বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা বন্ধ, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার না করা, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) সঙ্গে রাতে সীমান্ত এলাকায় যৌথ টহল, সীমান্তরক্ষীরা আক্রান্ত না হলে গুলি না করাসহ কিছু পদক্ষেপের কারণে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন দুই দেশের সীমান্ত অনেক বেশি শান্ত বলে দাবি করেছে বিএসএফ।
বিএসএফের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের বাহিনী বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সীমান্ত রক্ষায় কাজ করছে। কিন্তু দুই স্থানে তাদের কাজের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তান সীমান্তে দায়িত্ব পালনের সময় বিএসএফের কাছে কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে, এমনকি সীমান্তে সন্দেহজনক নড়াচড়া বা শব্দ হলে তা লক্ষ্য করে গুলি করারও নির্দেশ আছে তাদের ওপর। অন্যদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে গুলি ও মারণাস্ত্র ব্যবহার না করতে সরকারের তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া আছে। বিএসএফ সদস্যরা আক্রান্ত হলেই কেবল গুলির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভিন্ন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে তাঁরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।
বিএসএফ মনে করে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দুই দেশের সরকারের মধ্যে কিছু সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। এর মধ্যে সীমান্তে হত্যাসহ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরু চোরাচালান দায়ী। এ ব্যাপারে দুই দেশের সরকারের মধ্যে কোনো সুরাহা হলে সীমান্তে অপরাধ অনেক কমে আসবে। এ ছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভিসা-প্রক্রিয়া সহজ করা, সীমান্তে আরও কিছু ‘সীমান্ত হাট’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবির সদস্যসংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত বলে তাদের মত। বিএসএফ মনে করে, এগুলোর দ্রুত সমাধান হলে সীমান্তপথে মানব পাচার, বিশেষ করে নারী পাচার ও মাদক পাচার বহুলাংশে কমিয়ে আনা যাবে।
গত রোববার কলকাতায় বিএসএফের অফিসার্স মেসে বিএসএফের সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার্সের মহাপরিদর্শক (আইজি) সন্দ্বীপ সালুঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। ভারত সরকারের কঠোর নির্দেশ আছে সীমান্তে গোলাগুলি করা যাবে না। তাঁরা সেটা মেনে চলছেন। বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তে চোরাকারবারি ও অপরাধীদের দ্বারা আক্রান্ত না হলে গুলি করছেন না। কেননা বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র থাকে। লাঠি ও অন্য কিছু নয়।
সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার্সের প্রধান বলেন, ‘বিএসএফ সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষ ও গণমাধ্যমের ভুল ধারণা রয়েছে। আমরা মনে করি, এর অবসান হওয়া উচিত। সীমান্তে যখন অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তখন তারা বাংলাদেশ না ভারতের, তা দেখা হয় না। বাংলাদেশে ধারণা আছে, গুলিতে কেবল বাংলাদেশিরাই মারা যায়। অথচ বিএসএফের গোলাগুলিতে প্রায় সমসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক, যারা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত, তারাও মারা পড়ছে। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের নাগরিকেরাই যৌথভাবে সীমান্তে চোরাচালািন ও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত।’ তিনি বলেন, সীমান্তের কিছু সমস্যার সমাধান বাংলাদেশ-ভারত সরকার করতে পারলে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। বিএসএফও ভারত সরকারকে সময়ে সময়ে বিভিন্ন প্রস্তাব করে।
বিএসএফের সাউথ ফ্রন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ১৫৭ কিলোমিটার সীমান্তে হত্যা কমে এসেছে। ২০১৪ সালে এই সীমান্তে একজন বাংলাদেশি নাগরিক মারা গিয়েছিল। এর আগের বছর ২০১৩ সালে ছয়জন, ২০১২ সালে তিনজন ও ২০১১ সালে চারজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিএসএফের হাতে ভারতের সাতজন নাগরিক নিহত হয়েছে। বিএসএফ দাবি করেছে, এই চার বছরে ভারত ও বাংলাদেশি চোরাকারবারিদের হাতে তাদের দুজন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং মারাত্মক আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন আরও অন্তত পাঁচজন সদস্য।
বিএসএফের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেন, ভারতের দিক থেকে গরু রপ্তানি অবৈধ, কিন্তু ভারতের গরু বাংলাদেশে আনাকে বাংলাদেশ অবৈধ মনে করে না। একই ধরনের সমস্যা ফেনসিডিলের ক্ষেত্রে। ভারতে ফেনসিডিল তৈরি ও বিক্রি অবৈধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটা অবৈধ। এ দুটি ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য দুই দেশের যৌথ টহল জরুরি। ইতিমধ্যে সীমান্তের কিছু কিছু স্থানে যৌথ টহল শুরু হলেও এটা আরও বিস্তৃত করতে চায় ভারত। এ ক্ষেত্রে বিজিবিকে সীমান্তে সদস্যসংখ্যা বাড়াতে হবে।
সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার্সের মহাপরিদর্শক (আইজি) সন্দ্বীপ সালুঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের সীমান্তে আরও ‘হাট’ তৈরির জন্য বিজিবি প্রস্তাব করেছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবৈধ অনুপ্রবেশ কমবে। পাশাপাশি চিকিৎসাসহ অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভিসা-প্রক্রিয়া সহজ হলে সীমান্তে আরও শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করবে বলে তাঁরা সরকারকে বলেছেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন