default-image

প্রতিদিনের মতো বাসা থেকে বেরোনোর সময় আইনজীবী স্বামীর পকেটে গুঁজে দিয়েছিলেন টাই, সিল ও কলম। কথা ছিল খুলনা জজ আদালত হয়ে বাগেরহাটে গ্রামের বাড়ি যাবেন। সন্ধ্যার মধ্যেই আবার ফিরবেন বাসায়। কিন্তু এরপর কেটে গেছে সাড়ে তিন বছরের বেশি। ফিরে আসার সন্ধ্যাটা আর ফেরেনি। এখনো স্বামী নিখিল কুমার মোহন্তের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন পারুল মোহন্ত।
নিখিল মোহন্তের (৬২) গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার চুনখোলা গ্রামে। ২০১৩ সালের ১৬ জুন চুনখোলায় যাওয়ার কথা বলে খুলনা শহরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কর্মজীবনের প্রথমদিকে শিক্ষকতা করতেন নিখিল। বিয়ের আগেই তা বাদ দিয়ে শুরু করেন আইন পেশা। নিজের উপার্জন দিয়ে কেনেন পাঁচ বিঘা জমি। তবে স্ত্রী-সন্তান না থাকায় তা রেজিস্ট্রি করেন বাবার নামে। বিয়ে করার পর জমি নিজের নামে নিতে চেয়েছিলেন নিখিল। তবে তার আগেই তাঁর মা-বাবা দুজনই মারা যান। পরে কয়েক দফা সালিস-বিচার বসলেও জমিগুলো ভাইদের কাছ থেকে ফেরত নিতে পারেননি তিনি।
স্ত্রী পারুল মনে করছেন, ওই জমিই তাঁর স্বামীর জীবনে কাল হয়েছে। ওই সম্পত্তির লোভে নিখিলের মেজ ভাই বিবেক মোহন্ত তাঁর স্বামীকে খুন করে লাশ গুম করেছেন।
তবে নিখিলের ভাই বিবেক মোহন্ত মুঠোফোনে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, নিখিল পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ও নিজের কেনা সব সম্পত্তি তাঁদের কাছে বিক্রি করে গেছেন।
নিখিলেরা চার ভাই, দুই বোন। অপর দুই ভাই ভারতে চলে গেছেন। দুই বোন বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে।
এত দিন স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকার পর গত বুধবার পারুল খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের আমলি আদালত ‘ক’ অঞ্চলে নালিশি মামলা করেছেন। এতে নিখিল মোহন্তকে অপহরণের পর গুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার আসামি নিখিলের ভাই বিবেক, বিবেকের দুই ছেলে ও জামাতা। আদালত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) আদেশ দিয়েছেন। ২০ মার্চ এ বিষয়ে আদালতকে অবগত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পারুল এখন খুলনা নগরের মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। সংসার চালানোর জন্য তিনি ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ান। গত বৃহস্পতিবার ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ছোট আধপাকা এক কক্ষের একটি ঘর। আসবাব বলতে দুটি খাট, একটি বড় ও একটি ছোট টিনের বাক্স ও একটি আলনা। কথা বলার একপর্যায়ে বাক্স থেকে একটি ব্যাগ বের করলেন পারুল। ব্যাগ থেকে একে একে বের করেন নিখিলের ব্যবহৃত কালো গাউন, কালো কোট, চশমা ও সিল-প্যাড। পারুল সেগুলো পরম যত্নে তুলে রেখেছেন স্বামী ফিরে আসার অপেক্ষায়। এগুলো দেখাতে দেখাতে আরেকবার কেঁদে বুক ভাসালেন তিনি।
পারুল জানান, গত ডিসেম্বর এ বাসায় উঠেছেন। এর আগে থাকতেন নগরের মৌলভীপাড়া এলাকার টিবি বাউন্ডারি সড়কের একটি বাসায়। সেখান থেকেই বের হয়ে নিখোঁজ হন নিখিল। স্বামীকে খুঁজতে কোথাও বাদ রাখেননি তিনি। হুজুর-ফকিরের শরণাপন্ন হওয়া থেকে শুরু করে যখন যে যা বলেছেন, সব ধরনের চেষ্টা করেছেন।
পারুলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১৯৯৯ সালে নিখিলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তখন পারুলের বয়স ছিল ৩০-৩২ বছর, নিখিলের ৪৫। বিয়ের দুই বছরের মাথায় একটি মেয়ে হলেও পরে সে মারা যায়। এরপর আর সন্তান হয়নি। একবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হন নিখিল; পাশাপাশি ডায়াবেটিসের সমস্যা ছিল। এসব কারণে ভালোভাবে আইন পেশা চর্চা করতে পারতেন না। এ অবস্থায় সংসার চালাতে টিউশনি শুরু করেন পারুল।
নিখিল নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ১৭ জুন পারুল খুলনা সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। একইদিন তিনি বিষয়টি লিখিতভাবে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের জানান।
পারুল বলেন, এরপর তিনি স্বামীকে খুঁজতে বাগেরহাটে শ্বশুরবাড়িতে যান। এ সময় নিখিলের ভাই বিবেক মোহন্ত তাঁকে বলেন, নিখিল এসেছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যায় আবার খুলনার উদ্দেশে ফিরে যান। তবে বিবেক প্রথম আলোকে বলেন, নিখোঁজ হওয়ার দিন নিখিল গ্রামের বাড়িতে যাননি।
কিছুদিন পর বিবেক পারুলকে বলেন, নিখিল ভারতের চব্বিশ পরগনার জেলে রয়েছেন। এরপর সেখানে ছুটে যান তিনি। তবে নিখিলকে পাওয়া যায়নি। তখনই তাঁর সন্দেহ হয়, নিখিল নিখোঁজ হওয়ার পেছনে বিবেকের হাত রয়েছে।
পারুল হাত থেকে এখনো শাখা খোলেননি; মোছেননি সিঁথির সিঁদুর। এর কারণ জানতে চাইলে অশ্রুভেজা কণ্ঠে পারুলের উত্তর, ‘আমি সম্পত্তি চাই না, আমার নিখিলকে ফেরত চাই।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন