>

• একদিকে অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক
• ত্রুটিপূর্ণ যানও দুর্ঘটনার কারণ
• যানবাহনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা নয় লাখ কম

একদিকে অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক; অন্যদিকে ত্রুটিপূর্ণ বা ফিটনেসবিহীন যানবাহন। এই দুইয়ে মিলে সড়ক-মহাসড়ক অনিরাপদ করে তুলেছে। সারা দেশে এখন ফিটনেসবিহীন (চলাচলের অনুপযোগী) যানবাহনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। আর যানবাহনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা নয় লাখ কম। অর্থাৎ নয় লাখ যান চালাচ্ছেন ভুয়া বা অদক্ষ চালক।

হাইকোর্টের নির্দেশনা আর নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ সত্ত্বেও অদক্ষ চালকের দৌরাত্ম্য কমছে না। ত্রুটিপূর্ণ যান ও ভুয়া চালকের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছেই। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে গত বছর সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজারের বেশি।

২০১৫ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং ভুয়া লাইসেন্স জব্দ করার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) নির্দেশ দেন। এরপরও কাজ হচ্ছে না। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে চালকের লাইসেন্স ও যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই করছে। এর ফলে রাজধানী ঢাকায় যানবাহন চলাচল কমে গেছে। বাস চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা বলছেন, কিছুটা আতঙ্কে এবং চালকের লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ হালনাগাদ না থাকার কারণে তাঁরা যানবাহন চলাচল কমিয়ে দিয়েছেন।

বিআরটিএর তথ্য অনুসারে, বর্তমানে সারা দেশে যানবাহন আছে ৩৫ লাখ ৪২ হাজার। মোটরযান আইন অনুযায়ী চাকা, ইঞ্জিনক্ষমতা ও ধরন বিবেচনায় নিয়ে ৪০ ধরনের যানের নিবন্ধন দিয়ে থাকে বিআরটিএ। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের ফিটনেস সনদ দরকার হয় না। কারসহ অবাণিজ্যিক যানবাহনের বেলায় তৈরির সন থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের ফিটনেস সনদ একসঙ্গেই দেওয়া হয়। বাস, ট্রাকসহ আর সব যানবাহনের ফিটনেস সনদ নিতে হয় প্রতিবছর।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, সারা দেশে মোটরসাইকেল আছে ২২ লাখ ৪০ হাজার। বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ১০ শতাংশ গাড়ি নতুন। ফলে কমবেশি পৌনে ১২ লাখ যানবাহনের প্রতিবছরই ফিটনেস সনদের প্রয়োজন হয়। গত বুধবার পর্যন্ত ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার। অর্থাৎ ফিটনেস দরকার হয় এমন যানবাহনের প্রায় ৪৩ শতাংশেরই এখন বৈধতা নেই।

অন্যদিকে সারা দেশে লাইসেন্সধারী চালক আছেন প্রায় ২৬ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে পেশাদার চালকের সংখ্যা ১২ লাখের একটু বেশি। প্রতিটি যানবাহনের জন্য যদি একজন করেও চালকের দরকার পড়ে, তাহলেও দেশে চালকের ঘাটতি আছে ৯ লাখের বেশি। বিআরটিএ সূত্র বলছে, লাইসেন্স নিয়ে অনেকে বিদেশও চলে যান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একেকটি বাণিজ্যিক যানবাহনের পেছনে তিনজন করে চালক প্রয়োজন পড়ে। ব্যক্তিগত গাড়িতেও একাধিক চালক দরকার হয়। কারণ, মোটরযান আইন অনুসারে, পেশাদার চালক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা যানবাহন চালাতে পারবেন। একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি চালানো যাবে না। অর্থাৎ সব মিলিয়ে যানবাহন যত আছে, এর চেয়ে বৈধ লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। এটা না থাকায় অদক্ষ ও ভুয়া চালকেরাও যানবাহন চালাচ্ছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। এ ছাড়া যানবাহনের ত্রুটি ও পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ।

জানতে চাইলে এআরআইয়ের সাবেক পরিচালক ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, যানবাহনের ফিটনেস ও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে অরাজকতা চলছে। যেসব যানের সনদ নেই, সেগুলোর কথা বাদই থাক। সনদ আছে এমন যানও চলার উপযোগী নয়। তাহলে কীভাবে সনদ পেয়ে যাচ্ছে?

বিআরটিএর পরিচালক (সেফটি) মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, লাইসেন্সধারী চালক বাড়াতে তাঁরা মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছেন। আর ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধে পুলিশসহ সরকারের অন্য বিভাগের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ঢাকায় বিআরটিএর মাত্র চারজন ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। আরও ম্যাজিস্ট্রেট পেতে চেষ্টা চলছে। সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

লাইসেন্সব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ
লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিআরটিএর প্রতিটি জেলা ও মহানগর কার্যালয়ে ড্রাইভিং কমপিটেন্সি টেস্ট বোর্ড নামে একটি করে কমিটি আছে। ঢাকা মহানগরে এমন তিনটি কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। বিআরটিএর সহকারী পরিচালক সদস্যসচিব। একজন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), একজন চিকিৎসকসহ অন্য সরকারি সংস্থার প্রতিনিধি থাকেন।

মোটরযান আইন অনুসারে, প্রথমে প্রত্যেককে একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে শারীরিক ও চোখের পরীক্ষায় যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এরপর শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নিতে হয়।

পরে অপেশাদার চালকের জন্য প্রথমে লিখিত পরীক্ষা, এরপর ফিল্ড টেস্ট (কঠিন কিছু পদ্ধতিতে যান চালিয়ে দেখানো) রয়েছে। আর পেশাদার চালকের বেলায় প্রথমে হালকা যানের, এরপর পর্যায়ক্রমে মাঝারি ও ভারী যানের লাইসেন্স নিতে হয়। এই পরীক্ষাগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন না করেই লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ আছে বোর্ডের বিরুদ্ধে।

বিআরটিএ সূত্র বলছে, পরীক্ষা বোর্ডের প্রধান কিংবা অন্য প্রতিনিধিরা নিজেরা উপস্থিত থাকেন খুব কমই। বেশির ভাগ সময়ই প্রতিনিধি পাঠিয়ে দেন। অনেক সময় বিআরটিএর একজন মোটরযান পরিদর্শক পরীক্ষা নিয়ে বোর্ডের সদস্যদের শুধু সই নিয়ে কাজ সারেন।

এর বাইরে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে পেশাদার চালকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যথাযথ পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ পেশাদার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা অনুসারে। এই ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান।

ফিটনেস সনদ যেনতেনভাবে
মোটরযান আইনে যানবাহনের ফিটনেস দেওয়ার আগে ৬০ ধরনের কারিগরি ও যানের বাহ্যিক দিক বিবেচনা করতে হয়। কিন্তু যার অনেকগুলোই খালি চোখে দেখে দেওয়া সম্ভব নয়। সারা দেশে খালি চোখে, অনেক সময় যানবাহন না দেখেই ফিটনেস সনদ দেওয়ার অভিযোগ আছে। বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয়ে ভেহিক্যাল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) নামে একটি যন্ত্র আছে। সেখানে দিনে শ-খানেক যানবাহন পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু সেখানে ফিটনেসের জন্য যানবাহন যায় কয়েক শ।

রাজধানী ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের ৯০ শতাংশই লক্কড়ঝক্কড়। রং উঠে গেছে। লাইট নেই। গ্লাস ভাঙা। মোটরযান আইন অনুসারে এগুলো ফিটনেস সনদ পাওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, এখন মানুষের বাসাবাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। হাসপাতালে অপারেশন স্বজনেরা বাইরে থেকে দেখতে পারেন। কিন্তু বিআরটিএ কার্যালয়ে ঠিকভাবে ফিটনেস দেওয়া হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য কোনো সিসিটিভি নেই। এর কারণ, এখানে টাকার খেলা হয়। এর সুবিধাভোগী একেবারে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0