বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ন্যান্সি হক

প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী

জন্ম

৯ মে ১৯৮৩, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশে বাড়ি

কুমিল্লা

পড়াশোনা

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া

থেকে তড়িৎ কৌশলে স্নাতক, স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর, ইউসি বার্কলের হ্যাস স্কুল অব বিজনেস থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর

অর্জন

সিলিকন ভ্যালি বিজনেস জার্নাল-

‘ফোরটি আন্ডার ফোরটি ২০২০’

তালিকায় স্থান

ন্যান্সি হক মনে করেন, প্রযুক্তিবিশ্বে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কম। এটা তিনি বলছেন প্রযুক্তি দুনিয়ার রাজধানীখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে বসে, অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাডোবিতে কাজ করে। তাই তো লিডারশিপ ক্যালিফোর্নিয়ার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হয়ে নারীদের পেশাগত উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

অভিবাসী বাংলাদেশি পরিবারের মেয়ে ন্যান্সি হক পেশাগত ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ২০২০ সালে সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী সাময়িকী সিলিকন ভ্যালি বিজনেস জার্নাল-এর ৪০ বছরের নিচে ৪০ (ফোরটি আন্ডার ফোরটি) তালিকায় স্থান দিয়েছে ন্যান্সিকে। প্রযুক্তি ব্যবসায় খাতে সেরা নির্বাহী, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের নিয়ে এমন তালিকা প্রতিবছরই প্রকাশ করে এই জার্নাল। প্রযুক্তি খাতে যাঁরা ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবেন, তাঁদের নামই স্থান পায় তালিকায়। এটা প্রকাশের সময় ন্যান্সি হক সম্পর্কে সিলিকন ভ্যালি বিজনেস জার্নাল-এ তাঁর সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, ‘তাঁর পুরো পেশাজীবনে, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার জায়গা তৈরির পথ খুঁজে পেয়েছেন।’

ন্যান্সি যে শুধু নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ খুঁজে পেয়েছেন তা-ই নয়, অন্য নারীদের পথ বাতলে দেওয়ার কাজটিও করে যাচ্ছেন সমানতালে। গত এক বছরে সে কাজে আরও বেশি যুক্ত হয়েছেন ন্যান্সি। নিজের প্রতিষ্ঠান ‘দ্য পারস্যুট’ থেকে বিশ্বের সব দেশের নারীকে প্রযুক্তি খাতে এগিয়ে নিতে নানাভাবে সহায়তা করছেন তিনি। জানালেন, এখন তাঁদের বিভিন্ন উদ্যোগ ও আয়োজনে অ্যাডোবিও পৃষ্ঠপোষকতা করছে। ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা গ্লোবাল উইমেন অব চেঞ্জের সহপ্রতিষ্ঠাতা ন্যান্সি হক।

তোফাজ্জাল হোসেন ও শাহিদা হোসেন বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান ১৯৮১ সালে। তাঁরা ন্যান্সির বাবা-মা। ১৯৮৩ সালের ৯ মে জন্ম ন্যান্সি হকের। ছোট ভাই বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলার প্রকৌশলী। বাংলাদেশে তাঁদের বাড়ি কুমিল্লায়। বিয়েও করেছেন বাংলাদেশি এহসান হককে। তিনিও প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী, শীর্ষ ই-কমার্স ওয়েবসাইট আমাজনের প্রাইম ভিডিওর পণ্য ব্যবস্থাপক। ন্যান্সি-এহসানের দুই ছেলে আকিরা হক (১২) ও রেইদেন হক (১০)।

অভিবাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া সহজ কিছু নয়—এমনটা সব সময়ই মনে করেন ন্যান্সি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের প্রতি তাঁর বিশেষ টান। এক বছর আগে যখন কথা হচ্ছিল ন্যান্সির সঙ্গে, তিনি পড়ছিলেন কমলা হ্যারিসের লেখা দ্য ট্রুথস উই হোল্ড বইটি। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলা হলো, এখন কী পড়ছেন? ‘এখন পড়ছি না, লিখছি। জার্নালে, আমার ব্লগে লিখে যাচ্ছি। আর পড়াচ্ছি নানা জায়গায়।’ ন্যান্সির পড়ানোর জায়গাও কম নয়। ইউনিভার্সিটি অব বার্কলে, ক্যালিফোর্নিয়াতে লিডারশিপ কমিউনিকেশন বিষয়ে পড়াচ্ছেন দেড়-দু বছর ধরে। গত মাস থেকে পড়াচ্ছেন হ্যাস স্কুল অব বিজনেসে। যোগ করলেন, ‘সৌদি আরবেও পড়াই, রাতে। আসলে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে খুব পছন্দ করি।’

কোভিডের পর পৃথিবীর দৃশ্যপটই তো বদলে গেছে। নতুন স্বাভাবিক সময়ে বেড়েছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। এটা আরও বাড়বে বলে মনে করেন ন্যান্সি। ‘জীবনযাত্রায় মানুষ আরও বেশি ডিজিটাল অভিজ্ঞতা পাবে। এটা তো ঠিক আমরা সামনাসামনি কথা বলার, মেলামেশার কমফোর্টটা মিস করছি। তবে নতুন ধারাটাও মেনে নিতে হবে। স্কুল-কলেজ, অফিস ধীরে ধীরে খুলছে। তবে যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোভিডের সময় কাজ চলেছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমবে না, বরং বাড়বে।’

ন্যান্সি হকের পড়াশোনা ও পেশাজীবনের শুরুটা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। সবই ছিল প্রকৌশলবিদ্যা ঘিরে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া (ইউসি) স্যান ডিয়েগো থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক এবং স্যান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তিনি। পরে ইউসি বার্কলের হ্যাস স্কুল অব বিজনেস থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) করেন।

ন্যান্সি বলেন, ‘মটোরোলায় শুরু করি কর্মজীবন। সামরিক কাজের জন্য রেডিও সিস্টেম তৈরি করতাম। ৯ বছর ছিলাম সেখানে। এরপর ওপেন ইনভেস্টমেন্ট, সাইমেনটেকে কাজ করি।’ শেষে যোগ দিয়েছেন অ্যাডোবিতে, বছর আড়াই আগে। স্কার্ফ তৈরির একটি স্টার্টআপও ছিল তাঁর। অনলাইন ঘাঁটলে সেই স্টার্টআপের সফলতার খবরও দেখা যায়। ছয় মাসের মধ্যে ২০টি দেশের বাজারে বিক্রি হয়েছিল ন্যান্সির বর্ণিল সেই স্কার্ফগুলো।

এখন ব্যবস্থাপনা স্তরে এলেও ন্যান্সি মনে করেন না প্রকৌশলবিদ্যা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। বললেন, ‘অ্যাডোবি তো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান। ফলে প্রযুক্তি-প্রকৌশলের দুনিয়াতেই আছি। আর এখানে ভালো লাগার বিষয় হলো অ্যাডোবিতে প্রতিনিয়ত সৃজনশীলতা আর উদ্ভাবনের চর্চা চলে; সৃজনশীল পণ্যই যেহেতু আমরা তৈরি করি, বিপণন করি।’

ন্যান্সি হক বলে রাখলেন, ‘বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত ভেতর থেকে আমি দেখিনি। তবে যা বুঝি তা হলো, বাংলাদেশের প্রচুর শক্তি আছে, প্রচুর উৎসাহী তরুণ রয়েছে। প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে এসবই দরকার।’

আগেই বলেছি তাঁর পড়াশোনা ও পেশা প্রকৌশল আর ব্যবস্থাপনা ঘিরে। আবার প্রযুক্তি খাতে নারীদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার নানা উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত তিনি। এসবের বাইরে ন্যান্সির আছে রোমাঞ্চের প্রতি দারুণ আকর্ষণ। ‘শীতকালে আমরা চলে যাই পাহাড়ে স্কিয়িং করতে। পুরো পরিবার। দুই ছেলেই ন্যাশনাল স্কিয়িং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিচ্ছে। কোভিডের সময় তো টানা আড়াই মাস ছিলাম পাহাড়ে। সেখান থেকেই অফিসের কাজ করেছি।’

অভিবাসী পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠিত হতে তাঁকে কম কষ্ট করতে হয়নি। তবে অনুপ্ররণা বেশি পেয়েছেন মা-বাবার কাছ থেকেই। ‘তাঁরা আমাদের জীবন গড়ে দিয়েছেন।’ তবে তাঁর পেশাগত জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথেও বাধা কম ছিল না। নিজের জীবনবৃত্তান্তে ন্যান্সি লিখেছেন, তিনি কম বয়সে পরিবার শুরু করেছেন। স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকার সঙ্গেই শুরু হয়েছে তাঁর প্রকৌশলজীবন। বিয়ের পরই চলে যান সিঙ্গাপুর। সেখানে স্বামী এহসান হকের জন্য একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই সুযোগ তিনি পেয়েও ছিলেন। ন্যান্সির ভাষায়, ‘তিন বছর আমি দিনের বেলায় ছিলাম হোমমেকার—মা ও স্কার্ফ ডিজাইনার, আর রাতে ছিলাম রিমোট প্রকৌশলী। এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্য দিয়ে আমি আমার নিজের শক্তি খুঁজে পেয়েছি। শিখেছি কীভাবে এগিয়ে যেতে হবে।’

ন্যান্সি হক এখন যে জায়গায় পৌঁছেছেন, সেখান থেকেও নতুন লক্ষ্য তৈরি করে নিয়েছেন। চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিভিন্ন কোম্পানির নেতৃত্বের পদগুলোতে আরও বেশি নারীকে নিয়ে যেতে। যেন ফরচুন ৫০০ কোম্পানিতে নারীরা মহাব্যবস্থাপক পদে আসীন হতে পারে।

তাই তো যুক্তরাষ্ট্রের নারী বৈমানিক ও অভিযাত্রীদের পথিকৃৎ অ্যামলিয়া ইয়ারহার্টের (১৮৯৭-১৯৩৯) একটি উদ্ধৃতি ন্যান্সির খুব প্রিয়, ‘সবারই ওড়ার ইচ্ছা সমুদ্রসমান। যদি তাদের হৃদয় থাকে তবে তারা তা পারে। এটা কি দুঃসাহস? হয়তো তাই-ই। কিন্তু স্বপ্ন কি কোনো সীমানা মানতে পারে?’

  • পল্লব মোহাইমেন: প্রথম আলোর যুগ্ম ফিচার সম্পাদক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন