সড়কে গাছ কাটার হিড়িক

বিজ্ঞাপন
>

default-image

গাছপালা সড়কটির ভাঙন ঠেকাতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। এভাবে গাছ কাটা হলে সড়কে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।

নান্দাইল ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আওতাধীন মধুপুর-দেওয়ানগঞ্জ সড়ক থেকে গাছ কেটে বিক্রির ধুম পড়েছে। গত দুই সপ্তাহে প্রায় শতাধিক গাছ কাটা হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। 

সড়কটি প্রশস্ত করা হবে, সরকারি লোকজন গাছ কেটে নিয়ে যাবে, এ ধরনের অপপ্রচার চালানোর পর থেকে গাছ কাটা শুরু হয় বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

সড়কটি মধুপুর বাজার থেকে দেওয়ান বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। মধুপুর বাজারটি ঈশ্বরগঞ্জের মগটুলা ইউনিয়নের আওতাধীন। আর দেওয়ানগঞ্জ বাজার নান্দাইলের খারুয়া ইউনিয়নের আওতাধীন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নান্দাইল কার্যালয় সূত্র জানায়, মধুপুর-দেওয়ানগঞ্জ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার। এলজিইডি একাধিকবার সড়কটি সংস্কার করেছে। তখন কোনো গাছ কাটা পড়েনি। সড়কের পশ্চিম কিনার ব্রহ্মপুত্র নদের চর। তাই ওই পাশের অসংখ্য গাছপালা সড়কটির ভাঙন ঠেকাতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। এভাবে গাছ কাটা হলে সড়কে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।

গত মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সড়কে অবস্থান করে দেখা যায়, কিছুদূর পরপর কাটা গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে। মধুপুর বাজারের চৌরাস্তা থেকে দক্ষিণ দিকে কিছুটা এগিয়ে গেলে সড়কের শূন্য কিলোমিটারের ফলক। ওই ফলক লাগোয়া শহীদস্মৃতি গ্রন্থাগার অবস্থিত। ওই গ্রন্থাগারের সামনের দুটি রেইনট্রিগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। গ্রন্থাগারের সদস্য মো. জাকির হোসেনের কাছে সড়কের পাশ থেকে গাছ কাটার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শহীদস্মৃতি গ্রন্থাগার এ দুটি গাছের মালিক। আমরা এখানে ভবন নির্মাণ করব। তাই দুটি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

গ্রন্থাগার থেকে দক্ষিণে কিছুটা এগিয়ে গেলে তাজপুর গ্রামের ঈদগাহ মাঠ। সড়ক লাগোয়া ওই মাঠের কোনায় থাকা একটি বিশাল আকারের রেইনট্রিগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ঈদগাহ মাঠের কোনো সদস্যকে সেখানে পাওয়া যায়নি।

কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলে পরিতোষ চন্দ্র নামের এক ব্যক্তি নিজেকে বীর বেতাগৈর ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানের বরাত দিয়ে সড়কের পাশের বাসিন্দাদের গাছ না কাটার জন্য তিনি বলেছেন। কিন্তু কেউ কথা শুনছেন না।

ঈশ্বরগঞ্জের মধুপুর ও তাজপুর গ্রামের এবং নান্দাইলের বীর কামাটখালী (উত্তর), বীর কামাটখালী (দক্ষিণ), লোহিতপুর, হাটশিরা গ্রামের একটি চক্র সড়কের পাশের গাছ কাটার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।

বীর কামাটখালী গ্রামের দুজন নারী বলেন, সপ্তাহ দুয়েক আগে এলাকায় মাইকিং করা হয় সড়কটির দুই পাশ প্রশস্ত করা হবে। প্রচুর গাছ কাটা পড়বে। কর্তিত গাছ সরকার নিয়ে যাবে। এ ধরনের প্রচারণার পর এলাকায় গাছ কাটার হিড়িক পড়ে যায়।

নান্দাইলের কানুরামপুর মোড় থেকে ত্রিশালের বালিপাড়া সেতু পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তের কাজ চলছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক প্রশস্তের কাজ করা হচ্ছে। এই কাজ করতে গিয়ে সড়কের দুই পাশের অসংখ্য গাছ কাটা পড়েছে। মধুপুর বাজারের কাছাকাছি এলাকার কিছু গাছ নিলামে বিক্রি করা হচ্ছে। নিলাম ডাকের প্রচারটি একটি চক্র মধুপুর-দেওয়ানগঞ্জ সড়কে গিয়ে মাইকিং করে প্রচার চালায়। এরপর থেকে ওই সড়কে (এলজিইডির সড়ক) গাছ কাটার হিড়িক পড়ে যায়।

সড়কে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকেরা গাছ কাটার কাজ করছেন। কার নির্দেশে গাছ কাটছেন জানতে চাইলে মো. মোজাম্মেল, আশরাফ, আবদুল মালেকসহ ছয়জন শ্রমিক জানান, এলাকার কিছু লোক ব্যাপারীর কাছে গাছ বিক্রি করেছেন। আর তাঁরা (শ্রমিক) ব্যাপারীর হয়ে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে গাছ কাটা ও পরিবহনের কাজ করছেন।

কর্তিত গাছের আশপাশে গাছ বিক্রির সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তিকে পাওয়া যায়নি। ঝামেলা হতে পারে ভেবে স্থানীয় ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। অনেক জায়গায় গাছ কেটে ফেলার প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য কর্তিত গাছের গোড়ার স্থানটি মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।

একটি জায়গায় গিয়ে পাওয়া যায় বীর কামটখালী গ্রামের মৃত মাহতাব উদ্দিনের ছেলে মো. হেলাল উদ্দিনকে (৫০)। তিনি শ্রমিক দিয়ে দুটি গাছ কাটাচ্ছেন। হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘অন্যরা গাছ কাটছে তাই আমিও কাটছি।’ কার গাছ কাটলেন, প্রশ্নে তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে দুটি গাছ তিনি ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন বলে জানান।

এ বিষয়ে বীর বেতাগৈর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আবদুল মতিন বলেন, তিনি গাছ কাটার বিষয়টি শুনেছেন। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।

এলজিইডি নান্দাইল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের মিয়া বলেন, মধুপুর-দেওয়ানগঞ্জ সড়ক প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। সড়কের গাছ যাঁরা কেটে নিচ্ছেন বা কাটছেন তাঁরা অপরাধ করছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আবদুর রহিম সুজন বলেন, তিনি এলজিইডির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
এলজিইডি জানিয়েছে, সড়কটি তাদের নামে রেকর্ড হয়নি। তাই ধরে নেওয়া যায়, সড়কের জমি খাস খতিয়ানভুক্ত। তাই গাছ কেটে নেওয়ার বিষয়টি দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। তারা সড়কের জমি মাপজোখ করবে। তখন সরকারি জমি থেকে গাছ কাটার প্রমাণ পাওয়া গেলে যাঁরা কেটেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন