১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের (মুজিবনগর সরকার) ঘোষণা দেওয়া হয়। যেকোনো মুহূর্তে এ সরকার বাংলার মুক্ত মাটিতে শপথ নেবে।

পাকিস্তানি হানাদারদের ধারণা, কুষ্টিয়াতেই বাংলাদেশের স্বাধীন সরকার শপথ নেবে।
যুদ্ধবিমানের আনাগোনা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শপথের জায়গা পরিবর্তন করে মেহেরপুরের দিকে নিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তাই যেকোনো মূল্যে কুষ্টিয়া পুনর্দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে পাকিস্তানি হানাদারেরা।

রাতের অন্ধকারে পাকশীর পদ্মা নদী পার হয়ে পেছন দিক থেকে আমাদের প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে প্রতিরোধ বাংকারের দখল নেয় পাকিস্তানি হানাদারেরা। খাদ্য পৌঁছানোর দায়িত্ব নেওয়া স্বেচ্ছাসেবীরা সেটা বুঝতে পারেননি। অনেকেই ১৩ থেকে ১৪ এপ্রিলে খাদ্য দিতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তাঁদের হত্যা করে হানাদারেরা।

পরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভেড়ামারা অংশে প্রায় ৫০টি পরিত্যক্ত সাইকেল পাওয়া যায়। প্রতিটি সাইকেলে দুজন হিসাবে কমপক্ষে ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক পাকিস্তানি হানাদারদের গুপ্তহত্যার শিকার হন।

কথাশিল্পী হাসান মীরের এক ভাইও এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সে কথা তাঁর লেখার পাশাপাশি ‘একাত্তরের সামাজিক ইতিহাস’ (প্রথমা প্রকাশন, ২০২১) গ্রন্থে রয়েছে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কবজায় নেওয়ার পর পাকিস্তানি হানাদারেরা ‘পোড়ামাটি নীতি’ অনুসরণ করে এগোতে থাকে। তারা মানুষ দেখলেই গুলি করে। ঘরবাড়িতে আগুন দেয়।

সেদিন ছিল শুক্রবার। ১৬ এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে কুষ্টিয়ার দিকে মার্চ শুরু করেছে। আকাশে সহযোগিতা করছে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান।

রেললাইন ও সড়কের দুই পাশের জনপদ তখন জনশূন্য। পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও তার আশপাশের গ্রামগুলোর লোকজন আগেই নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছেন।

শুধু যাওয়া হয়নি ভেড়ামারার চণ্ডীপুর গ্রামের পণ্ডিতবাড়ির লোকজনের। তাঁদের বাড়ির দুজন হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাহারায় প্রতিরোধ বাহিনী সঙ্গে ছিলেন। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অন্যদের দেরি হয়ে যায়।

পরিবারটির বড় জামাতা, যিনি রেলওয়ের কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি ঈশ্বরদী থেকে বিহারিদের তাড়া খেয়ে শ্বশুরবাড়ি আশ্রয় নেন। সঙ্গে তাঁর স্কুল-কলেজে পড়ুয়া মেয়েরা আছে।

তা ছাড়া পণ্ডিতবাড়ির বেশ কয়েকজন পুত্রবধূ তখন সন্তানসম্ভবা। এ কারণে হুট করে বাড়ি ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ানো নিয়ে বাড়ির লোকজনের মধ্যে একধরনের সিদ্ধান্তহীনতা ছিল।

১৪ এপ্রিল রাতে যখন রক্তমাখা জামাকাপড়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে কোনোমতে প্রাণ হাতে দুজন (শফিউদ্দিন ও তাঁর ভাইপো দশম শ্রেণির ছাত্র সদরুল ইসলাম) ফিরে আসেন, তখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে কারও বাকি থাকে না। তাঁরা কোনো দিন ভাবেননি, ব্রিটিশ জামানার শিক্ষক ও ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ফতেহ আলী পণ্ডিতের পরিবারের সদস্যদের প্রাণের ভয়ে ভিটামাটি ছেড়ে পালাতে হবে।

এই বাড়ির ছেলে শফিউদ্দিন ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী মুজাহিদ বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। বিপদে-আপদে তাঁদের বাড়িতে মানুষ এসে আশ্রয় নিত। আজ তাঁদেরই পথে নামতে হচ্ছে।

পাকিস্তানি হানাদারদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার জিঘাংসা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য শেষ পর্যন্ত পণ্ডিতবাড়ির লোকেরা পথে নামেন।

১৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ খাল পার হয়ে রেললাইন ডিঙিয়ে মিরপুর থানা সড়ক পাশে রেখে চন্দনা নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ান সবাই। রাতে তাঁদের নদী পার হওয়া হয় না। ঠিক হয় রাতটা কোনোমতে কাটিয়ে ভোরে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করবেন তাঁরা।

১৬ এপ্রিল সকাল। এমন সকাল যেন আর না হয়। আচমকা দূর থেকে ক্রমে কাছে আসতে থাকে ‘গান পাউডারের আগুন’। পাশাপাশি শোনা যায় অনবরত গুলির শব্দ।

সামনে নদী। কিন্তু পার হওয়ার কোনো উপায় নেই। পেছনে আগুন দিতে দিতে এগিয়ে আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

উপায়ান্তর না পেয়ে পণ্ডিতবাড়ির লোকজন নদীর পাড়ের একটা গর্তে আশ্রয় নেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, ঝোপে ঢাকা সেই গর্ত পাকিস্তানি হানাদারদের চোখ এড়িয়ে যাবে।

একসময় হানাদারেরা নদীপাড়ের ঝোপঝাড় তল্লাশি করতে করতে গর্তের কাছে এসে পড়ে। উর্দু জানা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা উর্দুতে মারমুখী হানাদারদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। বলেন, তাঁরা নিরস্ত্র। আটকা পড়ে প্রাণের ভয়ে গর্তে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা আছেন।

বারবার এই কথা হানাদারদের জানানো হয়। কিন্তু হানাদারেরা কোনো কথায় কান না দিয়ে হত্যার উল্লাসে মেতে ওঠে। হানাদারদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে ব্রাশফায়ারে নিমেষে ঝরে যায় ১৪টি তাজা প্রাণ।

পণ্ডিতবাড়ির সেই দলে সেদিন ছিলেন ২২ জন নারী-পুরুষ-শিশু। বাকিরা গুলি খাওয়া সত্ত্বেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। তাঁদের কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছেন।

সেদিন যে ১৪ জন শহীদ হন

১. শহীদ শফিউদ্দিন (৫২)। বাবা মৃত ফতেহ আলী পণ্ডিত।
২. শহীদ মশিউর রহমান (১৮)। বাবা শহীদ শফিউদ্দিন।
৩. শহীদ মীর রাবেয়া খাতুন (৪৫)। স্বামী মৃত মীর আবুল হোসেন।
৪. শহীদ মীর ডায়মন্ড (১৯)। বাবা মৃত মীর আবুল হোসেন।
৫. শহীদ মীর আক্তারুজ্জামান (২২)। বাবা মৃত মীর আবুল হোসেন।
৬. শহীদ মীর নূতন (৮)। বাবা মৃত মীর আবুল হোসেন।
৭. শহীদ নীলা (১৪)। বাবা আবদুস সাত্তার।
৮. শহীদ জালালউদ্দিন (৪৫)। বাবা মীর ফকির আহম্মেদ।
৯. শহীদ মীর সহিদা আহামেদ রুবী (২২)। বাবা শহীদ মীর জালালউদ্দিন।
১০. শহীদ মীর নবীন (১ দিন)। বাবা শহীদ মীর জালালউদ্দিন।
১১. শহীদ সেলিনা খাতুন (১৬)। বাবা মো. দলিল উদ্দিন।
১২. শহীদ জাহেদা খাতুন (৩৮)। স্বামী মো. দলিল উদ্দিন।
১৩. শহীদ ফাতেমা খাতুন (৩৪)। স্বামী মো. আতিয়ার রহমান।
১৪. শহীদ ছদরল ইসলাম (২২)। বাবা মৃত শামসুদ্দিন।

১৬ এপ্রিল দিনভর একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালাতে চালাতে সন্ধ্যা নাগাদ পাকিস্তানি হানাদারেরা কুষ্টিয়া শহরে আগুন ধরিয়ে দেয়।

১৭ এপ্রিল তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। এদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও অনুমোদিত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে তাৎক্ষণিকভাবে আয়োজিত শপথ অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা পরে মুজিবনগর নামে পরিচিতি পায়।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, ‘একাত্তরের সামাজিক ইতিহাস’
[email protected]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন