বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামকে বলা হয় বাণিজ্যিক রাজধানী। দেশের মহানগরের মধ্যে আকারের দিক দিয়ে ঢাকার পরই চট্টগ্রাম। কর্ণফুলী নদীর উত্তর পাশে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরের একদিকে পাহাড় ও অন্যদিকে সমুদ্র। দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দরটি চট্টগ্রাম শহরেই।

চট্টগ্রামের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। তা শুধু এ কালে নয়, ১৯১৫ সালেই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেছিলেন, ‘শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-মহিমায় মহিমান্বিত বলিয়া নহে, অতি প্রাচীনকাল হইতে রাজনীতির সহিত ঘনিষ্ঠভাবে বিজড়িত থাকায়, চট্টগ্রাম রাজনৈতিক লীলাক্ষেত্র এবং ঐতিহাসিকের গবেষণার প্রকৃষ্ট স্থানও বটে।’

default-image

প্রবীণ শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ সিকান্দার খানের মতে, শহর হিসেবে চট্টগ্রামের অধঃপতন হতে শুরু করে এই শতাব্দীর শুরু থেকে। তখন দ্রুতগতিতে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট করতে থাকে মানুষ। এতে কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও সিটি করপোরেশন ঠিকভাবে তদারক করেনি। ফলে শহরটা ঘিঞ্জি হয়ে গেছে।

এখন অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় শহর। বছরজুড়ে থাকে যানজট, থাকে মশার উপদ্রব। পরিচ্ছন্ন শহরের খ্যাতি অনেকটাই মুছে গেছে। নগরের অনেক এলাকায় এখনো সুপেয় পানির সংকট আছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে মাঝেমধ্যে দুর্ভোগে পড়েন শহরের মানুষ। নাগরিক জীবনের নতুন উৎপাত শব্দ আর বায়ুদূষণ। পুরোনো শহর এলাকার সড়কগুলো সরু। এখন পর্যন্ত নেই পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা।

একনজরে বন্দর শহর

মাত্র ৪ দশমিক ৬৪৯ বর্গমাইল আয়তন নিয়ে ১৮৬৩ সালে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম পৌরসভা। এর ছয় বছর পর করা পরীক্ষামূলক আদমশুমারি অনুযায়ী শহরে তখন জনসংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৪৭৮। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে। তখন জনসংখ্যা ছিল ২০ লাখ। এখন চট্টগ্রাম শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। ঘরবাড়ির সংখ্যা প্রায় দুই লাখ।

default-image

বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কারণে প্রতিবছরই এই শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ৪০ বছরেও শহরের আয়তন বাড়েনি। শহর সম্প্রসারণের বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। যত্রতত্র ভবন নির্মাণের কারণে শহরে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা খুব কম। শহরের প্রায় অধিকাংশ এলাকায় ঘরবাড়ি নির্মাণের সময় জায়গা ছাড়া হয়নি।

১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) গঠনের পর এই শহরের জন্য প্রথম মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয় ১৯৬১ সালে। এরপর দ্বিতীয় মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় ১৯৯৫ সালে। মহাপরিকল্পনা থাকলেও সে অনুসারে শহর গড়ে তোলার ব্যাপারে কারও তেমন গরজ ছিল না। এখন আরেকটি মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।

default-image

অপরিকল্পিতভাবে শহর গড়ে ওঠার কারণে নাগরিক দুর্ভোগ প্রকট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড় কেটে এবং খাল ও নালা-নর্দমা ভরাট করে ভবন নির্মাণের কারণে চমৎকার শহরটির সৌন্দর্যহানি হয়েছে। এখনই যদি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে এটি পরিত্যক্ত শহরে পরিণত হবে। তিনি চট্টগ্রামকে নান্দনিক ও বাসযোগ্য করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে জানান।

জলাবদ্ধতার সমাধান হয়নি দেড় শ বছরেও

চট্টগ্রাম শহরের জনস্বাস্থ্য ও যাতায়াতব্যবস্থার উন্নতির ব্যাপারে ১৮৫৬ সালে ‘কমিটি ফর দ্য স্যানিটারি ইমপ্রুভমেন্ট অব দ্য টাউন অব চিটাগাং’ গঠন করা হয়েছিল। ওই বছরের ১৪ মে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম সভায় প্রাধান্য পেয়েছিল ‘জল নিষ্কাশনব্যবস্থা’। ওই সভার পর চলে গেছে ১৬৫ বছর। কিন্তু এখনো সে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।

দীর্ঘদিনের পুরোনো এ সমস্যা গত ২০ বছরে তীব্র আকার ধারণ করেছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতে কিংবা জোয়ারের পানিতে শহরের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ পুকুর-দিঘি, খাল ও জলাধার ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া। গত ৫০ বছরে বিলুপ্ত হয়েছে অন্তত ১২টি খাল। আর ৩০ বছরের ব্যবধানে ছোট-বড় ১৪ হাজারের বেশি জলাশয় হারিয়ে গেছে। চট্টগ্রামে একসময় রাজাপুকুর, দেওয়ানজি পুকুর, রথের পুকুর, কমলদহ দিঘি ও পদ্মপুকুর ছিল, এখন সেখানে ছোট-বড় অসংখ্য ভবন নির্মিত হয়েছে।

নগরের বাকলিয়ার ডিসি রোড এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাকলিয়ায় ২০ বছর আগেও ছোট-বড় অন্তত ৩০টি পুকুর ছিল। কিন্তু এখন ২০টিরই অস্তিত্ব নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোও নানা উপায়ে ভরাটের প্রক্রিয়া চলছে।

২০১৭ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের ‘বাংলাদেশের চট্টগ্রাম নগরের বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতার পূর্বাভাস’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় শহরের ১৫৭ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ৪২ শতাংশ এলাকা ডুবে যায়। অনেক এলাকায় ২৫ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি জমে থাকে।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে গত ৫০ বছরে ৫টি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের করের টাকায় প্রণীত এই মহাপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাংঘাতিক ব্যর্থতা রয়েছে।

অবশ্য দেড় শ বছরের পুরোনো জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে বর্তমানে চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এর আগের দুই দশকে ব্যয় হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন শ কোটি টাকা। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।

উন্নয়নেও দুর্ভোগের শেষ নেই

চট্টগ্রাম নগরের যাতায়াতব্যবস্থা, পানি সরবরাহসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বা বাস্তবায়নাধীন। গত সাত বছরে সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম ওয়াসা ও সিডিএর বাস্তবায়িত ও বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মানুষের স্বস্তি কম। কেননা, এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। দেখা গেছে, সিডিএ ও সিটি করপোরেশন রাস্তার উন্নয়ন বা সংস্কারকাজ শেষ করেছে। কিছুদিন পর সে রাস্তা খুঁড়ে পাইপ বসাচ্ছে ওয়াসা। আবার রাস্তার কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই গ্যাসলাইনের জন্য খুঁড়ে রাখা হচ্ছে। বছরজুড়ে এই অবস্থা থাকে।

default-image

প্রতি বর্ষা মৌসুমে শহরের রাস্তাঘাট বেহাল হয়ে পড়ে। সে রাস্তা সংস্কার করতে করতে বছর পার করে দেয় সিটি করপোরেশন। শহরের ২০ শতাংশ সড়কে বাতি জ্বলে না। চট্টগ্রামে একের পর এক উড়ালসড়ক নির্মিত হয়েছে। এরপরও যানজট নিরসন হয়নি। বিশ্বব্যাংকের করা ‘চট্টগ্রাম নগরের কৌশলগত পরিবহন মহাপরিকল্পনা’ অনুযায়ী, শহরে চলাচলরত বাসের গড় গতি ঘণ্টায় ১০-১৪ কিলোমিটার। অথচ স্বাভাবিক গতি হওয়ার কথা ৪০ কিলোমিটার।

চট্টগ্রাম শহরে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭০০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। তবে সিটি করপোরেশন কাগজে-কলমে সংগ্রহের পরিমাণ দেখায় আড়াই হাজার টন। বাকি ময়লা-আবর্জনা নালা-নর্দমায় চলে যায়। ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে পানির দৈনিক চাহিদা ৪২ কোটি লিটার। কিন্তু উৎপাদিত হয় ৪০ কোটি লিটার।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি জেরিনা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের নানা সমস্যা সমাধানে কারও নজর নেই।

নদী ও পাহাড়

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের করা দুটি গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম নগর ও এর আশপাশে ২০০টি ছোট-বড় পাহাড় ছিল। এর অর্ধেক পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে। নির্বিচার কাটার ফলে দুই দশকে পাহাড় ধসে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

২০১৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ন্যাচারাল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ বছরে চট্টগ্রাম নগরের খুলশীতে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৪ শতাংশ এবং শহরতলির চৌধুরীহাট এলাকায় সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ পাহাড় কাটা হয়।

default-image

পাহাড় কাটার সঙ্গে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও সিডিএও জড়িত। চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ কর্ণফুলী নদী দখল-দূষণে বিপর্যস্ত। অথচ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরই হচ্ছে কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক।

শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বিনোদন

জেলা শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, থিয়েটার ইনস্টিটিউট বছরজুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখর থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে যুক্ত আছেন তরুণ-তরুণীরা।

তবে সিনেমা হল নিয়ে রয়েছে হতাশা। একসময় ২৭টি সিনেমা হল থাকলেও এখন কোনোরকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে মাত্র দুটি। তবে অভিজাত বিপণিবিতানে চালু হয়েছে একটি সিনেপ্লেক্স।

সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেরও শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে এখনো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম রয়েছে দেশব্যাপী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কলেজিয়েট স্কুল আর চট্টগ্রাম কলেজ। সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণায় সুনাম অর্জন করেছে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়। শহরে এখন ১৫৪টি বিদ্যালয়, ৫০টি কলেজ এবং ২১টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ রয়েছে।

default-image

দিন যাচ্ছে, সুযোগ কমছে

ঐতিহাসিক শহরের আগের সে সৌন্দর্য ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেছে। এরপরও যেটুকু আছে, তা রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন ও প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, সদিচ্ছা থাকলে শহরকে নান্দনিক শহরে রূপান্তর করা সম্ভব। এ জন্য দরকার সঠিক ও পরিকল্পিত মহাপরিকল্পনা। তবে দিন যত চলে যাবে, তত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। শুরু করতে হলে এখনই করা দরকার।

অভিমত

যা হয়েছে, তা ভালো হয়নি

আবুল মোমেন

default-image

আজ থেকে ৫০ বছর আগেও চট্টগ্রাম ছিল পাহাড়ঘেরা সুন্দর ও শান্ত শহর। শহরের ভেতর ছোট ছোট অনেক পাহাড়। পাশে নদী। আবার হ্রদও। গাছপালাঘেরা বন। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম ছিল প্রাকৃতিক নগর।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও দেশের মধ্যে চট্টগ্রাম প্রথম সারিতে ছিল। ষাটের দশকে প্রকাশনাজগতে সারা দেশে অগ্রণী ভূমিকা ছিল। রাজনৈতিক অঙ্গনেও জাতীয় পর্যায়ে ভূমিকা রাখার মতো মানুষ ছিলেন। দেশের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান ছিল চট্টগ্রামে।

চট্টগ্রামে বর্তমানে যে পরিবর্তন, তা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের পর থেকে। অনেক বড় ভবন হয়েছে। নগরায়ণ হয়েছে। কিন্তু সেটি যে রকম ভারসাম্য-বিকাশমুখী হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। আর যেটি হয়েছে, তা নাগরিক জীবনের জন্য ভালো হয়নি।

বর্তমানেও যে শহর আছে, তা রক্ষা করতে হলে মহাপরিকল্পনা করতে হবে। আগে পরিকল্পনা হয়েছিল, তা কেউ মানেনি। খাল, বড় বড় দিঘি ও জলাশয় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। উন্মুক্ত পরিসর বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন