমার–আপনার হাঁড়ির খবর যদি অন্যের কাছে নাগরিকবান্ধব নিয়ম না মেনেই বর্গা দিতে হয়, তবে তো আর একান্ত নিজের বলতে বাকি কিছু রইল না। অন্তত এ ক্ষেত্রে নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণটুকু কি নাগরিকের হাতেই রাখা যায় না?

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন