default-image

প্রথম আলো: সম্প্রতি ঢাকায় ইংরেজি মাধ্যমের এক স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটির পর নতুন করে আলোচনা উঠেছে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানভেদে অপরাধের ধরন নিয়ে। অভিযুক্ত ও ঘটনার শিকার দুজনই সচ্ছল পরিবারের ছেলে-মেয়ে। এ ধরনের অপরাধের কি নতুন কোনো মাত্রা আছে?

খন্দকার ফারজানা রহমান: ধর্ষণ পুরোপুরি মনোজাগতিক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। এর আগে নোয়াখালীর সুবর্ণচর, বেগমগঞ্জ বা সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনার চেয়ে ঢাকার কলাবাগানে স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যার মামলাটি বেশ আলাদা। আগেরগুলো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঘটলেও এ ক্ষেত্রে তা নয়। অপরাধের ধরনও ভিন্ন। ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া গেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে আর কোনো বস্তু ব্যবহার করা হয়েছে কি না। সম্মতিসূচক শারীরিক সম্পর্কেও অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি আবশ্যক ব্যাপার। সেখানে নারী বা পুরুষের কেউ কাউকে আঘাত করতে পারে না। আহত করার তো কথাই ওঠে না। কোথায় রাশ টানতে হয়, তা জানা ও উপলব্ধি করার ব্যাপার থাকে। এই ঘটনায় মেয়েটির যেভাবে রক্তপাত হয়েছে, তাতে নিশ্চিত করে বলা যায়, মেয়েটি কোনো এক পর্যায়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আইনের সংজ্ঞা অনুসারে এটি ধর্ষণ।
২০১৭-১৮ সালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের করা এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের ৭৭ শতাংশ পর্নোগ্রাফি দেখে থাকে। আরেকটি গবেষণায় দেখেছিলাম, অনেক ক্ষেত্রে সাড়ে ১৬ বছর বয়সেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রথম যৌনমিলনের অভিজ্ঞতা হয়। এতেই বোঝা যায়, কিশোর-কিশোরীর যথাযথভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা আমরা দিতে পারছি না। এখনকার প্রজন্মের কল্পনাশক্তি অনেক বেশি। তারা সৃজনশীল, আবার একই সঙ্গে বেপরোয়াও। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে আগের চেয়ে অভিভাবকত্বে দুর্বলতা বাড়ছে এবং সামাজিক নজরদারি কমে যাচ্ছে। সমাজ সম্ভাব্য ধর্ষক তৈরি করছে।

এ-জাতীয় ঘটনা ঘটার পেছনে কারণ কী?

খন্দকার ফারজানা রহমান: এই স্কুলছাত্রীর কথাটিই যদি বলি, ভবনটির অন্য বাসিন্দারা জানতই না যে ছেলেটা কাকে বাসায় নিয়ে এসেছে। কমিউনিটি পুলিশিং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন আরেকজনকে তথ্য দেয়। গ্রামে এই চর্চা থাকলেও শহরে তা উঠে গেছে। যা-ই ঘটুক না কেন, কেউ কাউকে কিছু বলে না। কোথায় কী ঘটছে, তা কেউ জানতেও চায় না। শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনেক বেশি ইতিবাচক শক্তি আছে। এই শক্তি ব্যবহার করে তাদের জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ভালো কিছু সৃষ্টি করতে পারছে না। আগে বিকেলবেলা ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলতে যেত। এখন সেই খেলার আসর কেড়ে নিয়েছে মুঠোফোন।
শহরের অনেক শিশু-কিশোর মুঠোফোনে ধ্বংসাত্মক মেজাজের গেম খেলে। গেমের চরিত্রগুলো একে অপরকে রক্তাক্ত করে হত্যা করে। পরিবেশগত শিক্ষা অনেক বড় বিষয়। শিশুরা চারপাশ থেকে দেখে দেখে শেখে। যদি তার দেখা চারপাশে নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ঘটতে থাকে, তবে তারা সেটাই শিখবে। গ্রাম ও শহর—দুই ধরনের শিশুর ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। নানা মাধ্যমে আমরা শিশু-কিশোরদের মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি ঢুকিয়ে দিচ্ছি। তারা অমানবিক চর্চা করতে শিখে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যা মামলার অভিযুক্ত তরুণের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে মনে হয়, তাঁর মধ্যে যৌনতা নিয়ে ফ্যান্টাসি ছিল। আমরা কি বয়ঃসন্ধির সময়ে যৌনতা নিয়ে কিশোর-কিশোরীদের ভেতর জন্ম নেওয়া নানা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাদের অকারণ কৌতূহল বা কোনো ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি?

খন্দকার ফারজানা রহমান: অভিযুক্ত ছেলেটির ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কিছু পোস্ট দেখে আমারও তা-ই মনে হয়েছে। যৌনতা নিয়ে তার এই ফ্যান্টাসি নিশ্চয় এক দিনে তৈরি হয়নি। সে আগেও অন্য মেয়ের ওপর তার এই ফ্যান্টাসি প্রয়োগ করে থাকতে পারে। নারী-পুরুষের সমতা ও নৈতিক শিক্ষা নিয়ে যত বেশি আলোচনা হবে, যৌনতা নিয়ে এ ধরনের ফ্যান্টাসি তত বেশি কমানো সম্ভব হবে। খোলামেলা কথা বলতে হবে। আমাদের দেশে যৌনতা নিয়ে কথা বলার ব্যাপারে সামাজিক ট্যাবু রয়েছে। যৌনতা নিয়ে কথা বলা মানেই অনেকে মনে করেন শুধু শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে কথাবার্তা। বিষয়টি মোটেই তা নয়। শারীরিকভাবে কে কেমন, কীভাবে কারও সুস্থতা নিশ্চিত হবে, পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকবে—এর সবই যৌনশিক্ষার মধ্যে পড়ে।
বস্তু ব্যবহারের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন শরীরের জন্য কতটা বিপজ্জনক, সেটা জানতে হবে। অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে, সমাজ এখন পরিবর্তিত হচ্ছে। তাঁদের নিজেদের সন্তানের জন্য ভরসাস্থল হতে হবে। সন্তানকে বোঝাতে হবে তারা যেন অযাচিত সম্পর্কে না জড়ায়, কোনো দুর্ঘটনা না ঘটায়। অভিভাবকের কাছ থেকে এবং শিক্ষকের কাছ থেকে জানতে না পেরে কিশোর-কিশোরীরা কৌতূহলের বিষয়গুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করে। এতে ভুল তথ্য আদান-প্রদানের ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ ধরনের ঘটনার পর বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব নিয়ে কথা উঠতে শুরু করেছে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যে আসলে কার কী দায়িত্ব?

খন্দকার ফারজানা রহমান: এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। শিশু অধিকার বিষয়ে বলতে গিয়ে একটি স্লোগানকে খুব জনপ্রিয় করা হয়েছে, ‘শিশুদের হ্যাঁ বলুন’। আমি তো বলব, কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের ‘না’ বলার চর্চাও করতে হবে। কেবলই ‘হ্যাঁ’ বলার চর্চা করতে থাকলে এরপর সাধারণ বিষয়েও ‘না’ বললে শিশুরা আর নিতে পারবে না। তাই শিশুদের শেখাতে হবে, তার সব চাহিদা পূরণ করার মতো নয় কিংবা অভিভাবকের পক্ষে সম্ভবও নয়। শিশুর চাহিদার তালিকা থেকে কিছু জিনিস তো বাদও দিতে হবে। সন্তানকে শুধুই তার ইচ্ছেমতো বড় হতে দিলে চারপাশে আগাছা জন্মাবে।
নজরদারির যে দায়িত্ব সমাজের রয়েছে, তা এখনকার সমাজ আর পালন করে না বললেই চলে। এ ধরনের ঘটনায় সমাজকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। একটি বাসায় অন্যায় কিছু ঘটতে দেখলে তা অন্যকে জানাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তার শিক্ষার্থীর নৈতিক শিক্ষার বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালীন মানসিক সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য স্কুলে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ করতে হবে, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে অনেক বড়। ধর্ষণের বিচারের জন্য আলাদা কমিশন ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা জরুরি।

default-image

২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুসারে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠ্যপুস্তকে শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য চালু করা হয়েছে। ‘জেনারেশন ব্রেক থ্রু’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে পাইলট পর্যায়ে ছেলেমেয়েদের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। ধর্মীয় গোষ্ঠীর একটি অংশের বিরোধিতা আছে। শিক্ষকেরাও স্বচ্ছন্দ নন। এ থেকে বেরোনোর উপায় কী?

খন্দকার ফারজানা রহমান: অধ্যায় হিসেবে শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পুস্তকে যতটুকু রয়েছে, তা ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। জেনারেশন ব্রেক থ্রু প্রকল্প পাইলট হিসেবে চলছে। ব্যাপক হারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি শুরু না হলে কোনো লাভ নেই। এ নিয়ে প্রতিবেদন দেখেছি। শিক্ষার্থী-শিক্ষক কেউই বিষয়টি নিয়ে তেমন স্বচ্ছন্দ নয় বলে খবর পাচ্ছি। শিক্ষকদের বুঝতে হবে, কোনো অধ্যায় স্ট্যাপলবন্দী করে রাখার দিন আর নেই। যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে শিক্ষা বাড়াতে হবে। নামে আপত্তি থাকলে ভিন্ন কোনো নামে শুরু করুন। মানবিক ও নৈতিক শিক্ষা নাম দিয়ে ১০০ নম্বরের কোর্স রাখুন। এর ব্যবহারিক প্রয়োগও রাখুন। মাসে অন্তত একটি ভালো কাজ করে শিক্ষার্থীদের নম্বর তুলতে হবে। সেটা হতে পারে একজন পথশিশুকে সাহায্য করার জন্য মা-বাবাকে বাধ্যবাধকতায় ফেলা। কাউকে সামান্যতম হলেও শ্রম দিয়ে সাহায্য করা, সেবা করা। নির্দিষ্ট বয়স হলে রক্তদানের মতো সামাজিক কার্যক্রমে জড়ানো। একটি পূর্ণাঙ্গ কোর্স আকারে থাকলে শিক্ষকেরাও আগে থেকে প্রস্তুত থাকবেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে থাকা সহপাঠী বা মেয়েবন্ধুকে ধর্ষণ করার ঘটনায় অনেকে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন। ছেলে ও মেয়েদের সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আমাদের কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার?

খন্দকার ফারজানা রহমান: সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন তা হচ্ছে সহমর্মিতা। একটা ছেলেকে তার বন্ধু ও সহপাঠীকে সহযাত্রী হিসেবে দেখতে হবে। ছেলেরা যদি নারী-পুরুষের সমতার শিক্ষা না পায়, তাহলে মেয়েদের সে কখনোই সমান চোখে দেখতে পারবে না। এখানেও সেই পরিবেশ থেকে শিক্ষার বিষয়টি চলে আসে, যা তাকে অর্জন করতে হবে তার পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। সাদা চোখে নারী-পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা সমান মনে না হলেও তারা যে যোগ্যতায় সমান, এ শিক্ষা তাদের দিতে হবে। জৈবিকভাবেও তো নারীরা পুরুষের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। কারণ, একজন নারী সন্তান জন্ম দেন। লিঙ্গসমতার শিক্ষার মাধ্যমে পুরুষকে জানতে হবে নারী কোন কোন যোগ্যতায় এগিয়ে।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণের মতো অপরাধে কিশোর বয়সে জড়িয়ে যাওয়ার পেছনে মাদক, আধুনিক প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো সম্পর্ক আছে কি?

খন্দকার ফারজানা রহমান: মাদক এমন এক বিষ, যা মানুষের ভালো-মন্দ বিচার করার বিবেচনাবোধ নষ্ট করে দেয়। মাদক নেওয়া কিশোর-তরুণদের এ কারণে ব্যাপকভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। অপরাধ সংঘটনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সরাসরি ভূমিকা নেই। তবে এটি কিশোর-তরুণদের ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে। মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে।

ঘটনা এড়াতে বেশির ভাগ সময় পরামর্শ দেওয়া হয় মেয়েটিকে ঘিরে। এতে কি ছেলেরা নিজেদের অপরাধ বিষয়ে ভারমুক্ত থাকে বলে মনে করেন?

খন্দকার ফারজানা রহমান: মানুষের মধ্যে ভিকটিমকে দোষারোপ করার একটা প্রবণতা রয়েছে। মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন ঘটনাটির জন্য তাঁকেও দোষারোপ করেছে কেউ কেউ। সংবেদনশীলতা তৈরি হওয়া ছাড়া এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। গণমাধ্যমের এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকার সুযোগ আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েটিকে দোষারোপ করে নেতিবাচক মন্তব্য করার মাধ্যমে অপরাধী পুরুষকে ভারমুক্ত করে দেওয়া হয়। মাথায় রাখতে হবে, এতে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। যে মেয়েটিকে সবাই দোষারোপ করছেন, সেই জায়গায় নিজের সন্তান বা পরিবারের সদস্যকে একবার রেখে ভেবে দেখুন তো কেমন লাগে। এ ধরনের অপরাধ আপনার পরিবারের সঙ্গেও ঘটতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে অপরাধীকে কখনোই ভারমুক্ত হওয়ার সুযোগ দেবেন না।

প্রথম আলো: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

খন্দকার ফারজানা রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন