default-image

সরকারি দলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকাটা এখন অনেকের ‘টাকা কামাই, উচ্চ পদে বসা, নতুন নতুন সুবিধা পাওয়া এবং অন্যায় করলে পার পেয়ে যাওয়ার রাস্তা’ বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, সরকারি দলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে প্রশাসন এবং অন্য ক্ষমতাবানদের সমর্থন পাওয়া যায়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা—সর্বত্রই এখন টাকার জন্য অস্থিরতা ও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব জায়গায় প্রশ্ন তোলাটা একটা বড় কাজ।

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক গণসমাবেশে অংশ নিয়ে আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন। দেশে ধর্ষণ-নিপীড়ন বন্ধ, বিচারসহ ৯ দফা দাবিতে বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র-নারী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।

অপরাধীরা যখন ক্ষমতাবান হয়ে যায়, ক্ষমতার সঙ্গে থাকে; তখন তাদের অপরাধের কোনো সীমা থাকে না।
আনু মুহাম্মদ

কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, ধর্ষণ হচ্ছে যৌন–সন্ত্রাস। যারা ধর্ষণের অপরাধে অপরাধী, তারা ক্ষমতাবান। তারা সরকারি ক্ষমতা, তথা পুলিশ-প্রশাসনের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকে। সেই ক্ষমতার জোরে তারা জমি-দোকান দখল করে, মানুষের ওপর অত্যাচার করে, দেশজুড়ে চাঁদাবাজি করে এবং বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে কখনো সহযোগী হিসেবে যুক্ত থাকে, কখনো ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটায়। অপরাধীরা যখন ক্ষমতাবান হয়ে যায়, ক্ষমতার সঙ্গে থাকে; তখন তাদের অপরাধের কোনো সীমা থাকে না। সেটা নারী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, শ্রমিক, শিশু—সবার ওপরে আসে। তার কাছে যারাই দুর্বল, তাদের ওপরই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা ধর্ষণ এবং ধর্ষণের সঙ্গে খুনের যে পরিসংখ্যান দেখি, তা বাস্তব চিত্রের খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ। এ ক্ষেত্রে পুলিশ দপ্তরের পরিসংখ্যান কিংবা পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলো আমরা পাই। সাধারণত মামলা হলে তার খবর আমরা পত্রিকায় পাই। সেই খবরগুলো একসঙ্গে করে আমরা বছরের পরিসংখ্যানটা পাই। কিন্তু বাস্তবে মামলার চেয়ে বহুগুণ বেশি অপরাধ হয়। কারণ, মামলা করার জন্য যে শক্তি, সাহস ও পরিস্থিতি দরকার; সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্যাতিত বা নিপীড়িত ব্যক্তিদের থাকে না। এই না থাকার কারণ তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান। আরেকটা কারণ হলো তাদের অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা থেকে তারা দেখে যে তার পাশের বা পরিচিত কেউ মামলা করার পর কত রকম হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়!’

default-image

দেশের প্রচলিত কিছু আইনের সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের আইন এত ত্রুটিপূর্ণ, পুরুষতান্ত্রিক, নির্দয় ও নির্মম যে এগুলো প্রয়োগ করে যে বিচারকাজ চালানো হয়, সেখানে নির্যাতিত নারী আরও বহুবার নির্যাতিত হন। তাঁর পরিবারের ওপর একটা চাপ, হুমকি ও নিরাপত্তার সমস্যা থাকে। একজনের মামলার জন্য আরও ২০ জনের জীবন বিপন্ন হয়। এসব জটিলতার কারণে অনেকে মামলাও করতে পারেন না। ফলে অত্যাচার-নির্যাতনের অনেক ঘটনার খবরই পত্রিকায় আসে না। ধর্ষণের বাইরে যৌন–সন্ত্রাস ও নিপীড়ন ঘরের ভেতরেও হয়।’

ঘরে-বাইরে, পথে–ঘাটে, ওয়াজে কিংবা রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয় অনেকের মুখেই আমরা শুনি যে পোশাকের জন্যই নারী ধর্ষিত হচ্ছে। এই কথাটা যাঁরা বলেন, তাঁরা অপরাধীদের অপরাধকে আড়াল করতে চান, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেন। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির যাঁরা দোষ খোঁজেন, তাঁরা আসলে ধর্ষক বা সন্ত্রাসীর পক্ষে যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করেন।

ওয়াজের বক্তাদের উদ্দেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘যাঁরা ওয়াজ করেন, তাঁদের আমরা আহ্বান জানাই—আপনারা ওয়াজে ধর্ষক, সন্ত্রাসী, দেশ লুটপাটকারী, নদী দখলকারী, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারকারী, সুন্দরবন ধ্বংসকারী, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করছে যারা, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলুন। তা না করে সারাক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় থাকা নারীর ওপর আপনাদের অনেকের এত বিদ্বেষমূলক দৃষ্টি কেন? নির্যাতিত নারীর দোষ খুঁজে আপনারা নির্যাতকের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন কেন? ওয়াজের বক্তা ও শ্রোতা—উভয়কেই আমরা এই প্রশ্ন করতে চাই।’

default-image

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফয়েজ উল্লাহর সঞ্চালনায় হওয়া এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (বাসদ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন। সমাপনী বক্তব্যে নাসির অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ আজ একটি ব্যর্থ ও মৃত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এখানে মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। দেশে ভাতের অধিকার নেই, ভোটের অধিকারকেও ক্ষমতাসীন সরকার অপসৃত করেছে। প্রতিবাদের স্পর্ধাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে দমনের চেষ্টা হচ্ছে। সরকারের উন্নয়নের মহাসমারোহের নিচে হাজার হাজার মানুষের কান্না ও গোঙানি শোনা যায়। নির্যাতন-নিপীড়নকে ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের ফ্যাশনে পরিণত করেছে।

নাসির উদ্দিন জানান, ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে আগামীতে তাঁরা জেলায় জেলায় সমাবেশ ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ধর্ষণ, নিপীড়ন ও বিচারহীনতাবিরোধী কনভেনশন করবেন। এরপর ঢাকায় ধর্ষণ, নিপীড়ন ও বিচারহীনতাবিরোধী জাতীয় কনভেনশন করবেন তাঁরা।

গণসমাবেশে অন্যদের মধ্যে নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, সিপিবির নারী সেলের সদস্য মাকসুদা আক্তার, যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অমল ত্রিপুরা, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (মার্ক্সবাদী) সভাপতি মাসুদ রানা, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক দিলরূবা নুড়ি, প্রীতিলতা ব্রিগেড, ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী আসমানী আশা প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশের আলোচনা পর্বের আগে গান পরিবেশন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি তুহিন কান্তি দাস, গান ও নাচ পরিবেশন করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন