কথা হয় দোকানি খোরশেদ মিয়ার (৬৫) সঙ্গে। দোকানের আয় দিয়ে তিন ছেলে, দুই মেয়েসহ সাত সদস্যের সংসার তাঁর। থাকেন শহরের হাসননগর এলাকায়। বসতঘর ও দোকানের ভেতর কোমরসমান পানি উঠে পড়ায় তিনি একই এলাকার চানমিয়া সাহেবের ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। পানি একটু কমায় গতকাল সকালে তিনি দোকান খুলে বসেছেন। তবে দোকানের ভেতরে হাঁটুসমান পানি। কোনো বেচাকেনা নেই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে খোরশেদ বলেন, ‘বন্যার হানি আমরার সব তছনছ কইর্যা লাইছে। কিথা করতাম! পোলাপান লইয়া চাইর দিন ধইর্যা খুউব কষ্টের মধ্যে আছি। সরহার থাইক্যা কুনু সায্য পাই নাই।’

বন্যার্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শহরের নতুনপাড়া, হাসননগর, মোহাম্মদপুর, ষোলঘর, ময়না পয়েন্ট, বক পয়েন্টে কোমর থেকে বুকসমান পানি ছিল। এখন পানি কমতে শুরু করেছে। এসব এলাকার মানুষজনকে নৌকায় চলাচল করতে দেখা গেছে। বন্যার্ত মানুষেরা বলছেন, বিদ্যুৎ নেই, মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক নেই। যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। রাত নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে গোটা শহর।
বন্যার্তদের অনেকেই বলেছেন, তাঁরা এখনো ত্রাণ পাননি। কোনোরকমে খেয়ে না–খেয়ে আছেন। খাবার সংকটের পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

বেলা সোয়া দুইটার দিকে শহরের সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গেলে দেখা হয় ওই বিদ্যালয়েরই দশম শ্রেণির ছাত্র আমির হোসেনের সঙ্গে। সে জানায়, বন্যার মধ্যে সে হোস্টেলেই আছে। তার বিদ্যালয়ে ৫০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এসব মানুষ খাবারের কষ্টে আছে।

default-image

হাঁটুপানি মাড়িয়ে বেলা পৌনে তিনটার দিকে পৌর শহরের ৭৮ নম্বর কালীবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছা গেল। রাস্তায় রাস্তায় বিভিন্ন ভবনের নিচতলা পানিতে নিমজ্জিত দেখা গেল। রাস্তায় দাঁড়ানো দু-একজন জানান, বিদ্যালয়টির দ্বিতীয় তলায় ২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বাইরে থেকে কাউকে দেখা গেল না। ‘এইখানে বন্যার্ত কেউ আছেন?’ এমন হাঁক দিতেই দোতলার বারান্দায় উঁকি দেন রত্না বেগম (৪৫) নামের এক নারী। বললেন, বিদ্যালয়টির সামনেই তাঁদের বাসা। বন্যার পানিতে বাসায় বুকপানি হওয়ায় তিনি চার দিন ধরে এখানে এসে উঠেছেন। এখন কী অবস্থা—জানতে চাইলে রত্না বলেন, ‘পৌরসভা কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন কারও কাছ থাইক্যা আমরা কুনু সাহাইয্য ফাইছি না। এইহান ছিড়া, মুড়ি খাইয়া না–খাইয়া কুনুরহমে দিনগুলা যাইতাছে।’

পৌর শহরের নতুনপাড়া এলাকা থেকে নৌকায় করে কালীবাড়ি এসেছিলেন আইনজীবী প্রদীপ আচার্য। তিনি বলেন, পানি কমতে শুরু করলেও সুনামগঞ্জের মানুষজনের মধ্যে স্বস্তি ফেরেনি।

সকাল থেকে সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হয়নি, বরং দিনভর হালকা রোদ ছিল। কালীবাড়িতেই কথা হয় পশ্চিম হাজীপাড়ার বাসিন্দা চাকরিজীবী মহিবুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার স্ত্রী, সন্তান নিয়ে অন্য এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। বন্যার্তদের সহায়তার জন্য কোনো স্বেচ্ছাসেবক চোখে পড়েনি। নিজেদের উদ্ধারকাজ নিজেদেরই করতে হয়েছে। বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম এখনো চোখে পড়েনি।’

কালীবাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে পৌর মার্কেটের সামনে এলেন এই প্রতিনিধি। পথে মানুষজন নেই বললেই চলে। দু-একটা নৌকায় করে কেউ কেউ যাচ্ছেন। পৌর মার্কেটের সামনে এসে কথা হয় শহরের নবীনগর এলাকার রুহি স মিলের মালিক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। তাঁর কথায়, ‘বন্যার পানিতে আমার নিজের স মিলের চার–পাঁচ লাখ টাকার কাঠ ভেসে গেছে।’ তিনি দাবি করেন, ওই এলাকায় ১১টি স মিল রয়েছে। এসব স মিল থেকে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের কাঠ ভেসে গেছে।

সদর থানার সামনে পানি যেখানে কম, সেখানটায় সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ইসমাঈল হোসেন। কথা হলো তাঁর সঙ্গে। বললেন, বন্যায় বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে বন্যার পানি পান করছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, শুক্রবার দুপুরে যেখানে বুকসমান পানি ছিল, সেখানে এখন হাঁটুসমান পানি। বিদ্যুৎ ও মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় পানি কমতে শুরু করলেও এখনো মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেননি।

এরপর একে একে শহরের জেলা প্রশাসকের বাসভবন, সুনামগঞ্জ থানা, কালীবাড়ী মন্দির, সুনামগঞ্জ পৌর কলেজ, বুলচান্দ উচ্চবিদ্যালয়, জগৎজ্যোতি পাঠাগার, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কার্যালয়ের সামনে ঘুরে পানি কমার চিহ্ন দেখা গেল। বিকেল পর্যন্ত এসব জায়গায় হাঁটুসমান পানি ছিল। চারটার দিকে আবার উকিলপাড়া বালুরঘাটে এসে স্পিডবোটে চড়ে বসেন এই প্রতিনিধি। বন্যার পানিতে বিধ্বস্ত এক জনপদ পেছনে ফেলে এগিয়ে চলে স্পিডবোট।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন