default-image

‘ছোলট্যা কামাই করব্যার জন্নে ঢাকাত যাবার ধরচিলো। কেটা হামার ছোলট্যাক মারি ফেলালো। হামরা একন ক্যামন করি চলমো? তোমরা হামার ছোলোক আনি দ্যাও।’ গতকাল শনিবার দুপুরে এভাবেই আহাজারি করছিলেন পেট্রলবোমা হামলায় নিহত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের সুমন মিয়ার (২২) মা মজিদা বেগম।
এ সময় সুমনের বাবা শাহাজান আলী নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। সুমন ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। সপ্তাহ দুই আগে বাড়ি আসেন। গত শুক্রবার নাপু পরিবহনে ঢাকা যাওয়ার পথে তিনি মারা যান। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দুই ভাই-এক বোনের মধ্যে সুমন বড়। তিনি-ই পাঁচ সদস্যের সংসারে একমাত্র কর্মক্ষম।
গতকাল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর, দক্ষিণ কালির খামার, মধ্যপাড়া খামার, পশ্চিম সীচা গ্রামে গিয়ে দেখা গেল শোকের মাতম। এসব গ্রামের চার বাসিন্দা গতকালের বোমা হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন দিনমজুর। কাজের সন্ধানে ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জে যািচ্ছলেন তঁারা।
বোমা হামলায় নিহত দক্ষিণ কালির খামার গ্রামের দিনমজুর সৈয়দ আলীর (৪২) বাড়িতে চলছিল স্বজনদের আহাজারি। এই জেলায় ওই-জেলায় দিনমজুরের কাজ করে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতেন সৈয়দ আলী। তাঁর দুই মেয়ে, এক ছেলে। এলাকায় কাজ না থাকায় সৈয়দ আলী শুক্রবার মুন্সিগঞ্জ জেলায় যাওয়ার পথে নিহত হন। তাঁর মা সাবানা বেগম ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বললেন, ‘হামার ছোলট্যা কি করছিল বাবা? মানষে তাক মারি ফেলালো!’
নিহত শিশু শিল্পী রানীর (৬) বাবা উপজেলার পশ্চিম চণ্ডীপুর গ্রামের বলরাম দাস ও মা সাধনা রানী দিনমজুরের কাজ করেন। তাঁরা শিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার রাতে কাজের জন্য মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। বোমা হামলায় তাঁরা স্বামী-স্ত্রীও দগ্ধ হন। সাধনা রানী রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং বলরাম দাস গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বলরাম দাস কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘পেটের দায়ে রোজগারের জন্নে যাচ্ছিলাম। হামরা সগি হারানো।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘হামরা গরিব মানুষ আজনিতি বুঝিনে। কামলার কাম করি খাই। হামরা কি অপরাদ করচিনো, ওমরা হামার ছোলট্যাক কারি নিলো।’
একই উপজেলার পশ্চিম সীচা গ্রামের মৃত সাহেব উদ্দিনের স্ত্রী হালিমা বেগমের (৪০) বাড়িতেও চলছিল শোকের মাতম। তাঁর মেয়ে শামসুন নাহার মাকে হারিয়ে আহাজারি করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘হামার মা পেটের জন্নে ঢাকাত যাবার ধরি মরি গেল। তাঈ কি দোষ করচিলো? হামরা একন কাকে নিয়া বাঁচমো।’ ঢাকার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন তিনি।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সীচা থেকে প্রায় ৬০ জন যাত্রী নিয়ে নাপু পরিবহনের একটি বাস ঢাকার পথে রওনা হয়। রাত সোয়া ১১টার দিকে বাসটি গাইবান্ধা সদর উপজেলার তুলসীঘাট পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন