বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মৌসুম ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই তিন মাস। এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি সেন্টার, ক্যাটারিং ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায়ীরা সারা বছর এ সময়ের অপেক্ষাতেই থাকেন। কিন্তু গত জানুয়ারির শুরু থেকে চলমান টানা অবরোধ ও হরতালে অনুষ্ঠান হচ্ছে হাতে গোনা।
ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই ব্যবসায়ীরা। গত মৌসুমেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তাঁরা। এবার সেই ক্ষতি পোষানোর বদলে লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হচ্ছে।
গত মঙ্গল ও বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ১০টি কমিউনিটি সেন্টার, পাঁচটি চায়নিজ রেস্তোরাঁ, তিনটি ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান এবং তিনটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, আগাম ঠিক করা অনেক অনুষ্ঠান পরিস্থিতির কারণে বাতিল করছেন আয়োজকেরা। কেবল শুক্র-শনিবার কিছু অনুষ্ঠান হচ্ছে। তবে এগুলোতেও নির্ধারিত অতিথির সংখ্যা কমানো হচ্ছে। নতুন অনুষ্ঠানের বুকিং পাওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকা মহানগর কমিউনিটি সেন্টার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ধানমন্ডির প্রিয়াংকা কমিউনিটি সেন্টারের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, অবরোধ-হরতালে সেন্টারগুলোর ৫০ শতাংশের বেশি অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গেছে। কমিউনিটি সেন্টার এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যবসায়িক খাতগুলো হিসাবে নিলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। তিনি বলেন, ‘এ সময়টা আমাদের ব্যবসার মৌসুম। অথচ গত বছরের মতো এবারও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসা করা যায়নি।’
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মালিকানায় কমিউনিটি সেন্টার রয়েছে ৪৯টি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৬টি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৩টি। ঢাকা মহানগর কমিউনিটি সেন্টার মালিক সমিতির মতে, বেসরকারি কমিউনিটি সেন্টারের সংখ্যা শ খানেক। এর বাইরেও বিভিন্ন হোটেল, চায়নিজ রেস্তোরাঁয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটিতে গড়ে ২০-২৫টি অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু গত দেড় মাসে এসব কমিউনিটি সেন্টার ও প্রতিষ্ঠানে আগাম ঠিক করা অনুষ্ঠানের মধ্যে গড়ে ১০-১২টি বাতিল হয়েছে। কিছু অনুষ্ঠান পেছানো হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডের অঙ্গন কমিউনিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জালালউদ্দিন বলেন, ‘জানুয়ারিতে ২০টির মতো অনুষ্ঠানের বুকিং বাতিল করা হইছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল, ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) দিতে পারি নাই। কর্মচারীদের বেতন দিছি অর্ধেক।’
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মাসুম হাবিবের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল রংপুরে। বউভাতের জন্য ঢাকায় কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে অনুষ্ঠান পেছাতে বাধ্য হয়েছেন। মাসুম হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘কখন কোথায় পেট্রলবোমা হামলা হয়, তার তো নিশ্চয়তা নেই। তাই অনুষ্ঠান পিছিয়েছি। মানুষকে এভাবে জিম্মি করা তো কোনো আন্দোলন না।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৩টি কমিউনিটি সেন্টারের মধ্যে বর্তমানে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় নয়টিতে। এই সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা আবদুল বারি বলেন, ‘আয়োজকদের কাছ থেকে অনুষ্ঠানের তারিখ পেছানোর অনেক আবেদন পেয়েছি। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সেগুলো পেছাতে হচ্ছে।’
বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠান হওয়া চায়নিজ রেস্তোরাঁগুলোতেও পড়েছে হরতাল-অবরোধের প্রভাব। এসব অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও গুনছে লোকসান।
মিরপুর ১১ নম্বরের ইয়ানতাই চায়নিজ রেস্তারাঁর ব্যবস্থাপক জানে আলম বলেন, ‘এ সময়ের আয় দিয়ে আমরা সারা বছরের খরচ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আশানুরূপ অনুষ্ঠান না হওয়ায় এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চলতে হবে।’
ধকল ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানেও: অনুষ্ঠান বাতিলের ধকল পোহাতে হচ্ছে ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। ব্যস্ত মৌসুমের বিষয় মাথায় রেখে ক্রেতাদের সঙ্গে আগাম চুক্তি করেছে বেশির ভাগ ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান। ফখরুদ্দিন ফুড লিমিটেডের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও ফাইন্যান্স ব্যবস্থাপক মো. নাজির হোসেন বলেন, ‘এ সময়ে বিয়ে ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়। এই দেড় মাসে শুধু বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রেই আমাদের নির্ধারিত অনুষ্ঠান হয়নি ১৫-১৬টি। গত বছরও একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন