বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে ন্যস্ত আছে। তাঁদের প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া আছে। তাঁরা বুধবার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বসবেন। সেখানে কী সিদ্ধান্ত হয়, তা গণমাধ্যম জানতে পারবে। তিনি বলেন, ‘কোথাও পরিস্থিতি একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নির্বাচন বন্ধ করার বিষয় আসে। দেখা যাক কী হয়।’ সহিংসতার বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

এবার দ্বিতীয় ধাপে ৮৪৮টি ইউপিতে নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু সোমবার শরীয়তপুরের চিতলিয়া ইউপির নির্বাচন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চিতলিয়ায় সদস্য প্রার্থীদের সই জাল করে তাঁদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ইসি সচিবালয় থেকে তদন্তের পর ওই ইউপিতে নির্বাচন বাতিলের ঘোষণা এল।

৬ জেলায় নিহত ১৫

মাগুরা সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়নে দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের বিরোধের জের ধরে গত ১৫ অক্টোবর সংঘর্ষ হয়। এতে দুই ভাইসহ চারজন নিহত হন। ঘটনার পর থেকেই এলাকা থমথমে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। ভোট নিয়েও রয়েছে শঙ্কা।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান সদস্য নজরুল ইসলাম ও একই ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী সৈয়দ হাসানের আধিপত্য বিস্তার ঘিরেই এ হত্যাকাণ্ড হয়। যেখানে দুই পক্ষের করা মামলায় ১২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে একটি মামলার প্রধান আসামি নজরুল ইসলামসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই জগদল গ্রামের একটি অংশ পুরুষশূন্য রয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ওই ওয়ার্ডে নজরুল ইসলাম ও সৈয়দ হাসান দুজনই নির্বাচনে লড়ছেন।

জগদল ইউপির নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো প্রার্থীর যোগসূত্র আছে কি না, সেটা পুলিশ বলতে পারবে। ওই ঘটনায় কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নরসিংদী সদর ও রায়পুরা উপজেলার দুটি ইউপিতে নির্বাচনী সহিংসতায় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী ইউনিয়নে তিনজন ও সদর উপজেলার আলোকবালী ইউনিয়নে আরও তিনজন রয়েছেন। রায়পুরার পাড়াতলী ইউনিয়নের কাচারিকান্দি গ্রামের ঘটনাটি ঘটে ২৮ অক্টোবর ভোরে। আর ৪ নভেম্বর ভোরে সদরের আলোকবালী ইউনিয়নের নেকজানপুর গ্রামে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

দুই ইউনিয়নের অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৬ জনের মৃত্যু ও শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর থেকেই দুই এলাকায় সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অবশ্য পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা নিয়মিতভাবে টহল দেওয়ায় আপাতত স্বস্তি পাচ্ছেন ওই এলাকার ভোটাররা। পুলিশ বলছে, নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় পৃথক চারটি মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জানতে চাইলে নরসিংদীর জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মেছবাহ উদ্দিন বলেন, ‘যেকোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেহেতু ফৌজদারি অপরাধ, তাই এটি পুলিশের ব্যাপার। এর সঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধির সম্পর্ক না থাকায় আমাদেরও কোনো ভূমিকা নেই। তাই এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া যায়নি।’

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামে নির্বাচনী সংঘর্ষে নিহত হন এক ব্যক্তি। ২৪ অক্টোবরের ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা হয়েছে সালথা থানায়। এ পর্যন্ত ৩৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওই ইউনিয়নের রিটার্নিং কর্মকর্তা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সৈয়দ ফজলে রাব্বি জানান, ওই ঘটনায় আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে এমন কোনো লিখিত আবেদন তাঁর কাছে জমা পড়েনি।

সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক আলাউদ্দিন ওরফে আলাল (৪৫) প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন। তাঁর বাড়ি জালালাবাদ ইউপির আলীনগর গ্রামে। পুলিশ জানায়, ২৩ অক্টোবর দুই ইউপি সদস্যের বচসার জের ধরে হামলার ঘটনা ঘটে। রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে আবদুল হামিদ নামের এক ইউপি সদস্য প্রার্থীসহ ১০ জনকে আটক করে। পরদিন এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ আটক ১০ জনকে গ্রেপ্তার দেখায়।

সিলেট সদর উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমদাদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সভায় আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে ঘটনাটি পূর্ববিরোধের জের ধরে ঘটেছে। এ জন্য আমরা মনে করছি, ভোটের দিন এ ঘটনার সূত্র ধরে কোনো সহিংসতা ঘটবে না।’ আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি বলে জানিয়েছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউপির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় পাঁচটি ইউনিয়নের তিনটিতেই আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে। নির্বাচন ঘিরে এসব এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই হুমকি-ধমকি ও হামলার ঘটনা ঘটছে। উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নে সদস্য প্রার্থীদের মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে গত শনিবার রাতে আবদুর রশিদ নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে।

এমন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেওয়া নিয়ে ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। কায়েতপাড়া ইউনিয়নের মাঝিনা এলাকার আলেকা বানু নামের এক ভোটার প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শঙ্কা আছে।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। সেখানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে পূর্বশত্রুতার জের ধরে এই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়নে সহিংসতার ঘটনায় বিধি অনুযায়ী প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’

এ ছাড়া সোমবার মেহেরপুরের গাংনীতে নির্বাচনী সহিংসতায় দুই ভাই নিহত হয়েছেন। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু আনছার বলছেন, সহিংসতায় প্রার্থীদের যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয় খতিয়ে দেখতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা অপরাধী, তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নেতাদের হুমকি-ধমকি

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হুমাইপুর ইউপি নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে এক জনসভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন শুধু একে-৪৭-এর ব্যবহার করেই ক্ষান্ত না হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ৫ নভেম্বর বিকেলে হুমাইপুর ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা মাঠে এক জনসভায় আবদুল্লাহ আল মামুন এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ‘নৌকার ভোট কাইত্যার (বুথ বোঝাতে) তলে হবে না। হবে টেবিলের ওপর এবং ওপেন। যাঁরা কথা শুনবেন না, তাঁদের জন্য আছে হয়রানি।’

বাজিতপুর ইউপি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির। আওয়ামী লীগ নেতার উসকানিমূলক বক্তব্যের ঘটনার প্রতিকারে এখন পর্যন্ত ওই কর্মকর্তার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। হুমায়ুন কবির জানান, তিনি এক প্রার্থীর লিখিত অভিযোগের অনুলিপি পেয়েছেন। তাতে তাঁর তেমন কিছু করার নেই। কারণ, অভিযোগটি করা হয়েছে ইউএনও বরাবর। তাঁকে শুধু অবগত করা হয়েছে। তিনি অবগত হয়ে রইলেন।

ইউপি নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা ও থানা সম্পর্কে কুষ্টিয়ার মিরপুরে স্থানীয় যুবলীগ নেতা বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এক পথসভায় জেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলামের দেওয়া একটি বক্তব্যের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। সেখানে ইউপি নির্বাচনে পুলিশ নৌকার ভোট করে দেবে এবং ওই নেতার এমন কিছু ছেলেপেলে আছে, যাদের দিয়ে লড়াই করে থানাকে হটায়ে দিতে পারে, এমন বক্তব্য দেন। এ নিয়ে শনিবার প্রথম আলোতে ‘লড়াই করে থানাকে হটায়ে দিতে পারি, আমি সেই রবিউল’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

কুষ্টিয়ার জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি আমার জানা নেই। আর এই ঘটনা ঘটে থাকলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়োজিত কর্মকর্তা দেখবেন।’

নিহতদের সবাই সাধারণ মানুষ

৬ জেলায় নিহত ১৫ জনের সবাই সাধারণ মানুষ। তাঁরা কেউ চেয়ারম্যান, কেউ সাধারণ সদস্য প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থক ছিলেন।

ফরিদপুরের সালথার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামে নির্বাচনী সংঘর্ষে নিহত মারিজ সিকদার (৩৫) ওই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কর্মী স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিক মোল্লার সমর্থক ছিলেন।

সিলেট সদরের জালালাবাদ ইউপিতে সংঘর্ষে নিহত আলাউদ্দিন ওরফে আলাল (৪৫) আওয়ামী লীগ প্রার্থী ওবায়েদ উল্লাহ ইসহাকের সমর্থক ছিলেন। পেশায় ছিলেন মুদিদোকানি।

মাগুরায় নিহতদের মধ্যে কবির মোল্লা, সবুর মোল্লা ও রহমান মোল্লার বাড়ি জগদলের সৈয়দ রুপাটি দমদমাপাড়ায়। তাঁরা তিনজন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী সৈয়দ হাসানকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কবির ও সবুর মোল্লা সহোদর এবং রহমান মোল্লা তাঁদের চাচাতো ভাই। আর নিহত অপর তরুণ ইমরান মোল্লা একই ওয়ার্ডের বর্তমান সদস্য নজরুল ইসলামের সমর্থক ছিলেন।

নরসিংদীর রায়পুরার পাড়াতলী ইউনিয়নের কাচারিকান্দি গ্রামের নিহত তিনজন হলেন সাদির মিয়া (১৯), হিরণ মিয়া (৩৫) ও মো. সুলমান মিয়া (৪৫)। তাঁরা তিনজনই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া চেয়ারম্যান প্রার্থী ফেরদৌস কামালের সমর্থক। আর সদর উপজেলার আলোকবালী ইউনিয়নের নেকজানপুর গ্রামের নিহত তিনজন মো. আশরাফুল (২০), আমির হোসেন (৫০) ও খুশি বেগম (৫৫) ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন সরকারের কর্মী-সমর্থক।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া ইউনিয়নে নিহত আবদুর রশিদ (৩৩) মাছিমপুর এলাকার মৃত জলিল মোল্লার ছেলে। মুড়াপাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য প্রার্থী তাওলাদ হোসেনের শ্যালক।

মেহেরপুরের গাংনীর কাথুলী ইউনিয়নের মাইলমারি গ্রামে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত দুই ভাই হলেন জাহারুল ইসলাম (৪৭) ও সাহারুল ইসলাম (৪৩)। তাঁদের বাবার নাম বাদশা মিয়া। নিহত জাহারুল মাছচাষি এবং সাহাদুল পেশায় কৃষক।


[প্রতিবেদন তৈরিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক প্রতিনিধিরা সহায়তা করেছেন]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন