বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাকিব আসার আগেই জাতীয় দলে আমি দুই বছর খেলেছি। জাতীয় দলে আমার প্রথম বছরে মাশরাফিও ছিল না চোটের কারণে। আমার কাছে আসলে জাতীয় দলে খেলার পুরো সময়টাই এমন এক অনুভূতি, যেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমার ধারণা সবারই তা-ই হয়।

তবে জাতীয় দলে খেলে তো আর সবাই বিশ্বসেরা হতে পারে না! সাকিব সেটা পেরেছে। আইসিসি র​্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে ঢোকার অনুভূতিটা আমি জানি। আমার মতো সাকিবও বোলার হিসেবে সেরা দশে এসেছিল। আর অলরাউন্ডার হিসেবে সবার ওপরেই উঠে গেল। তখন কিন্তু এটা নিয়ে অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। কারণ, এর আগের কয়েক বছর ধরেই সাকিবের পারফরম্যান্স ছিল দারুণ। অবশ্য এক নম্বর হওয়া তো সহজ কিছুও না, বিশেষ করে তখনকার সময়ে বাংলাদেশ থেকে যখন এক নম্বর হয় কেউ।

সাকিবের এই যে বিশ্বসেরা হওয়ার ভ্রমণটা, আমার ধারণা অভিষেকের দিন থেকেই সেটা শুরু হয়েছে। একজন সেরা ক্রিকেটারকে যেমন হতে হয়, সাকিব কিন্তু তেমনই। দলের যা চাহিদা, শুরু থেকে সেটাই পূরণ করে এসেছে। অভিষেকের পর খুব কম সময়ের মাঝেই দলের ম্যানেজমেন্ট বলুন বা সতীর্থ সবারই সাকিবকে নিয়ে চাওয়া অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এটাও তো সচরাচর হয় না। সাকিব দলের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে উঠেছিল বেশ দ্রুত।

এত দূর যাওয়া, এত বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে যাওয়া সম্ভব হয়েছে কয়েকটা কারণে। প্রথমত, সাকিবকে আমার খুবই ‘স্মার্ট’ ক্রিকেটার মনে হয়। মানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, কখন কী প্রয়োজন সেটা করা এসব ক্ষেত্রে সে বেশ খানিকটা এগিয়ে। এসবই তাকে অনেকটা এগিয়ে রাখে। আর এত দিন ধরে এভাবে পারফরম্যান্স ধরে রাখতে হলে বিশেষ কিছু থাকতেই হয়। সাকিবের সেটা আছে।

সাকিবের সঙ্গে খেলে যেটা বুঝেছি, ওর আরেকটি বড় গুণ সে সোজাসাপ্টা কথা বলে। যা বলার সরাসরি বলে দেয়। অযথা কারও পেছনে সময় নষ্টও করে না। এসব দিক দিয়ে সে খুবই পেশাদার। এসব গুণ যার থাকে, সে আসলে সতীর্থ হিসেবে দারুণ। বেশ সহজেই একটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। খেলাটা তো মাঠেই হয় না, ড্রেসিংরুমের আবহ, দলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিশাল ভূমিকা থাকে। এরপরই সেরা পারফরম্যান্সটা আসে।

সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক নম্বর তারকা, এটা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। যে বিশ্বসেরা, বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে তার অবস্থানটা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়। নিজেকে সে যে পর্যায়ে নিয়ে গেছে, আমার মনে হয় না এ সময়ে এর বেশি কিছু করার ছিল ওর। এত বছর ধরে নিজেকে ধরে রেখেছে শীর্ষ পর্যায়ে। বিশ্ব ক্রিকেটে সে এক নম্বর অলরাউন্ডার, বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে সাকিব আসলে আরও বড় কিছু।

শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না, আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টের কথাও ধরুন। আমরা কয়েকজনই গিয়েছিলাম, তবে যেভাবেই হোক ধারাবাহিক তো হতে পারিনি সেখানে। সাকিব কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে খেলে গেছে। তার পথ ধরে মোস্তাফিজও এগিয়েছে। আশা করি, সামনে আরও অনেকেই খেলবে।

সব মিলিয়ে ক্রিকেটের অংশ একজন মানুষ হিসেবে, বাংলাদেশি হিসেবে আসলে সাকিবকে নিয়ে গর্ব করতেই হয়। আইসিসি ভাষ্য মতে, ক্রিকেট খেলুড়ে বড় বড় দেশ যেসব আছে, বাংলাদেশের একটা নাম উল্লেখ করতে হলেও সাকিবের নামটা নেয় তারা। আমাদের ক্রিকেটকে আগে একটু ভিন্ন চোখে দেখত তারা, সাকিবের পর থেকে সেটা বদলেছে। এটা তো ক্রিকেট খেলুড়ে একটা দেশ হিসেবে সবার জন্যই গর্বের ব্যাপার! আর যারা খেলোয়াড়, তাদেরও তো সবচেয়ে বড় পাওয়া এটাই। সাকিব সেটা পেয়েছে।

তবে দিন শেষে সাকিব তো একজন মানুষই। সে সবার চাওয়া মেটাবে, এটা তো সম্ভব না। তার বিশেষ গুণ ছিল বলেই সে এত দূর গেছে। তবে সাকিব যদি শুধু ভুলই করে যেত, তাহলে তো শীর্ষ পর্যায়ে যেতে পারত না! সাকিবের মতো কাউকে পেতে আমরাও তো এমন অভ্যস্ত নই। আমাদের কাছেও সে নতুনই ছিল, হয়তো আমরাও ঠিকঠাক তাকে নিতে পারিনি কোনো সময়।

কদিন পর সাকিব ৩৫ পূর্ণ করবে। ৩৫ মানে আমাদের এখানে অনেক বয়স বোঝায় ক্রিকেটে। তবে এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। সাকিব যে পজিশনে খেলে, সেখানে এই বয়সটা তার সেরা দেওয়ার একটা সময়। ফিটনেস ধরে রাখতে পারলে সাকিবের আরও খেলা উচিত। ওর অভিজ্ঞতা এখন আমাদের তরুণদের দরকার। সাকিবের সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করা দরকার। সেটা যদি না-ই হয়, তাহলে সাকিবের এতো অর্জন তো শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, দেশের তো কিছু পেতে হবে। আশা করি, তরুণেরা ওর কাছ থেকে অনেক কিছু পাবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হলেও সাকিবকে আরও বেশ কিছুদিন দরকার আমাদের।

আব্দুর রাজ্জাক: জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন