আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রত্যেকেই বলেছেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। কেউ অভিযোগ করেছেন, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দক্ষতার ঘাটতি আছে। কেউ বলেছেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী ব্যক্তিদের বরাদ্দ ব্যয় করার সক্ষমতা কম। যে বরাদ্দ পান তা–ও অনেকে চৌকসভাবে খরচ করতে পারেন না।

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও উন্নয়ন সমন্বয়ের সভাপতি আতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ। এই অনুপাত পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ৪৫ মার্কিন ডলার। এই ব্যয় নেপালে ৫৮ ডলার, ভারতে ৭৩, ভুটানে ১০৩ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৫৭ মার্কিন ডলার। গত কয়েক বছরে জাতীয় বাজেটের ৫ থেকে ৬ শতাংশ রাখা হচ্ছে স্বাস্থ্যের জন্য। এই প্রবণতা গতানুগতিক।
আতিউর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ উন্নয়ন বাজেটের অর্ধেক খরচ করতে পারে না। সরকার ব্যয় সংকোচনের নীতি নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় সংকোচন না করে ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দামি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে মনোযোগ কমিয়ে দরকার জনবল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যে ব্যয় বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

মূল উপস্থাপনার ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক আহমেদ মোস্তাক রাজা চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের ব্যক্তিদের বাজেট প্রণয়নে ও বরাদ্দ ব্যয়ে দক্ষতার কমতি আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য স্বাস্থ্য খাতের নিজস্ব কোনো রোডম্যাপ নেই। এ ক্ষেত্রে চিন্তার দীনতা লক্ষ্য করা যায়। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারকে সাহসী ভূমিকা নিতে হবে।’

সারা দেশে চিকিৎসা জনবলের ঘাটতি

default-image

দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির বর্ণনা করে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, এখন উপজেলা হাসপাতালে তৃতীয় পর্যায়ের (টারসিয়ারি লেভেল) স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে। সাভার উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছে।

অন্যদিকে সরকারি দলের সিরাজগঞ্জ–৩ আসনের সাংসদ আব্দুল আজিজ বলেন, দেশের ৪৯৩টি উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকট আছে। দেশের খুব কম উপজেলা হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। সারা দেশে চিকিৎসা জনবলের ঘাটতি রয়েছে।

default-image

কোথায় বিনিয়োগ বাড়ালে স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে তা নিয়ে অনুষ্ঠানে নানা মত উঠে আসে। সাংসদ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে বাজেট বাড়িয়ে দিয়ে প্রাথমিক সেবার পরিমাণ ও মান বাড়াতে হবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, জোর দিতে হবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উন্নতিতে।

সংস্কার দরকার

স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেভাবে চলছে, যেভাবে চালাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতেও আধুনিক, যুগোপযোগী ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে বলে আলোচনায় উঠে আসে। তাই কেউ স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক পরিবর্তনের সুপারিশ করেন। কেউ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য বাজেটের উন্নয়ন অংশের ব্যয় নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, এই অংশের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ খরচ করতে পারছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কেনাকাটার বিষয়ে আটকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দক্ষতা কম। তাদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি আছে, এ–সংক্রন্ত নিয়মকানুনেও গলদ আছে। সমস্যা আছে অডিট বা নিরীক্ষণে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে সংস্কারে হাত দিতে হবে না কি, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার করার পর সেই অনুযায়ী বরাদ্দ দিতে হবে—এই প্রশ্ন তোলেন সৈয়দ আবদুল হামিদ।

default-image

তবে সংস্কার যে প্রয়োজন সেই বিষয়টি বাজেট আলোচনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক মাস ধরে একটি স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করা কথা কেউ কেউ বলছেন। সেই কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন আহমেদ মোস্তাক রাজা চৌধুরী। একটি স্বাস্থ্য সেবা কমিশন তৈরির প্রয়োজনীতার কথা বলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ–১ আসনের সাংসদ সামিল উদ্দিন আহমেদ। স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করার জন্য টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলেন সৈয়দ আবদুল হামিদ। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, হেলথ ক্যাডার ব্যবস্থা ভেঙে চিকিৎসদের জন্য নতুন ক্যাডার করতে হবে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন জরুরি। একাধিক আলোচক স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তাব করেন।

শুরুতে আতিউর রহমান তাঁর উপস্থাপনায় বলেছিলেন, স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় হয় তার ৬৮ শতাংশ ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে বহন করে। এর সিংহভাগ চলে যায় ওষুধের পেছনে। ব্যয়ের এই প্রসঙ্গ তুলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জুলফিকার আলি বলেন, ধনীরা তাদের আয়ের ৫ শতাংশ ব্যয় করে স্বাস্থ্যে, আর দরিদ্ররা স্বাস্থ্যে ব্যয় করে তাদের আয়ের ৩৫ শতাংশ। এই বৈষম্য বাড়ছে।

সরকার ওষুধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের ব্যয়ের বোঝা কমাতে পারে বলে মন্তব্য করেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী, প্রাণ গোপাল দত্ত এবং বিএসএমএমইউর ফার্মাকোলোজি বিভাগের প্রধান মো. সায়েদুর রহমান। আড়াই ঘণ্টার আলোচনা সভায় সঞ্চালক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন