অনুমোদনহীন হাসপাতাল

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নরম সুর

বিজ্ঞাপন
default-image

অনুমোদন ছাড়াই ৫০০ শয্যার গাজীপুর সিটি মেডিকেল হাসপাতালটি পরিচালিত হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং রিজেন্ট হাসপাতাল বা জেকেজিসহ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সহানুভূতি দেখাতে শুরু করেছে। জরুরি প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন অভিযান পরিচালনা করে—সেই অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

অনুমোদন ছাড়াই গাজীপুরে অবস্থিত সিটি হাসপাতালটি পরিচালিত হলেও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সাংসদ মহীউদ্দীন খান আলমগীর এর নেতৃত্বে থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নরম সুর লক্ষ করা গেছে। গত ৩০ জুলাই ‘একটি অনুমোদনহীন হাসপাতাল’ শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিবাদ জানালেও হাসপাতালটির অনুমোদন আছে—এমন দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করেনি। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ হাসপাতালে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়েছেন, যার মূলকথা এ মুহূর্তে আর কোনো অভিযান নয়। যুক্তি হিসেবে চিঠিতে বলা হয়েছে, একটি হাসপাতালে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করায় স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে একধরনের চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে।

অননুমোদিত সিটি হাসপাতাল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এটা পুরোনো হাসপাতাল, অনেক দিন ধরে চলছে। চেষ্টা করা হচ্ছে হাসপাতালটি নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনতে।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য মাসখানেক সময় দেওয়া হয়েছে। তবে সিটি হাসপাতালের বেলায় এই সুযোগ নেই। কারণ, এটি লাইসেন্সই পায়নি। ৫০০ শয্যার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার আবেদন করেই গত প্রায় অর্ধযুগ ধরে পরিচালিত হচ্ছে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সিটি হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, ৫০০ শয্যার হাসপাতাল বলা হলেও সেখানে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ নেই। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। হাসপাতালে ১৫ জন নার্স আছেন। ৪০ জন চিকিৎসক থাকার কথা বলা হলেও কয়েকজন বাদে বাকিরা অনকলে রোগী দেখেন। হাসপাতালের আউটডোরে ১০-১২ জন রোগী দেখা যায়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক তথ্য দিতে রাজি হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নার্স বলেন, এখন তিন-চারজন রোগী ভর্তি আছেন। হাসপাতালে কয়েকজন নার্স ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা হয়, যাঁদের প্রত্যেকের বেতন চার থেকে ছয় মাস বকেয়া রয়েছে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চান্দনা চৌরাস্তা মোড় থেকে ২-৩ কিলোমিটার পশ্চিমে আউটপাড়া এলাকায় জরাজীর্ণ ছয়তলা ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ২০১২ সাল থেকে হাসপাতালটির কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিফায়েত উল্লাহ শরীফ গতকাল হাসপাতালে ছিলেন না। হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুল হামিদও ছিলেন না হাসপাতালে। মুঠোফোনে আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে জানান, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিছুদিন ধরেই হাসপাতালে আসছেন না। তবে তাঁর সঙ্গে হাসপাতালের যোগাযোগ হচ্ছে।

গাজীপুরের সিভিল সার্জন মো. খায়রুজ্জামান প্রথম আলোকে জানান, হাসপাতাল নিয়ে অভিযোগ ওঠায় সিটি মেডিকেল কর্তৃপক্ষকে ডাকা হয়েছিল। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজীপুরের বাইরে থাকায় তিনি দেখা করতে পারেননি। তিনি বলেন, চলতি মাসের মধ্যে গাজীপুরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে কাগজপত্র হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্য কেউ তা না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এদিকে হাসপাতালের অনিয়ম-অব্যবস্থাসহ সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে গত ৩০ জুলাই গাজীপুর মেট্রোপলিটনের বাসন থানায় অভিযোগ নিয়ে যান সিটি ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম। তবে এ অভিযোগ নেওয়া হয়নি। জানতে চাইলে কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জিডির কপি থানা গ্রহণ করলেও জিডি হিসেবে নেয়নি। সিটি মেডিকেল কলেজ গভর্নিং বডির সাবেক চেয়ারম্যান এ এস এম বদরুদ্দোজার স্বাক্ষরে অভিযোগটি থানায় পাঠানো হয়।

গাজীপুর মহানগরের বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, কেউ জিডি নিয়ে আসছিল, এটি তিনি মনে করতে পারছেন না। 

এদিকে তথ্য গোপন করে গাজীপুরে স্থানীয় একটি বেসরকারি ব্যাংকে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তিনটি হিসাব খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এ এস এম বদরুদ্দোজা। তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ব্যাংকের ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্টদের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বদরুদ্দোজা বলেন, চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে প্রাপ্য টাকা না দেওয়ায় কোম্পানি হস্তান্তর হয়নি। অথচ কোম্পানির নামে জালিয়াতি করে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে, যেটা অবৈধ। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন