গরু বেচে ঘর মেরামত

দেশের যেসব জেলা এবার বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জ। জেলার মানুষেরা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরে এখন ঘরবাড়ি মেরামত করছেন। কিন্তু অনেকের হাতে টাকা নেই। উপায় হলো কোনো সম্পদ বিক্রি করে সেটা দিয়ে ঘর মেরামত করা। ছমির উদ্দিনও একই পরিকল্পনায় তিনটি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাঘবেড় বাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে ছমির উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছেলে আজিজুর রহমান।

আজিজুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু আমরা না, অনেকেই গরু বিক্রি করছে। মানুষই খাইত পারতাছে না। গরুরে কিলা খাওয়াইব, কিলা পালব। কিন্তু মানুষ তো গরু কিনতাছে কম। দামও কম কয়।’

বাঘবেড় ওই এলাকার একটি বড় পশুর হাট। সেখানে ছমির উদ্দিনের মতো আরও অন্তত ১১ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছয়জনই গরু নিয়ে এসেছেন গোখাদ্যের অভাবের পাশাপাশি বন্যায় বিপাকে পড়ে।

বাঘবেড় বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা হয় মধ্যবয়সী সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

তাই এবার কোরবানি কম হবে। তিনি কোরবানি দিচ্ছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘ঘরের এমন কোনো জিনিস নাই পানিতে ক্ষতি হয়নি। টানাটানিতে আছি।’

বন্যা সব শেষ করে দিয়ে গেছে, মানুষ এখনো বিপদে আছে। বড় বড় গৃহস্থরাই এবার কোরবানি দিতে পারবে কি না, সন্দেহ আছে।
এজাজ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক, বাঘবেড় বাজার কমিটি, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, গত বছর একাই ৮৬ হাজার টাকায় গরু কিনে কোরবানি দিয়েছিলেন। এবার পরিবারের সদস্যরা কোরবানি না

দেওয়ার পক্ষে। কিন্তু তাঁর মন মানেনি। তাই প্রতিবেশী আরও দুজনকে নিয়ে ভাগে কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবার তাঁর বাজেট ৩০ হাজার টাকা।

বাঘবেড় বাজারে অনেক গরু আছে। হাটের প্রথম দিন ক্রেতা একটু কম। ঈদের আগের দুই দিনে ক্রেতা বাড়তে পারে। তবে দাম এবার খুব একটা উঠবে বলে মনে করেন না স্থানীয় ব্যক্তিরা। বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক এজাজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্যা সব শেষ করে দিয়ে গেছে, মানুষ এখনো বিপদে আছে। বড় বড় গৃহস্থরাই এবার কোরবানি দিতে পারবে কি না, সন্দেহ আছে।’

বাজার থেকে বের হয়ে উপজেলার খরচার হাওরপারের ফুলভরি নয়াহাটি গ্রামে গিয়ে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে। বাড়িঘর থেকে বন্যার পানি নেমেছে। তবে ঘর বিধ্বস্ত। অনেকেই নিরুপায় হয়ে সে ঘরেই কোনোরকমে থাকছেন। গ্রামের বাসিন্দা লোকমান মিয়া (৬০) প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই গ্রামে এবার কেউ কোরবানি দিব না। গতবার একজন দিছিল। এবার তারা পানি আসার পর যে গেছে, আর আসেইনি।’

পশুর কোনো সংকট নেই। তবে গবাদিপশু কোরবানি আগেরবারের চেয়ে অন্তত ১০ হাজার কম হতে পারে।
মো. আসাদুজ্জামান, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা

সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যার কারণে এবার গত বছরের তুলনায় জেলায় কোরবানি উপযোগী পশুর সংখ্যা কমেছে। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ৬৪ হাজার ৬০০ গবাদিপশু। এবার কোরবানির উপযোগী পশুর সংখ্যা ৫৮ হাজার ৩৬৮। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, বন্যায় দেড় হাজারের বেশি গবাদিপশু মারা গেছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পশুর কোনো সংকট নেই। তবে গবাদিপশু কোরবানি আগেরবারের চেয়ে অন্তত ১০ হাজার কম হতে পারে।

হাট জমেনি সিলেটে

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের খাগাইল বাজারে গতকাল সাপ্তাহিক পশুর হাট বসেছিল। খামারি ও গরু ব্যবসায়ীরা জানান, চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে ফড়িয়া ও খামারিদের পাশাপাশি অনেক সাধারণ কৃষকও নিজেদের গরু ও ছাগল বিক্রি করতে হাটে হাজির হয়েছিলেন। ফলে হাটে অনেক গবাদিপশু এসেছে। তবে ক্রেতা কম।

হাটটির একাধিক ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, অনেক গোচারণভূমি এখনো পানিতে ডুবে আছে। তাই ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছে। ভেসে গেছে খড়কুটোও। ফলে উপজেলায় গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গরু বিক্রি ছাড়া উপায় নেই মানুষের।

উপজেলার ইসলামপুর পশ্চিম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বন্যার কারণে অনেকের হাতে নগদ টাকা নেই। তাই অন্যান্য বছরের চেয়ে কোরবানির পশু এবার কেনাবেচা কম হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, উপজেলায় মোট পাঁচটি স্থায়ী পশুর হাট রয়েছে। পাশাপাশি পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে আরও দুটি অস্থায়ী পশুর হাটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিক্রেতাদের ভাষ্য, এখনো বাজার জমেনি। বাজারে যাঁরা আসছেন, তাঁদের হাতে গোনা কিছু মানুষ গরু কিনছেন। বেশির ভাগই শুধু দাম জিজ্ঞেস করছেন। যাঁরা অন্য বছর একাধিক গরু কিনতেন, এবার তাঁরা একটি কিনছেন। বন্যার কারণে আয়হীন হয়ে পড়ায় অনেকে এবার কোরবানিও দিচ্ছেন না।

পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের খায়েরগাঁওয়ের দুই ভাই নছর মিয়া ও নাসির মিয়া জানান, তাঁদের ছয়টি গরু রয়েছে। বন্যায় গোখাদ্যের সংকটে তাঁরা গরু বিক্রি করে দিতে চাইছেন। তবে হাটে হাটে ঘুরে ঘুরে সঠিক দাম না পাওয়ায় গরু বিক্রিও করতে পারছেন না।

‘এবার কোনো ঈদ নেই’

নেত্রকোনার দুর্গাপুরের গাঁওকান্দিয়া এলাকার ব্যবসায়ী রোহিত হাসান গত বছর পবিত্র ঈদুল আজহায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির গরু কিনেছিলেন। এবার কোরবানিই দিতে পারছেন না। তিনি জানান, গত ১৭ জুন সকালে আকস্মিক বন্যায় তাঁদের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এখন একটি গাছের নিচে তাঁবু টানিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঠাঁই নিয়েছেন।

রোহিত হাসান গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্যা আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। আমাদের এবার কোনো ঈদ নেই। কোরবানির গরু কেনা তো অসম্ভব বিষয়।’

রোহিত হাসানের স্ত্রী চায়না হাসান বলেন, গাঁওকান্দিয়া গ্রামের বাড়িতে তাঁদের দুটি আধা পাকা ঘর এবং একটি টিনের ঘর ছিল। গত ১৭ জুন সকাল আটটার দিকে পানি উঠতে শুরু করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরগুলোও এক এক করে ভেঙে ভেসে যেতে থাকে। তাঁরা একটি বাঁশঝাড়ে বাঁশ আঁকড়ে ধরে বেঁচে যান।

নেত্রকোনায় বন্যাদুর্গত পরিবারগুলোতে যেমন ঈদের কোনো আনন্দ নেই, তেমনি জমেনি ঈদকেন্দ্রিক কেনাবেচাও। জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাটে অনেক কোরবানির পশু উঠেছে। তবে ক্রেতা কম। বিক্রেতাদের দাবি, হাটে বন্যার প্রভাব পড়েছে। অন্য বছরের চেয়ে অনেক কম দামে গরু-ছাগল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।

এবারের বন্যায় দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৭ জুন সকালে মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলে সোমেশ্বরী নদী উপচে পানি গাঁওকান্দিয়া সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানির চাপে সড়ক ভেঙে শত শত বসতবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেক মানুষ এখন নিঃস্ব।

গাঁওকান্দিয়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক ইসলাম উদ্দিনের বাড়িঘর ভেঙে সবকিছু ভেসে গেছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক মুহূর্তেই প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছি। এবার কোরবানির কী হবে, জানি না। কয়েকজনের সঙ্গে মিলে একটি গরু কেনার কথা ভাবছি।’ তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবছর তিনি একটি গরু ও একটি খাসি কোরবানি দেন।

কৃষিকাজ নেত্রকোনা জেলার মানুষের প্রধান জীবিকা। বাড়িতে সংরক্ষিত ধান-চাল বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় অনেক অবস্থাসম্পন্ন কৃষক পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঈদের আনন্দের বদলে এসব পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। অবস্থাসম্পন্নদের কেউ কেউ ভাগে কোরবানি দেওয়ার কথা ভাবছেন।

নেত্রকোনার ১০টি উপজেলায় ৩১টি স্থায়ী পশুর হাট রয়েছে। এবার ঈদে অস্থায়ী আরও ১২৩টি হাট বসানো হয়েছে। গতকাল সদরের ঠাকুরাকোনা এলাকা ও কাইলাটি বালি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর হাটে প্রচুর গরু ও খাসি নিয়ে এসেছেন বিক্রেতারা। কিন্তু ক্রেতাদের উপস্থিতি কম।

নেত্রকোনা-মদন সড়কের কাইলাটি বালি এলাকায় অস্থায়ী হাটে গতকাল বেলা একটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, কালামানিক নামের ৯০০ কেজি ওজনের একটি ষাঁড় নিয়ে এসেছেন সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের উছমান ফারুক। তিনি ওই গরুর দাম হাঁকছেন সাত লাখ টাকা।

ফারুক বলেন, এবার গরুর বাজার মন্দা। যাঁরা গরু কিনতে বাজারে আসছেন, তাঁরা শুধু দাম জিজ্ঞাসা করে চলে যান। হাতে গোনা কয়েকজনই গরু কিনছেন।

‘ধনী, দরিদ্র সবাই ক্ষতিগ্রস্ত’

পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানি দেওয়া পশুর মাংস কোরবানি দানকারী ব্যক্তিরা নিজের পরিবারের জন্য রাখেন, আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের দেন। এভাবে মাংস পৌঁছে যায় সবার ঘরে। একটি গ্রামে যদি গুটিকয়েক পরিবার কোরবানি দেয়, তাহলে সব পরিবারে মাংস পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

বন্যাদুর্গত তিন জেলার মানুষেরা বলছিলেন, পুরো দেশ যখন ঈদের আনন্দ করবে, ভালো রান্না করবে, বন্যাদুর্গত জেলায় কোনো পরিবারে হয়তো মা সেদিন শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাঙা ঘর মেরামতে ব্যস্ত থাকবেন।

সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি আইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলছিলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষ এমন সংকটে আগে কখনো পড়েনি। বন্যায় ধনী, দরিদ্র সবাই একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এটা কাটিয়ে উঠতে বহুদিন লাগবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন