default-image

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নামে ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বেঞ্চ রিডার মাহাবুব হোসেনসহ দুজন আজ মঙ্গলবার আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আরেক সাক্ষী হলেন ঢাকা ব্যাংকের ইপিজেড সাভার শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক আবু জাহিদ আনসারী। এই দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলার ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ঠিক করেছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ নাজমুল আলম।

আপিল বিভাগের বেঞ্চ রিডার মাহবুব হোসেন আদালতকে বলেন, তিনি ২০০১ সালে সাবেক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি বেঞ্চ রিডার পদে পদোন্নতি পেয়ে আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বেঞ্চ রিডার পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন, ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়াসহ তাঁর ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখতেন। ২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দেওয়া চেকের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখা থেকে ৮০ লাখ টাকা নগদ তোলেন।

এ ছাড়া তিনি একই ব্যাংকের একই হিসাব থেকে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার স্বাক্ষরযুক্ত চেকের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি আরও ৬০ লাখ টাকা নগদ তোলেন। পরে তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, তাঁর স্ত্রী ও তাঁর মেয়ের নামে সুপ্রিম কোর্টের পোস্ট অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কেনেন। বাকি টাকা ব্যাংক হিসাব থেকে তোলার পর তা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বুঝিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা ব্যাংকের কর্মকর্তা আবু জাহিদ আনসারী আদালতকে বলেন, সাভার ইপিজেড শাখায় শঙ্খজিৎ সিংহর ব্যাংক হিসাব ছিল। ২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট ওই ব্যাংক হিসাবের কাগজপত্র দুদকের পরিচালক বেনজির আহমেদের কাছে পাঠান। শঙ্খজিৎ সিংহের ব্যাংক হিসাব অনুযায়ী, ক্লিয়ারিং চেকের মাধ্যমে ২০১৮ সালের ৮ মার্চ ৭৮ লাখ টাকা জমা হয়। পরে ওই টাকা থেকে ১০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকার আলাদা এফডিআর হয়। এই মামলায় গত বছরের ১৩ আগস্ট সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।

কারাগারে থাকা তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতীকে (বাবুল চিশতী) কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
আদালতে হাজির ছিলেন জামিনে থাকা মামলার আসামি ফারমার্স ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ক্রেডিটপ্রধান গাজী সালাহউদ্দিন, ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম শামীম, ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা। মামলায় পলাতক চারজন। তাঁরা হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখার ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট লুৎফুল হক ও এস কে সিনহার কথিত পিএস রণজিৎ চন্দ্র সাহা এবং রণজিতের স্ত্রী সান্ত্রী রায় (সিমি)।
আদালতে উপস্থিত ছিলেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি ও শাহিনুর ইসলাম।

কীভাবে দুর্নীতি সংঘটিত হয় সে ব্যাপারে মামলার বাদী দুদক কর্মকর্তা সৈয়দ ইকবাল হোসেন আদালতকে বলেছিলেন, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা ও শাহজাহান তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) গুলশান শাখায় দুটি চলতি হিসাব খোলেন। পরদিন পৃথক দুটি হিসাবের বিপরীতে দুই কোটি করে মোট চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করা হয়। ঋণের আবেদনপত্রে ঠিকানা হিসেবে উত্তরার একটি বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয় যে বাড়ির মালিক সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের কর্মকর্তা মামলার আসামি জিয়াউদ্দিন আহমেদ, সফিউদ্দিন আসকারী ও লুৎফুল হক ঋণ আবেদন যাচাই-বাছাই না করে এই ব্যাংক এবং ব্যাংকের কোনো নীতিমালা না মেনেই ঋণ প্রস্তাব প্রস্তুত করেন। এতে নিজেরা সই করেন। আসামি জিয়াউদ্দিন আহমেদ ঋণ প্রস্তাবটি হাতে হাতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যান।

দুদক কর্মকর্তা বলেন, ফারমার্স ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় কোনো যাচাই-বাছাই না করে ওই ঋণ প্রস্তাব দুটি অনুমোদনের জন্য নোট আকারে উপস্থাপন করেন এবং ব্যাংকটির ক্রেডিট শাখার গাজী সালাউদ্দিনের কাছে নিয়ে যান।তিনিও কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীমের কাছে নথিটি নিয়ে যান। ব্যাংকের ঋণ পলিসি নীতি অনুযায়ী এই ধরনের ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের না থাকা সত্ত্বেও অবৈধ প্রক্রিয়ায় তিনি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেন। পরদিন ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন সাহার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুমোদিত ঋণের টাকা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নামে পে-অর্ডার আকারে ইস্যু করা হয়। ওই বছরের ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংক সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবে চার কোটি টাকা জমা হয়।

দুদক কর্মকর্তা সৈয়দ ইকবাল হোসেন আদালতকে আরও বলেন, সোনালী ব্যাংক সুপ্রিম কোর্ট শাখায় টাকা জমা হওয়ার পর এস কে সিনহা বিভিন্ন সময় টাকা তুলে তা হস্তান্তর স্থানান্তর করেন। এর মধ্যে ওই বছরের ২৮ নভেম্বর দুটি চেকের মাধ্যমে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তাঁর আপন ভাইয়ের শাহজালাল ব্যাংকের উত্তরা শাখার হিসাবে ১ কোটি ৪৯ লাখ ও ৭৪ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন। ওই টাকাও পরে স্থানান্তর রূপান্তর করা হয়। মামলার আসামি রণজিৎ চন্দ্র সাহা এই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের সময়ে নিজে ব্যাংকে উপস্থিত থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নাম উল্লেখ করে ভুয়া ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন। ঋণ আবেদনকারী নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা আসামি রণজিৎ চন্দ্র সাহার ভাইপো। অপর ঋণ আবেদনকারী শাহজাহান রণজিৎ চন্দ্র সাহার বাল্যবন্ধু। আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা দুজনই গরিব ও দুস্থ। তাঁরা ব্যবসায়ী নন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন