হাইকোর্ট
হাইকোর্টফাইল ছবি

স্বামীর রেখে যাওয়া কৃষিজমিতে হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার আছে বলে এক রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। খুলনার এক হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে করা রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে গত বুধবার বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় দেন। মামলাসংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।


সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর তথ্যমতে, খুলনার রাজবিহারী মণ্ডলের দুই ছেলে জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল ও অভিমন্যু মণ্ডল। অভিমন্যু মণ্ডল ১৯৫৮ সালে মারা যান। এ অবস্থায় মৃত ভাইয়ের স্ত্রী (গৌরীদাসী) কৃষিজমি পাবেন না, শুধু বসতভিটা থেকে অর্ধেক পাবেন—এমন দাবি নিয়ে ১৯৮৩ সালে নিম্ন আদালতে (খুলনার সাব-অর্ডিনেট জজকোর্ট) মামলা করেন জ্যোতিন্দ্রনাথ। মামলায় পক্ষ যথাযথভাবে না করায় ১৯৯৬ সালে তা খারিজ করে রায় দেন আদালত। তবে গৌরীদাসী কৃষিজমির সম্পত্তি পাবেন না বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

আইনজীবীর তথ্য অনুসারে, ওই রায়ের বিরুদ্ধে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আপিল করেন জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল। ২০০৪ সালে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ আদালত রায় দেন। রায়ে বসতভিটা ও কৃষিজমিতে গৌরীদাসীর অধিকার থাকবে বলা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন আবেদন করেন জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল। এর শুনানি শেষে বুধবার আদালত আবেদনটি (রুল ডিসচার্জ) করে রায় দেন।


আদালতে জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডলের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. আবদুল জব্বার। গৌরীদাসীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ নাফিউল ইসলাম। এ ছাড়া অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে (আদালতে আইনি সহায়তাকারী) শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী উজ্জ্বল ভৌমিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম আশরাফুল হক জর্জ।

আদালত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ১৯৩৭ সালের আইনে যেহেতু কৃষি-অকৃষিজমির পার্থক্য করা হয়নি, অতএব বাংলাদেশে কৃষি-অকৃষিজমির কোনো পার্থক্য করা হবে না। কৃষি-অকৃষি উভয় জমিতেই হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার আছে বলে পর্যবেক্ষণে বলা হয়। এটা কোনো নতুন রায় না। আমাদের প্রচলিত আইনেরই একটি ব্যাখ্যা।
উজ্জ্বল ভৌমিক, আইনজীবী

আইনজীবী উজ্জ্বল ভৌমিক বলছেন, ‘আদালত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ১৯৩৭ সালের আইনে যেহেতু কৃষি-অকৃষিজমির পার্থক্য করা হয়নি, অতএব বাংলাদেশে কৃষি-অকৃষিজমির কোনো পার্থক্য করা হবে না। কৃষি-অকৃষি উভয় জমিতেই হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার আছে বলে পর্যবেক্ষণে বলা হয়। এটা কোনো নতুন রায় না। আমাদের প্রচলিত আইনেরই একটি ব্যাখ্যা।’

আইনটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন উজ্জ্বল ভৌমিক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৩৭ সালে ‘হিন্দু উইমেন্স রাইটস টু প্রপার্টি অ্যাক্ট’ বা হিন্দু নারীর সম্পত্তি অধিকার আইন হয়। সেই আইন অনুসারে স্বামীর কৃষি-অকৃষি উভয় জমিতে বিধবা নারীর অধিকারের কথা আছে।

স্বামীর রেখে যাওয়া বসতভিটায় হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে কৃষি-অকৃষি সম্পত্তিতে বিধবা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।

এই আইনের আগে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, তাঁদের ছেলে বা ছেলের ছেলে থাকলে বিধবারা সম্পত্তি পেতেন না। আইনটি করার কারণই হচ্ছে, ছেলেদের সঙ্গে বা ছেলের ছেলেদের সঙ্গে বিধবাদের সম্পত্তির সমান ভাগ দেওয়া।১৯৩৭ সালের আইনটি ১৯৭২ সালে গ্রহণ করে বাংলাদেশ।


এই রায়ের ভিন্নতা কোথায় বা কেন, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী উজ্জ্বল প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন বিচারকের দেওয়া রায়ে আইনটি এত দিন ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের একটি রায়ে বলা হয়েছিল, হিন্দু বিধবারা স্বামীর কৃষিজমিতে অধিকার পাবেন না। আবার বিচারপতি মোস্তফা কামাল রায়ে (৩৪ ডিএলআর) বলেছেন, ‘কৃষিজমিতে অধিকার পাবেন। ভাগ-বাঁটোয়ারার মামলায় এ রকম সাংঘর্ষিক রায়ও আছে আমাদের। কিন্তু ফেডারেল কোর্টের রায়ে কৃষিজমির যে বিষয়টি, সেটাকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট রায় আগে আসেনি। এবারের মামলাটিতে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে এল।’

বিজ্ঞাপন

ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ অ্যারোমা দত্ত এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। অ্যারোমা দত্ত বলেন, এ রায় দেশের হিন্দু সমাজের বিধবা নারীদের জন্য একটি মাইলস্টোন। ভবিষ্যতে সব হিন্দু নারীর সম্পত্তিতে সমান অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে এই রায় বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।


আইন কমিশন বাংলাদেশ ২০১০ সালে হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারে একটি প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে হিন্দু পারিবারিক আইনের ইতিহাস, ক্রমবিবর্তন এবং বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এর পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের সংস্কারে একগুচ্ছ সুপারিশ উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘হিন্দু আইন সংস্কারের বিষয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু দায়ভাগ আইন অনুযায়ী, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পাঁচজন নারী উত্তরাধিকারী হচ্ছেন—বিধবা, কন্যা, মা, বাবার মা, বাবার বাবার মা। নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে তাঁরা সম্পত্তি ভোগের অধিকার পান। এরূপ সম্পত্তির অধিকার “উইডোজ এস্টেট” হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের অধিকারে বিধবারা শুধু জীবনস্বত্বে সম্পত্তি ভোগের অধিকার পান, অর্থাৎ জীবন অবসানের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পত্তি পূর্ব-মৃত ব্যক্তির পুরুষ উত্তরাধিকারীর কাছে চলে যায়। সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া (লিগ্যাল নেসেসিটি) এই সম্পত্তি হস্তান্তর করার অধিকার বিধবা নারী উত্তরাধিকারীদের নেই।’


উজ্জ্বল ভৌমিক বলেন, এবার যে রায় এসেছে, তাতে জীবনস্বত্বে সম্পত্তি ভোগের অধিকারে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন