বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একটু বাড়তি আয়ের আশায় কয়লাশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে আসা জসিম জানেন না এ কাজে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি না। তাঁর স্ত্রীও বললেন, এ রকম কিছু তিনি শোনেননি। তবে তিনি বললেন, হাড়ভাঙা খাটুনি হয়। দিনশেষে শরীর আর চলতে চায় না। এরপরও সন্তানদের মুখে দুই বেলা খাবার তুলে দিতে পারছেন। ধারদেনাও অনেক। তা পরিশোধ করতে এই কাজ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়লাশ্রমিকদের শরীরে তিনভাবে ক্ষতিকর ডাস্ট প্রবেশ করে। বিশেষ ধরনের মাস্ক ব্যবহার না করায় সরাসরি মুখ দিয়ে ঢুকছে। এ ছাড়া নিশ্বাসের সঙ্গে এবং লোমকূপের ভেতর দিয়েও শরীরে ডাস্ট প্রবেশ করছে। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্য পড়ছেন তাঁরা। শ্বাসকষ্টসহ ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি পর্যন্ত রয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে কয়লাশ্রমিকদের কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে দেখা যায়নি।

শুধুই জীবিকা!

জাহাজ থেকে কয়লা নামানোর কাজে একটু বেশি আয় হয় বলে শ্রমিকেরা এই মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় আসেন। যাঁরা পরিবার নিয়ে আসেন, তাঁরা আমিনবাজার ও গাবতলীর আশপাশের নিম্নাঞ্চলে কম টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। তাঁদের অধিকাংশের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে না। আর যেসব শ্রমিক একা আসেন, তাঁরা থাকেন শ্রমিক সরদারদের তৈরি করা অস্থায়ী মেসে।

সুনামগঞ্জ থেকে আসা জসিম–আসমা দম্পতি প্রতিদিন ভোরে আমিনবাজারের বড়দেশি গ্রাম থেকে তুরাগ নদ পার হয়ে গাবতলীর দ্বীপনগরে কয়লা নামানোর কাজ করতে যান। ফেরেন সন্ধ্যার পর। সারা দিন ভাড়া বাসায় আট বছরের সায়মা তার দুই বছর বয়সী ভাই জুনায়েদকে সামলে রাখে। গ্রামের বাড়িতে দাদির কাছে থাকা বড় তিন বোনও (বয়স ১০–১৪ বছরের মধ্যে) স্কুলে যায় না। জসিম–আসমাও লেখাপড়া করেননি।

ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারে জানতে চাইলে সায়মা বলেন, তিনবেলা ঠিকঠাক খাবারই জোটে না, পড়ালেখা করাবেন কীভাবে? এক ছটাক জমিও নেই। কাজ করলে খাবার জোটে। কাজ না করলে উপোস থাকতে হয়।

আরও কয়েকজন কয়লাশ্রমিক সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই কারণে তাঁরা সন্তানদের লেখাপড়ায় আগ্রহী নন। প্রথমত, অভাবের সংসারে লেখাপড়াকে বাড়তি বোঝা মনে করেন। তাঁরা চান, কিশোর বয়স থেকেই সন্তানেরা কাজ করে পরিবারকে সহযোগিতা করবে। দ্বিতীয়ত, সাত মাস কর্মস্থলে এবং বাকি পাঁচ মাস গ্রামে থাকতে হয়। এতে সন্তানদের লেখাপড়া করানো সম্ভব নয় বলে তাঁদের ভাষ্য।

কয়লা পুড়িয়ে ইট বানানো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আমদানি করা নিম্নমানের কয়লা ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কয়লায় সালফারের পরিমাণ অনেক বেশি। সরকার বলছে, ইটভাটায় কয়লার ব্যবহার বন্ধ করবে, কিন্তু আমদানি বন্ধ করছে না। এখনই এটা বন্ধ করতে হবে
সৈয়দা রিজওয়ানা , বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী

ইটভাটার জন্য ‘নিম্নমানের কয়লা’ আমদানি

মূলত ইটভাটায় ইট তৈরিতে জ্বালানি পোড়ানোর জন্য বিটুমিনাস শ্রেণির কয়লা আসে গাবতলী ও আমিনবাজারে তুরাগ নদের ঘাটগুলোতে। ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকা থেকে এসব কয়লা আমদানি করা হয়।

গার্মেন্টসের বয়লার এবং কিছু কারখানার জ্বালানি হিসেবেও এর ব্যবহার আছে। তবে তা খুবই কম। বর্ষা শুরু হলে ইটভাটাগুলো বন্ধ থাকে। এতে তখন আমদানিও বন্ধ থাকে। তখন শ্রমিকেদেরও কাজ থাকে না।

কয়লা কেনাবেচায় জড়িত ব্যক্তিরা জানান, ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোয় প্রায় সাড়ে চার হাজার ইটভাটা আছে। এসব ইটভাটার চাহিদা মেটে গাবতলীতে আসা কয়লায়। প্রতি ইটভাটায় এক রাউন্ডে বা একবারে প্রায় ৮ লাখ ইট পোড়ানো হয়। এতে লাগে ১৫০ মেট্রিক টন কয়লা। প্রতি মৌসুমে গড়ে ৮ রাউন্ড ইট পোড়ানো হয় একটি ভাটায়। এই হিসাবে একটি ইটভাটায় কয়লা লাগে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। সাড়ে চার হাজার ইটভাটার জন্য ৫৪ লাখ মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন হয়। এই কয়লা আমদানিমূল্য প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

শ্রমিক সরদার বাবু হোসেন প্রায় ২০ বছর ধরে গাবতলীর দ্বীপনগর এলাকায় আছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ইটভাটায় কয়লার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছেই। প্রতিবছর কয়লা আমদানির পরিমাণও বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, কয়লা পুড়িয়ে ইট বানানো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আমদানি করা নিম্নমানের কয়লা ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কয়লায় সালফারের পরিমাণ অনেক বেশি। সরকার বলছে, ইটভাটায় কয়লার ব্যবহার বন্ধ করবে, কিন্তু আমদানি বন্ধ করছে না। এখনই এটা বন্ধ করতে হবে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানেন না অনেক শ্রমিক

দ্বীপনগর এলাকায় কথা হয় ষাটোর্ধ্ব আছিয়া খাতুনের সঙ্গে। তাঁর বাড়িও জসিম–আসমা দম্পতির গ্রামে। স্বামী মহরম আলী সাত বছর আগে মারা গেছেন। কোনো জমিজমা নেই। বড় তিন ছেলে বিয়ে করেছেন। ছোট মেয়ের বিয়ে হয়নি। ছেলে–মেয়েদের কেউ লেখাপড়া করেননি। গ্রামে কাজ নেই। মহাজনের কাছ থেকে সুদে ৬০ হাজার টাকা ঋণ করেছেন। একটু বাড়তি আয়ের জন্য দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কয়লাশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে আমিনবাজারের বরদেশি গ্রামে এসেছেন। তাঁর তিন ছেলের সঙ্গে তাঁদের স্ত্রীরাও কয়লা নামানোর কাজ করেন।

আছিয়া জানালেন, আমিনবাজার এলাকায় তাঁদের গ্রামের অন্তত ২০টি পরিবার মৌসুমি কয়লাশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এসেছেন এ বছর। সিলেট অঞ্চল থেকে আসা এ ধরনের পরিবারের সংখ্যা শতাধিক। তাদের কেউ কেউ পাঁচ–ছয় বছর ধরে আসছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানতে চাইলে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারলেন না আছিয়া। তবে কেবলারচর এলাকায় পঞ্চাশোর্ধ্ব আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলছিলেন, তিনি এক মাস আগে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে এসেছেন। এক মাস কয়লার কাজ করার পর তাঁর নিশ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। আগে এ ধরনের সমস্যা ছিল না। কিছুদিন কাজ করে তিনি গ্রামে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছেন।

কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁরা বলেন, কয়লার কাজে ঝুঁকির কথা তাঁদের কেউ কখনো বলেনি। তবে অন্তত এক মৌসুমে (সাত মাস) কয়লার কাজ করেছেন, এমন আটজন শ্রমিক জানান, আগে তাঁদের শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলেও এখন কাশি হয়। কখনো কখনো নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় তাঁদের।

জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাইফুদ্দিন বেননূর প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের ধূলিকণা শ্বাসের সঙ্গে ঢুকলে শ্বাসকষ্ট হওয়ার পাশাপাশি লিভার, কিডনি ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে, কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে মানুষকে একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়।

কর্মঘণ্টা নেই

বেশ কয়েকজন কয়লাশ্রমিক প্রথম আলোকে বলেন, ভোর পাঁচটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তবে ঘণ্টা হিসাবে মজুরি পান না তাঁরা। এক টুকরি কয়লা নামালে তাঁরা একটি করে টোকেন পান। টোকেন জমা দিয়ে তিন টাকা করে পান। শ্রমিক সরদারের প্রতিনিধিরা এই টোকেন দেন। সারা দিন কাজ করলে একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ ৮০০ টাকার মতো আয় করতে পারেন বলে জানান তাঁরা।

কেবলারচরের শ্রমিক সরদার মজিবুর রহমান বলেন, এখানে কোনো শ্রমঘণ্টা নেই। টুকরি টানলে টাকা, না টানলে টাকা নেই। শ্রমিকেরা যদি কাজ না করে বিশ্রাম নেন, তাতেও কোনো জোরজবরদস্তি নেই। এখানে শোষণের কোনো বিষয়ও নেই। দিন শেষে টোকেন জমা দিয়ে টাকা বুঝে নেন শ্রমিকেরা। কারও টাকা বাকি রাখা হয় না।

শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে ওয়ার্কার্স রিসোর্স সেন্টার। সংগঠনটির ব্যবস্থাপক ও শ্রম বিশেষজ্ঞ খোন্দকার আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে যাঁরা কয়লার কাজ করেন, তাঁদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাঁরা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রমিক সরদারদের মাধ্যমে নিষ্পেষিত হন। তাঁরা নিজেরাও তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানেন না। তাঁদের আইনি সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই।

শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গৌতম কুমার প্রথম আলোকে বলেন, কয়লা ওঠানো-নামানোর কাজ খুবই অপরিচ্ছন্ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শ্রমিক ইউনিয়ন বা ট্রেড ইউনিয়নের আওতাভুক্ত হওয়া খুবই জরুরি। এতে তাঁদের মজুরি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতের সুযোগ তৈরি হবে।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক হোক, শ্রমিকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ট্রেড ইউনিয়নের আবেদন করতে পারবেন এবং সেটার অনুমোদনও দেওয়া হয়। এতে মালিকপক্ষের সঙ্গে তাঁরা দর–কষাকষি করতে পারেন। ইউনিয়ন না থাকলে তাঁদের সেই সুযোগ সীমিত হয়ে আসে।

দরকার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

গাবতলী ও আমিনবাজার এলাকায় ৫০টির বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইটভাটায় কয়লা কেনাবেচা করে। তাদের একটি নূর এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কয়লা নামানোর কাজ করান শ্রমিক সরদারেরা। তাঁরাই শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন।

এ বিষয়ে তিনজন শ্রমিক সরদারের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁরা বলেন, কয়লার কাজে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি তাঁরা জানেন না। এ বিষয়ে তাঁদের কখনো কেউ কিছু বলেনি। এ–সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনাও নেই।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, কয়লা একধরনের ব্ল্যাক কার্বন। এর সংস্পর্শে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের শরীরে তিন উপায়ে এই ডাস্ট প্রবেশ করে—নিশ্বাসের সঙ্গে, মুখ দিয়ে এবং লোমকূপ দিয়ে। এই কার্বন ফুসফুসে ইনফেকশন (সংক্রমণ) ঘটায়, যা শ্বাসকষ্টের অন্যতম কারণ। অনেক সময় রক্তে কার্বন মিশে ব্লাড ক্যানসারও হতে পারে। কয়লার সংস্পর্শে কয়েক বছর কাজ করলে শারীরিক সক্ষমতাও আর থাকে না। ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হওয়ায় কয়লাশ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, সারা বিশ্বের কয়লাশ্রমিকেরা ‘কোল ডাস্ট পয়জনিংয়ে’র শিকার হয়। ফুসফুসে ডাস্ট প্রবেশ করলে মারাত্মক ক্ষতি হয়। ডাস্ট যেন শরীরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য বিশেষ মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন