default-image

কক্সবাজারের কলাতলী-সুগন্ধা সড়কের পাশে বৈশাখী রেস্তোরাঁ। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক (৩৮)। বিধিনিষেধ শুরুর পর রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ায় তাঁর চাকরি নেই। তবু রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন ঘুরে যান তিনি। স্ত্রী ও মা-বাবা নিয়ে চারজনের সংসার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তা এখন তাঁর।  

আজ বুধবার দুপুরে কথা হয় সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বৈশাখী রেস্তোরাঁয় কর্মচারী ছিল ২৯ জন। কারও চাকরি নেই এখন। কখন রেস্তোরাঁ খুলবে জানি না, কয়েক দিনের মধ্যে রেস্তোরাঁ না খুললে না খেয়ে থাকতে হবে।’
একই স্থানে কথা হয় আবাসিক হোটেলের কর্মকর্তা রুহুল আমিনের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। কক্সবাজারের কলাতলীর একটি হোটেলের সহকারী ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে আছেন তিনি। বেতন মাসিক ১৫ হাজার টাকা। শহরের ঝাউতলা গাড়িরমাঠ এলাকায় ৮ হাজার টাকায় টিনশেডের ভাড়া বাসায় থাকেন স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে। সরকারি বিধিনিষেধের ধাক্কা লেগেছে তাঁর আয়েও।


রুহুল আমিন (৪০) প্রথম আলোকে বললেন, ১ এপ্রিল পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ে কক্সবাজার। ফলে হোটেল-মোটেলগুলো অঘোষিতভাবে বন্ধ। মালিকপক্ষ কর্মচারীদের মার্চ মাসের বেতন ধরিয়ে দিয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায়। এপ্রিল মাসের শুরুতেই সংসার চালাতে হিমশিম অবস্থা তাঁর।

বিজ্ঞাপন


কলাতলীর আরেকটি গেস্টহাউসে কয়েক বছর ধরে চাকরি করছেন বরিশালের মঞ্জুর আলম খান। স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে থাকেন শহরের মোহাজের পাড়ার একটি ভাড়া বাসায়। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে তিনি দিশেহারা।
মঞ্জুর আলম (৪২) বলেন, ‘মার্চের বেতন নিয়ে এপ্রিল মাসটা কোনোমতে চলছি, কিন্তু দুই মাসের বাসাভাড়া ২৪ হাজার টাকা বাকি। সামনে রোজা, এরপর ঈদ। কীভাবে সংসার চালাব, ভেবে পাচ্ছি না।’
একইভাবে চাকরি হারান চট্টগ্রামের আরেক তরুণী রোকসানা ইসলাম। চার সদস্যের সংসার নিয়ে তিনিও বিপাকে।

কক্সবাজারের চার শতাধিক হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ এবং দুই শতাধিক রেস্তোরাঁয় কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি করেন, তার সঠিক তথ্য কোথাও নেই। বিধিনিষেধ পরিস্থিতিতে হোটেল-মোটেল বন্ধ হয়ে পড়ায় কতজন কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন, সে তথ্যও নেই কারও কাছে।

default-image


তবে হোটেল-রেস্তোরাঁয় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্টহাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য, ৭ শতাধিক আবাসিক হোটেল-গেস্টহাউস ও রেস্তোরাঁয় চাকরি করছেন অন্তত ৩০ হাজার লোক। সাত দিনের বিধিনিষেধ শুরুর পর অন্তত ১৫ হাজার কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক ছাঁটাই করা হয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্টহাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, নানা চেষ্টাতদবির করেও তাঁরা (ছাঁটাই হওয়া কর্মচারীরা) এপ্রিল মাসের বেতন পাচ্ছেন না। অনেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।


করিম উল্লাহ বলেন, গত বছরের মার্চে যখন করোনা সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি শুরু হয়, তখনো ৩০ হাজার কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল বেতন-বোনাস ছাড়াই। অধিকাংশ কর্মচারী সরকারি-বেসরকারি সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।


এ প্রসঙ্গে হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘১১ মাস চাকরি ১২ মাসের বেতন, এ নিয়মে চলে আসছে এখানকার হোটেলে কর্মচারীদের চাকরি। রোজার এক মাস কর্মচারীদের ছুটিতে রাখা হয়। এ সময় বেতনের সঙ্গে বোনাসও দেওয়া হয়। কিন্তু গত বছর মার্চে করোনার প্রভাবে পাঁচ মাস হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ ছিল।

৭ শতাধিক আবাসিক হোটেল-গেস্টহাউস ও রেস্তোরাঁয় চাকরি করছেন অন্তত ৩০ হাজার লোক। সাত দিনের বিধিনিষেধ শুরুর পর অন্তত ১৫ হাজার কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক ছাঁটাই করা হয়েছে।

১৭ আগস্টের পর খোলার প্রস্তুতি নিতেই তিন মাস চলে গেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যবসা করেছে হোটেল-মোটেলগুলো। এখন আবার সাত দিনের লকডাউন। চার শতাধিক হোটেল-মোটেল ও আড়াই শতাধিক রেস্তোরাঁ আবার বন্ধ হয়ে গেল। লোকসান দিতে দিতে মালিকেরা ক্লান্ত। তারপরও আমরা কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিতে মালিকপক্ষকে চাপ দিচ্ছি। এখন দরকার বেকার কর্মচারীদের মানবিক সহায়তা ও মালিকদের সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।’

পর্যটকশূন্য সৈকত

বিকেলে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা গেছে, উত্তর দিকে সিগাল, লাবণী পয়েন্ট হয়ে ডায়াবেটিস হাসপাতাল পয়েন্ট পর্যন্ত পুরো চার কিলোমিটার সৈকতেও কেউ নেই। সৈকতে উড়ছে লাল নিশানা, পানির কাছে পর্যটকের বসার জন্য যে কয়েক হাজার কিটকট (চেয়ার-ছাতা) বসানো ছিল, তাও তুলে বালুচরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।
করোনা সংক্রমণ রোধে জেলা প্রশাসন ১ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সমুদ্রসৈকতসহ জেলার সব বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জিললুর রহমান বলেন, কোনো লোকজন যাতে সৈকতে নামতে না পারে, সে জন্য একাধিক পয়েন্টে পুলিশি পাহারা বসানো আছে।

মার্চে সংক্রমণও বেড়েছে

এদিকে ৬ এপ্রিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে ৫৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৮১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আগের দিন ৫ এপ্রিল ৬৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৮৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত জেলায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮৩৩। মারা গেছেন ৮৪ জন। এর মধ্যে ১০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী।
জেলা সিভিল সার্জন মাহবুবুর রহমান বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কক্সবাজারে করোনা নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মার্চে সৈকতে লোকসমাগম বেড়ে যাওয়ায় করোনা সংক্রমণও বেড়েছে। এখন দৈনিক শনাক্ত হচ্ছে ৮০-৮৩ জন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন