>

আটটি আন্তনগর ট্রেন দিয়ে যাত্রী পরিবহন শুরু হবে। অর্ধেক আসনের টিকিট বিক্রি হবে। লঞ্চের ডেকে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখার চিন্তা। সড়ক পরিবহন নিয়ে জটিলতা আছেই। শুক্রবার পরিবহন ও লঞ্চ খাতের মালিক–শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক।

সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে আগামী রোববার থেকে বাস, ট্রেন, লঞ্চ সীমিত আকারে চালানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেনের সংখ্যা এবং টিকিট বিক্রি কমিয়ে সীমিত চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। লঞ্চের শুধু ডেকে যাত্রী পরিবহন কমিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে সড়ক পরিবহনে কীভাবে সীমিত যাত্রী চলাচল নিশ্চিত করা হবে, সেটা নিয়ে সন্দিহান খোদ কর্তৃপক্ষই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) পরিবহন খাতের এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) নৌ খাতের মালিক–শ্রমিক নেতাদের নিয়ে শুক্রবার বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবে। আর রেলমন্ত্রী শনিবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করবেন।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, রোববার থেকে ৮টি আন্তনগর ট্রেন দিয়ে সীমিত আকারে ট্রেন চলাচল শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ৩ জুন থেকে আরও ৯টি আন্তনগর ট্রেন বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সব ট্রেনে নির্ধারিত আসনের অর্ধেক টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠকে এগুলো চূড়ান্ত করা হবে।

লঞ্চের ক্যাবিনে এমনিতেই সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকে। বিআইডাব্লিউটিএ শুধু ডেকে একেকজন যাত্রীর মধ্যে অন্তত ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়। লঞ্চ-মালিকদের নিয়ে বৈঠকে এটাই গুরুত্ব দেওয়া হবে। যাত্রী ও লঞ্চকে জীবাণুমুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হবে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানিয়েছে।

সরকার চাইলেই পরিবহনসংখ্যা কমাতে পারবে না—এই ব্যাপারে নিশ্চিত সড়ক মন্ত্রণালয়। এ জন্য তারা এই পথে কেউ হাঁটছে না। ফলে সর্বত্রই রোববার থেকে গণপরিবহন চালু হবে। তবে বাসে এক আসন বাদ দিয়ে যাত্রী বসানোর বিষয়টিতে জোর দিতে চায় সড়ক মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া দাঁড়িয়ে যাতে যাত্রী পরিবহন না করা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে চায় তারা।

মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এক আসন ফাঁকা রাখলে যাত্রীভাড়া বেড়ে যেতে পারে। সেটা কীভাবে ঠিক করা হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এর বাইরে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে রাইড শেয়ারিং সেবা আছে। সেখানে মোটরসাইকেলে কীভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হবে, সেই বিষয়ে বিআরটিএ এখনো কিছু ভাবেনি।

স্বাভাবিক সময়েই দূরপাল্লার এবং নগর পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এখন করোনা পরিস্থিতিতে যাত্রী কম পরিবহন করা হলে ভাড়া নিয়ে আরও জটিলতা হতে পারে বলে বিআরটিএ কর্মকর্তারা মনে করছেন। আবার কোনো কোনো পরিবহন মালিক–শ্রমিক বলছেন, মানুষের মনে ভয়–আতঙ্ক এখনো আছে। ফলে শুরুতে যাত্রী চাহিদা বেশি নাও হতে পারে। ফলে যাত্রী কম হলে বাসও কম চলবে।

জানতে চাইলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ইউসুফ আলী মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রী কম পরিবহন করা, বাসে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা এবং টার্মিনালগুলোতে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে জোর দেওয়া হবে। বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।

সারা দেশের পরিবহন-মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, তাঁরা পরিবহন চালু করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। এখন কীভাবে চালু করা হবে, তা বৈঠকে ঠিক হবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সীমিত বাস চালানোর সুযোগে পরিবহন খাতের মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে নেবেন। যাত্রী কম পরিবহন করলেও ভাড়া বাড়ানো উচিত হবে না। কারণ, পরে যাত্রী বেড়ে গেলেও তা আর কোনো দিন কমবে না। সরকারের উচিত প্রয়োজনে জ্বালানির মূল্য কমিয়ে দেওয়া। আর এটা ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া দরকার।


১৭ ট্রেন চালু হবে, টিকিট বিক্রি হবে অর্ধেক

আগামী রোববার থেকেই সীমিত আকারে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করবে রেলওয়ে। সংস্থাটির নেওয়া পদক্ষেপগুলো হচ্ছে—১. দুই দফায় ১৭টি আন্তনগর ট্রেন চালু করা হবে। ২. চলাচল করা ট্রেনের অর্ধেক আসনের টিকিট বিক্রি করা হবে। ৩. মাঝপথে কম যাত্রাবিরতি থাকবে। ৪. হ্যান্ড সেনিটাইজার এবং বাথরুমে সাবানের ব্যবস্থা করা হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে শতাধিক আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। রোববার থেকে ৮টি ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা–চট্টগ্রাম পথের সোনার বাংলা ও সুবর্ণ এক্সপ্রেস। ঢাকা–সিলেট পথে কালনী এক্সপ্রেস। ঢাকা–পঞ্চগড় পথে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। ঢাকা–রাজশাহী পথে বনলতা এক্সপ্রেস। ঢাকা–লালমনিরহাট পথে লালমনিরহাট এক্সপ্রেস। চট্টগ্রাম–সিলেট পথে উদয়ন/পাহাড়িকা এক্সপ্রেস। ঢাকা–খুলনা পথে চিত্রা এক্সপ্রেস ট্রেন।

এরপর ৩ জুন থেকে আরও ৯টি ট্রেন চালু করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত আছে। এগুলো হচ্ছে তিস্তা এক্সপ্রেস (ঢাকা–দেওয়ানগঞ্জবাজার), বেনাপোল এক্সেপ্রেস (ঢাকা–বেনাপোল), নীলসাগর (ঢাকা–চিলাহাটি), রূপসা এক্সপ্রেস (খুলনা–চিলাহাটি), কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস (খুলনা–রাজশাহী), মধুমতি এক্সপ্রেস (রাজশাহী–গোয়ালন্দঘাট), মেঘনা এক্সপ্রেস (চট্টগ্রাম–চাঁদপুর), কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস (ঢাকা–কিশোরগঞ্জ), উপকূল এক্সপ্রেস (ঢাকা–নোয়াখালী)।

রেলের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি করলেও কোথাও কোথাও জোর করে বিনা টিকিটের যাত্রী উঠে যেতে পারে। লকডাউনের শুরুতে দোকানপাট খোলা রাখার সময় কমিয়ে দেওয়ার কারণে ভিড় বেড়ে যায়। ট্রেনও কম চললে ভিড় বেশি হতে পারে।

জানতে চাইলে রেলের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অল্প কিছু আন্তনগর ট্রেন দিয়ে সীমিত আকারে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করা হবে। সাত দিন পর পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে। ১৫ দিন চললে যাত্রীচাহিদা এবং বাস্তব অবস্থা জানা যাবে। এর বাইরে সরকার সময় সময় যে নির্দেশনা দেবে, সেটা তাঁরা মেনে চলবেন।

লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধির ব্যবস্থা আছে

বিআআইডাব্লউটিএ সূত্র বলছে, তাঁরা তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে চায়। ১. লঞ্চকে জীবাণুমুক্ত করা। ২. যাত্রীকে জীবাণুমুক্ত করে লঞ্চে তোলা। ৩. স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যাত্রী কম ওঠানো। এসব বিষয়ে লঞ্চ-মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হবে।

লঞ্চ জীবাণুমুক্ত করা এবং যাত্রীদের জীবাণুমুক্ত করার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নীতিমালা আছে। এর আলোকে গত ২০ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কার্যক্রম পরিচালনার একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। লঞ্চ-মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে আরও কিছু সংযোজন–বিয়োজন হতে পারে।
জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক প্রথম আলোকে বলেন, লঞ্চ চলাচলের অনুমোদনে ডেকে একজন যাত্রীর জন্য ৬ ফুট জায়গা রাখার কথা বলা হয়েছে। এক যাত্রী থেকে আরেক যাত্রীর মধ্যে দূরত্ব থাকতে হবে তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট। এই নিয়ম মেনে যাত্রী তুললে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে। আর ক্যাবিন তো এমনিতেই সুরক্ষিত। এর বাইরে যেসব লঞ্চে আসন পেতে যাত্রী পরিবহন করা হয়, সেগুলোতে এক আসন বাদ দিয়ে টিকিট বিক্রির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে। সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়ে নৌপুলিশ এবং কোস্টগার্ড সহায়তা করবে। লঞ্চ ও যাত্রীকে জীবাণুমুক্ত করার বিষয়ে তারা কড়া নজরদারি করবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0