বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সরকারের অনেক জায়গা থাকতে, বাগদা ফার্মেই কেন ইপিজেড করতে হবে—এমন প্রশ্ন রেখে সুলাতানা বলেন, ‘এখানে ইপিজেড নির্মাণ করা চলবে না। আমাদের রাষ্ট্রনীতিতে রয়েছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার উল্লেখ করছেন, তিনফসলি জমিতে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে না। কারণ, বাংলদেশে অনেক খাস ও পতিত জমি রয়েছে, যেখানে শিল্পকারখানা করা যায়। শিল্পকারখানা হলে উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থান হবে। সব ঠিক আছে, কিন্তু সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জমির দিকে সরকারের নজর পড়ে কেন?’

আজ সকাল থেকে নানান আয়োজনে গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল হত্যা দিবস পালিত হয়েছে। সকাল আটটায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার জয়পুর গ্রামে নির্মিত অস্থায়ী শহীদবেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মোমবাতি প্রজ্জ্বালন করা হয়। সকাল নয়টায় সাঁওতালপল্লি মাদারপুর ও জয়পুর গ্রাম থেকে তির–ধনুক, ব্যানার, বিভিন্ন দাবিদাওয়া–সংবলিত ফেস্টুন নিয়ে একটি শোক মিছিল বের হয়। মিছিলটি ১৫ কিলোমিটার পথ প্রদক্ষিণ করে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের কাটামোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বেলা সাড়ে ১১টায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের শুরুতে শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর প্রতিবাদী গণসংগীত পরিবেশিত হয়।

default-image

তিন সাঁওতাল হত্যা, সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের জমিতে তোলা বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগের বিচারের দাবিতে এসব কর্মসূচি পালিত হয়। সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) ও জনউদ্যোগ যৌথভাবে এসব কর্মসূচি পালন করে।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে। বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, এএলআরডির প্রধান নির্বাহী শামসুল হুদা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম ও সদর শাখার আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী, সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর কবীর, জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মারুফ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সবিন মুন্ডা, নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগের সদস্যসচিব প্রবীর চক্রবর্তী, সুজন প্রসাদ, সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন শেখ, সুফল হেমব্রম, প্রিসিলা মুর্মু, অলিভিয়া হেমব্রম প্রমুখ।

বক্তারা সাঁওতাল হত্যা দিবসে আট দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান। দাবিগুলো হচ্ছে— সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমিতে ইপিজেড নির্মাণ বন্ধ, তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার, বাপ-দাদার জমি ফেরত, নিহত ব্যক্তিদের নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং নিজস্ব ভাষায় পরিচালনা করা, স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন, বাড়িঘরে লুটপাটের ক্ষতিপূরণ, সাঁওতালদের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও চিনিকলের জমি ইজারা নেওয়া লুটপাটকারীদের বিচার।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকলশ্রমিক–কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯ পুলিশ সদস্য তিরবিদ্ধ ও ৪ সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে তিন সাঁওতাল শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ মারা যান। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই বসতি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। এসব ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মুরমু বাদি হয়ে ওই বছরের ১৬ নভেম্বর ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করেন। ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদি হয়ে উপজেলার সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান বুলবুল আহম্মেদসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে আরেকটি মামলা করেন।

default-image

পরে হাইকোর্ট মামলা দুটি এক করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) গাইবান্ধা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সাঁওতাল হত্যা মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জমা দেন। এই মামলার গুরত্বপূর্ণ ১১ আসামির নাম বাদ দিয়ে ৯০ জনের নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

একই সালের ৪ সেপ্টেম্বর মামলার বাদি থোমাস হেমব্রম অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি পিটিশন দেন। আদালত শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক পার্থ ভদ্র অধিকতর তদন্ত করতে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। সিআইডি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর আদালতে একই ধরনের অভিযোগপত্র দাখিল করে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি বাদি থোমাস হেমব্রম পুনরায় নারাজি দেন। এই নারাজির ওপর গত ১২ সেপ্টেম্বর শুনানি হয়।


বাদিপক্ষের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আগামী ৭ ডিসেম্বর নারাজি শুনানির ওপর আদেশ হওয়ার কথা। তিনি আরও বলেন, পিবিআই ও সিআইডি উভয় কর্তৃপক্ষ মূল আসামিসহ ১১ জনকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ফলে সাঁওতালরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

রাজশাহীতে মানববন্ধন

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তিন সাঁওতাল হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছর পূর্তিতে দ্রুত বিচারের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন হয়েছে। আজ বেলা ১২টায় রাজশাহী নগরের সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রাজশাহী মহানগর কমিটির আয়োজনে মানবন্ধন থেকে দ্রুত এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা হয়েছে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের রাজশাহী মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আন্দ্রিয়াস বিশ্বাসের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য খ্রিস্টিনা বিশ্বাস, সহসাধারণ সম্পাদক গণেশ মার্ডি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিভূতিভূষণ মাহাতো, রাজশাহী জেলা সাধারণ সম্পাদক সুশেন কুমার শ্যামদুয়ার, আদিবাসী যুব পরিষদ রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি উপেন রবিদাস, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নকুল পাহান, সাধারণ সম্পাদক তরুণ কুমার মুন্ডা, দপ্তর সম্পাদক পলাশ পাহান প্রমুখ।

এতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রশান্ত কুমার সাহা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ প্রামানিক দেবু, জনউদ্যোগ রাজশাহীর সদস্য সচিব জুলফিকার আহমেদ গোলাপ প্রমুখ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন