রহিম কাদের হয়তো তাঁর কাঙ্ক্ষিত চার–পাঁচ দিন সময় পাবেন। কিন্তু সবাই সেটা না–ও পেতে পারেন। আমরা গত রোববার যখন হাওরে হাওরে ঘুরছি তখন খবর আসে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে অবিরাম পানি ঢুকছে। ওই দিন ভোরে দাঁড়াইন নদের পানির চাপে বাঁধটি ভেঙে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। কয়েক দিন ধরেই বাঁধটি রক্ষায় কাজ করছিলেন কৃষকেরা।

যত বাঁধ ভাঙবে, ফসল ডুববে, ততই ডুববে শিশুর ভবিষ্যৎ। শিশু পরিণত হবে শ্রমিকে। লেখাপড়া বন্ধ হবে। কাজের খোঁজে ঘর ছাড়তে হবে। বাল্যবিবাহের হার বাড়বে।

রহিম কাদের বললেন, তাঁর অনেক দেনা হয়ে গেছে। কেদারপ্রতি তিন হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে তিনি ২০ কেদার (১০ কেদার তাঁর নিজের) জমিজমা নিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁর ৬০ হাজার টাকা গেছে। এরপর সার, বীজ, শ্রমিকের খরচ আছে। এখন তিনি লাখ তিনেক টাকা ঋণী। এই টাকা ওঠাতে হলে ছেলে–ভাতিজা কারোরই আর লেখাপড়ায় ফেরা হবে না। এখনই তারা ছুটবে অন্যের জমির ধান কাটতে।

এমনিতেই দেশে শিশুশ্রমের হার কৃষি খাতেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় (২০১৬) জানা যায়, এককভাবে সবচেয়ে বেশি শিশু কাজ করে কৃষি খাতে। সেখানে কাজ করে ৫ লাখ ৭ হাজার শিশু। পরিবারের চাহিদা মেটাতে এসব শিশুই নির্মাণশিল্পে, ইটভাটায় অদক্ষ সস্তা শ্রমের উপাদানে পরিণত হয়। শিশুশ্রমের চক্র থেকে শিশুরা আর বের হতে পারে না। শাল্লা ঘুরে আসা এক সংবাদকর্মী জানান, শাল্লা উপজেলার হাওরে ধান কাটায় ব্যস্ত একদল শিশুশ্রমিক তাকে জানিয়েছে, তাদের গ্রাম লাগোয়া কৈয়ারবন ও পুটিয়ার বন চৈত্র মাসেই তলিয়ে গেছে। তাই অন্যের জমিতে ধান কেটে পারিশ্রমিক নিয়ে নিজের পরিবারের সাহায্যের পাশাপাশি যাদের ধান কাটছি তাদেরও কিছুটা উপকার হচ্ছে। এরা সবাই ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্র।

কথা ছিল, ২০১৬ সালের মধ্যে এ দেশে শিশুশ্রমের বিলুপ্তি ঘটবে। করোনা, বন্যা, ফসলহানি কেবলই কঠিন করে দিচ্ছে শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার।

শিশুর সব শ্রম কি শিশুশ্রম?

কর্মরত শিশু, শিশুশ্রম, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের আলাদা সংজ্ঞা আছে। ১৮তম শ্রম পরিসংখ্যানবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং ২০১৩-এর সংশোধন অনুসারে কর্মরত শিশু বলতে বোঝায়, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে যারা সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা পর্যন্ত হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করে। আইন এই শ্রমকে অনুমোদন দিয়েছে। তবে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী কোনো শিশু যদি কোনো ধরনের ঝুঁকিহীন কাজও করে, তবে সেটা শিশুশ্রম হবে। আর ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ যদি সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি কাজ করে, সেটা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কর্মঘণ্টা ও বয়সের বিবেচনায় হাওরের ধান কাটায় নিয়োজিত শিশুরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের ফাঁদে।

শিশুরা কি শুধুই ধান কাটছে?

ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিশু পরিবারের আহারের জন্য ঠেলাজাল নিয়ে মাছ সংগ্রহে নেমে গেছে হাওরের নতুন জলে। কেবল ডিম থেকে মুক্ত হয়েছে এমন ছোট ছোট মাছই উঠছে সেসব জালে। স্কুলের জামা গায়ে ছোট ভাইকে নিয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী জুলেখা মাছ ধরছিল সদ্য মেরামত করা বাঁধের কোল ঘেঁষে। সঙ্গে তার ছোট ভাই। মাছের ছোট হাঁড়িটা তার হাতে। জুলেখার কথা বলার সময় নেই, বাড়ি ফিরে তাকে রান্না করতে হবে মাছ চচ্চড়ি আর ভাত। মা, বাবা আর সপ্তম শ্রেণিতে পড়া বড় ভাই ডুঙ্গা নিয়ে গেছে ধান কাটতে। বেলা পড়ার আগেই তারা ফিরে এসে ভাত চাইবে। জুলেখার আর কোনো জামা নেই। তাই সে স্কুলের জামা পরেই বাইরে আসছে, আসতে হয়। বাবা বলেছিলেন, এবার ধান উঠলে তাকে একটা জামা কিনে দেবেন। সেটা যে এবার হবে না, বুঝে গেছে জুলেখা। আরেকটু বড় হলে সে পোশাক কারখানায় চলে যাবে। মাছ ধরতে ধরতে এতটুকুই জানাল জুলেখা।

কত ধান কাটা বাকি?

হাওর এলাকার সাতটি জেলায় এ বছর ৪ লাখ ৫২ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। আর হাওরের বাইরে এসব জেলায় আরও প্রায় ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে ধান, কোথাও ভুট্টা লাগানো হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মনে করছে, এ পর্যন্ত ৪১ থেকে ৪২ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে মাঠ দেখে তেমন মনে হয়নি। কৃষক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করে জানান, হাওরে নামমাত্র ধান কাটা শুরু হয়েছে। পুরোপুরি ধান পাকেনি। কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন হাওরে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দায় এড়াতে ধান কাটার হিসাব (৪২ শতাংশ) বাড়িয়ে বলছে। কাটা ধান কাঁচা থাকায় বা ভালো করে না পাকার কারণে তার বাজারদর দূরে থাক ধান ভেঙে চাল পাওয়া যাবে কি না, সেটাই এখন প্রশ্ন। একমুঠো ধান হাতের তালুতে পিষে জগদ্দলের হৈমন্তী বালা দেখালেন, চাল নয় সবই ধুলা। অপুষ্ট ধানের মাড় কি এখন হাওরের শিশুদের ভবিতব্য হবে?

ত্রাণের লক্ষ্য থাকবে শিশুরা

ত্রাণ কার্যক্রমের পর যদি দেখা যায় শিশুরা স্কুলে ফেরেনি, তারা শিশুশ্রমের বলি হয়েছে, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, শিশুরা শৈশব হারিয়ে পাড়ি জমিয়েছে অন্য লোকালয়ে টিকে থাকার তাগিদে; তাহলে সেই ত্রাণ কার্যক্রমকে ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। ঈদের পরপরই হাওরের শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে হবে। নৌকা আর দুটো গরম-গরম খাবারের ব্যবস্থা করা লাখ কোটির বাজেটের দেশে কোনো দুশ্চিন্তার কারণ হওয়ার কথা নয়। একটু চিন্তা করলে আর মন থেকে চাইলে শিশু সংবেদনশীল একটা ত্রাণ কার্যক্রম করে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেওয়া যায়।


লেখক গবেষক : nayeem 5508 @gmail. com