টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করছেন। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ছড়াচ্ছে কোচিং সেন্টার, গাইড বই ব্যবসায়ী, ফটোকপির দোকানদার, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবক ও বন্ধুবান্ধব। এ কাজে আর্থিকভাবে লেনদেন হয় ২০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস: প্রক্রিয়া, কারণ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক এ প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করেন সংস্থাটির উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক নিহার রঞ্জন রায় ও রুমানা শারমিন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তথ্যের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত চার বছরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেটসহ (এইচএসসি) পাবলিক পরীক্ষায় মোট ৬৩টি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসির প্রায় সব বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। তবে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রবণতা শুরু হয় ১৯৭৯ সালে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশ্ন তৈরি, ছাপানো ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের সম্পৃক্ততা ছাড়া প্রশ্ন ফাঁস সম্ভব নয়। জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, প্রশ্নপত্র মুদ্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বিজি প্রেস, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পরীক্ষা কেন্দ্র, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষেত্রে এককভাবে ২০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা এবং গোষ্ঠীগতভাবে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পর্যন্ত আর্থিক লেনদেন হয়। টাকা ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক, ওয়েবসাইট, মুঠোফোন ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমেও ছড়ানো হচ্ছে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন। কোচিং সেন্টারগুলো ফাঁস হওয়া প্রশ্ন বাজারজাত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আর গাইড বই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সৃজনশীল অংশের প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারীদের মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে।
প্রশ্ন ফাঁসের কারণ: টিআইবি বলছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টিকে অস্বীকার করার প্রবণতা, প্রশ্ন প্রণয়নে দীর্ঘ ধাপ (৪০টি), জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া, একই শিক্ষককে প্রতিবছর প্রশ্নপ্রণেতা হিসেবে নিয়োগ, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে বিকল্প প্রশ্নপত্র না থাকা ও বিজি প্রেসে প্যাকেটজাত করার জন্য প্রশ্ন হাতে গণনা করার সময় প্রশ্ন দেখে নেওয়ার সুযোগ থাকায় প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে।
১৯ ধাপে প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি: প্রশ্ন প্রণয়ন ও ছাপানোর সময় তা ফাঁসের বেশ কিছু ঝুঁকি রয়েছে। বিতরণের পর্যায়ে থানায় বা ভল্টে সংরক্ষণ করে চাবি পিয়নের কাছে রাখার মধ্যে ঝুঁকি আছে। পরীক্ষার আগের দিন ট্রাংক খুলে প্রশ্নপত্র যাচাই করে দেখে আবার সিলগালা করার সময়ও ঝুঁকি থাকে। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে প্রশ্নপত্র দেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের আগেই প্যাকেট খুলে শিক্ষকদের একাংশ মুঠোফোনে প্রশ্নের ছবি তুলে ম্যাসেজ, ই-মেইল বা ভাইবারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে ও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
সুপারিশ: প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ছাপানো ও বিতরণের কাজ পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল করা, আইনে শাস্তির মেয়াদ বাড়ানো, বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) প্রশ্ন-ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে তুলে দেওয়া ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার জন্য প্রতি বিষয়ে একাধিক প্রশ্নপত্রের সেট রাখাসহ সাতটি সুপারিশ করেছে টিআইবি।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তাঁরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মতবিনিময় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে তাদের জানানো হয় শিক্ষামন্ত্রী মতবিনিময় করতে আগ্রহী নন।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠানে টিআইবির প্রতিবেদন বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন এখনো দেখেননি। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। টিআইবি গণমাধ্যমের এসব খবরও দেখুক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন