default-image

গতকাল বুধবার সকাল ১০টা। নগরের কর্নেলহাট এলাকা। যানজটে আটকে আছে গাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়ি, যাত্রীবাহী বাস-টেম্পো, মালভর্তি ট্রাক—সবই আছে গাড়ির এই সারিতে। আর িসএনিজচালিত অটোরিকশা তো আছেই।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের অবরোধ অব্যাহত, চলছে হরতালও। কিন্তু সেই অবরোধ-হরতালে প্রভাব কমছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে নগরজীবন। যতই দিন গড়াচ্ছে, শহরে যান চলাচল বাড়ছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও ব্যাংক, বিমা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে লেনদেন আগের তুলনায় বেড়েছে। কলকারখানায় উৎপাদনও অব্যাহত রয়েছে। ব্যাঘাত হচ্ছে না চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাসে। মানুষ প্রয়োজনের খাতিরে ঘর থেকে বের হলেও আতঙ্ক কাটেনি।
পরিবহনশ্রমিকেরা জানান, টানা অবরোধের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম নগরে যানবাহন চলাচল কম ছিল। এরপর টানা হরতাল শুরু হলে যানবাহন চলাচল আরও কমে যায়। তবে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে রাস্তাঘাটে যানবাহনের চলাচল বেড়েছে। এমনকি অফিস ছুটির সময় কোনো কোনো সড়কে কিছু সময়ের জন্য যানজটও দেখা দেয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের ইপিজেড, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, নিউমার্কেট ও স্টেশন রোড এলাকায় যান চলাচল আগের চেয়ে বেড়েছে। ইপিজেড ও আগ্রাবাদ এলাকায় প্রায় সময় যানজট হচ্ছে।
ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা সৌমেন দত্ত বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতে এবং বিকেলে যাওয়ার সময় ইপিজেড মোড়ে যানজট লেগেই থাকে। এখানে কারখানাগুলোর উৎপাদনও স্বাভাবিক। তবে রাস্তায় চলাফেরার সময় আতঙ্কে থাকি।’
জানা গেছে, ইপিজেডে ১৭৮টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি চালু রয়েছে। এসব কারখানার উৎপাদন ও আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক রয়েছে। কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য পরিবহনও স্বাভাবিক বলে জানান কারখানার কর্মকর্তারা। তবে এ ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম পরিবহন খরচ কিছুটা বেড়েছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (বেপজা) চট্টগ্রামের মহাব্যবস্থাপক মো. খুরশীদ আলম বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বন্দর কাস্টমস থানা সবকিছু আমাদের আশপাশে। তাই পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আর উৎপাদন স্বাভাবিক। সবকিছু স্বাভাবিক সময়ের মতোই চলছে। আমাদের শ্রমিকেরাও প্রতিদিন আসছেন। তাঁরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই পরিস্থিতির সঙ্গে।’
একইভাবে নগরের কর্ণফুলী ইপিজেড, কালুরঘাট শিল্প এলাকা, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকায়ও সব কটি কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। তবে পণ্য পরিবহনে মাঝেমধ্যে কিছুটা সমস্যা হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
এদিকে হরতাল-অবরোধে বন্দর থেকে পণ্য খালাসে কোনো ব্যাঘাত হচ্ছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সচল থাকায় মূলত বন্দর থেকে অনায়াসে পণ্য খালাস করে নিতে পারছেন ব্যবসায়ীরা। বন্দরে এখন গড়ে প্রতিদিন ২ হাজার ৩০০ কনটেইনার (প্রতিটি ২০ ফুট দীর্ঘ) খালাস হচ্ছে। গত মঙ্গলবার বন্দর ঘুরে স্বাভাবিক সময়ের মতোই পণ্য খালাস, জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর চিত্র দেখা গেছে। আবার রেলপথেও ঢাকার কমলাপুর ডিপো থেকে নিয়মিত কনটেইনার আনা-নেওয়া হচ্ছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, হরতাল-অবরোধে রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ হচ্ছে। সব জাহাজ পর্যাপ্ত রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার নিয়ে বন্দর ছাড়ছে। কারখানা থেকে প্রথমে বেসরকারি ডিপোগুলোতে পণ্যভর্তি কাভার্ড ভ্যান আনা হচ্ছে। এরপর বেসরকারি ডিপোতে কনটেইনারে বোঝাই করে সেসব পণ্য বন্দর দিয়ে জাহাজে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে লেনদেনও আগের চেয়ে বেড়েছে বলে বিভিন্ন ব৵াংকের কর্মকর্তারা জানান। তবে স্বাভাবিক সময়ের মতো এখনো লেনদেন হচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়ান ব্যাংকের এক ব্যবস্থাপক জানান, ব্যাংকের লেনদেন ভালোই হচ্ছে। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে এখনো কিছুটা কম। আগে হরতালে ব্যাংকে কোনো লেনদেন হতো না। এখন ওই প্রথা ভেঙে গেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন বিপণিবিতানও খোলা রয়েছে। অবরোধের প্রথমদিকে নগরের বিপণিবিতানগুলো বন্ধ থাকত। এখন নগরের নিউমার্কেট, মিমি সুপার মার্কেট, সানমার ওশান সিটি, আখতারুজ্জামান সেন্টারসহ সব বিপণিবিতান খোলা রয়েছে। তবে ক্রেতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মিমি সুপার মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, কেনাকাটায় ব্যস্ত অনেক ক্রেতা। তাঁদের মধ্যে একজন নগরের মুরাদপুরের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে ভয়ে ভয়ে বের হইনি। এখন প্রয়োজনের তাগিদে বের হতে হচ্ছে। লোকজনও কম নয়। মানুষ আর কত দিন এভাবে কাজ বাদ দিয়ে থাকবে?’
দেশের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যের লেনদেন আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। প্রতিদিন বাজারে পণ্য বেচাকেনা চলছে। তবে এখনো স্থবিরতা কাটেনি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘খাতুনগঞ্জ থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য সরবারহ হয়। কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে পণ্য সরবরাহ এখন ৩০ শতাংশের মতো কমে গেছে। তবে প্রথমদিকের চেয়ে কিছুটা উন্নত হচ্ছে পরিস্থিতি। একেবারে স্বাভাবিক হয়নি। আতঙ্ক রয়েছে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন