default-image

স্বপ্ন কত বড়! স্বপ্নের কি কোনো আয়তন আছে? ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবরে টিএসসির বারান্দায় বসে রাতের জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে সে প্রশ্নের খোঁজ করছিলেন কয়েকজন তরুণ। তাঁরা স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্নের পেছনে ছোটেন, বলা ভালো ছুটছেন।

ক্রিকেট আর বাঙালি এক সুতোয় গাঁথা। আমাদের হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদের বড় অংশজুড়ে ক্রিকেট। ফেসবুক এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই ফেসবুকে আরেক অবিচ্ছেদ্য উন্মাদনা ক্রিকেট নিয়ে একদল তরুণের স্বপ্নবাজির শুরু, খুলে ফেলা ‘বাইশ গজ’ নামের ক্রিকেট গ্রুপ।

টিএসসির বারান্দায় গিটার হাতে স্বপ্নের রাগে টুংটাং সুর তোলা প্রত্যয়, আশিকদের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও বহু ক্রিকেটপাগল সত্তা। ময়মনসিংহের আনোয়ার, নরসিংদীর নাজমুল রনি, সিলেটের সাইফ আল হাদী, নামকরা ক্রিকেট পেজের এডমিন চট্টলার নকিবসহ আরও অনেক নাম!

মাশরাফি মানে মায়া। ম্যাশে মাতোয়ারা গোটা দেশ। ম্যাশের শহর নড়াইলে সেটি আকাশচুম্বী। মাশরাফি বিন মুর্তজার বাড়ির পাশের ক্রিকেট উন্মাদ তরুণী নুসরাত মিতুও তার ব্যতিক্রম নন। বাইশ গজের অ্যাডমিন প্যানেলে যোগ দেন নড়াইলের এই তরুণীও। এঁদের প্রত্যকের মাথার ওপর ছায়া হয়ে আছেন সাভারের এক মাঝবয়সী ক্রিকেটপ্রেমী ওয়াহিদুর রহমান ওয়াসিম, যিনি ক্রিকেটে খান, ক্রিকেটেই ঘুমান। এঁদের সমন্বয়ে আর গ্রুপের সদস্যদের ডেডিকেশনে অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে ফেসবুকের নীলজগতে।

‘ইচ্ছের নীল রং আকাশ ছুঁতে চায়, সারা বেলা বন্ধ জানালা...’। শিরোনামহীনের সুপরিচিত গান ‘বন্ধ জানালা’র এই দুই চরণের সঙ্গে বেশ যায় বাইশ গজ! ক্রিকেট নিয়ে যাঁদের ধ্যানজ্ঞান, তাঁরা শখের বসে একটা গ্রুপ খুলে কয়েক দিন ঘাঁটাঘাঁটি, তারপর যে যাঁর পথে হাঁটাহাঁটি! এ রকম কিছু করেনি। প্রথম দিকে কেবল অনলাইনে ক্রিকেটনির্ভর শুদ্ধ আলোচনা নিয়েই এগোতে থাকলেও সময়ের পালাবদলে ডালপালা মেলতে শুরু করে মাঠের প্রতি ভালোবাসা।

দিন শেষে ক্রিকেট মাঠের খেলাই। শক্ত পিচে বোলাররা হুল ফোটান, ব্যাটসম্যান ফোটান ফুল। স্নিগ্ধতা-বিষাক্ততার ভয়ংকর সুন্দর যুগলবন্দী দেখতে গ্যালারিতে ছুটে যাই আমরা। ভক্তদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে এগোতে থাকে বাইশ গজও। ধীর লয়ে বল গড়িয়ে পৌঁছে যায় সবুজ ঘাসে। বাংলাদেশে অসংখ্য ক্রিকেট গ্রুপ আছে, আছে তারকাদের ফ্যান জোন। অনলাইনের গণ্ডিতেই যাদের অধিকাংশ সীমাবদ্ধতা। কিন্তু ওই যে, কেউ কেউ আছেন নির্দিষ্ট স্বপ্ন না দেখে স্বপ্নের শাখা খোলেন। বাইশ গজ ঠিক সেই দলের অগ্রসেনা। বেশ সাহসী এক পদক্ষেপ নিয়ে পদার্পণ করেছে পেশাদার ক্রিকেট জগতে। দেশের ক্রিকেট কাঠামোর আওতায় ক্রিকেট বলের সব টুর্নামেন্টে এ অংশ নিয়ে এসেছে আলোচনায়, পেয়েছে সাফল্য। টিম বাইশ গজ এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা লীগে টিম সাবমিশনের মধ্য দিয়ে দেশের আনাচকানাচে পড়ে থাকা ক্রিকেটারদের জন্য একটা সুযোগ করে দেওয়ার দিকে! শুরুর দিকে কেবল বাইশ গজের ব্যানারেই চলত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ। দলের হয়ে খেলেছেন জাতীয় দলের বাঁ-হাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম, গত প্রিমিয়ার লীগে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা মোহামেডানের পেসার মোহাম্মদ আজিমের মতো তারকারা। জাতীয় পর্যায়ে খেলা অনেকেই নানান সময় প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাইশ গজের। তাতেই কি না উৎসুক হয়ে গড়ে ওঠে আরও অনেক শাখা দল। এখন অবধি দলসংখ্যা ৫টি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, কাতলাপুর জুনিয়র। শেষের দলটা স্কুল পর্যায়ের শিশুদের নিয়ে! ভাবা যায়! এতেই শেষ নয়। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় দলও খুলেছে বাইশ গজ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জোনের পাশাপাশি প্রক্রিয়া চলছে জাহাঙ্গীরনগরের দল গঠন নিয়ে, যে প্রক্রিয়ার আওতায় আছে সিলেট এবং গাজীপুর জোনও।

মাঠ, মাঠের বাইরে তিন বছরে অনেকখানি সফল হয়েছেন বাইশ গজের সদস্যরা। গত বছরের মাঝামাঝি প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয় বাইশ গজের সব দল নিয়ে ঘরোয়া প্রিমিয়ার লীগ। এ বছরের মার্চের শেষ সপ্তাহে ‘লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ড (এলএমএস)’ নামের একটি টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে গ্রুপ পর্বে বাদ পড়লেও দুটো ম্যাচে অসাধারণ জয়ে জানান দিয়ে এসেছে, ‘আমরা উদিত হচ্ছি।’ সূর্যের দীপ্ত আভা গায়ে মেখে চোখ বসায় ভারতে। গত বছরের ৯ জুন থেকে কলকাতায় বসে টি-টুয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্লাব ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশসহ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানের মোট আটটি দল অংশ নেয় সে আসরে। সাফল্যের ঝান্ডা উড়িয়ে শেষ হাসি হাসতে না পারলে রানার্সআপ হয়ে ঠিকই আলো ছড়িয়ে এসেছে ওপার বাংলার সবুজ ঘাসে। অক্টোবরে ‘ইন্দো-বাংলা অ্যামেচার টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্ট’ আয়োজন করে এবং চ্যাম্পিয়ন হয় বাইজ গজ ক্রিকেট দল।

কেবল মাঠ ও অনলাইনে ক্রিকেট-নির্ভর ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয় বাইশ গজ কর্তৃপক্ষ। পথশিশুদের নিয়ে কিছু করার প্রচণ্ড তাড়না অনুভূত হয় তাদের। শুদ্ধতায় মানবতার চর্চা করে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই মানুষগুলো।
বিনয়ের সঙ্গে একসঙ্গে সুর মিলিয়ে বাইশ গজের এডমিনরা সবার উদ্দেশে বলেন, আপনারা ভক্ত হোন, অন্ধ ভক্ত নয়। খেলোয়াড়েরাও মানুষ। তাঁরা ভুল করতেই পারেন। ভালো কিছু করলে যেমন আমরা বাহবা দিই, তেমনি খারাপ করলেও সমালোচনার অধিকার রাখি। তবে তা যেন গঠনমূলক হয়।

default-image

‘লেট’স লিভ দ্য ড্রিম’ স্লোগানে মুখর স্বপ্নবিলাসী এক স্বচ্ছ প্রাঙ্গণ এই বাইশ গজ। অনলাইনে তিন বছরে যতটা জনপ্রিয় হয়েছে, অফলাইনে তার চেয়ে যৌক্তিক কারণেই অনেক বেশি হয়েছে। এ সামান্য সময়েই হয়ে উঠেছে মাঠের ক্রিকেটে অন্য গ্রুপগুলোর দিশারি। বাইশ গজের রয়েছে নিজস্ব থিম সং। গ্রুপের প্রথম লেখক জহিরুল কাইউম ফিরোজের লিরিক্সে, নকিবের সম্পাদনায় গানটির আনঅফিশিয়াল কভার করেছেন টিউলিপ সেনগুপ্ত। ‘বাইশ গজ’ শিরোনামের গানটির কথায় ফুটে উঠেছে ক্রিকেট এবং উদ্যমী বাস্তবতা।

পরিশ্রম বিফলে যায় না। আর যদি হয় মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে একদল পবিত্র মানুষের সমন্বয়ে, তবে তার লক্ষ্যে পৌঁছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিসিবির পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে ক্রিকেট নিয়ে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করা বাইশ গজ থেকে কে জানে অদূর ভবিষ্যতে কেউ হয়তো নাম লেখাবেন সেরার খাতায়। বিজয়ের পর বাইশ গজের গানের তালে তাল মিলিয়ে গাইবেন, প্রত্যয় উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার সুর, লাল-সবুজের কীর্তি ডানা মেলবে বহু দূর…।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন