default-image

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন একজন রাজনীতি–সচেতন লেখক। তাঁর রচনায় এমন কোনো লাইন নেই, যাতে রাজনীতি খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিদ্রূপও ছিল এর অনুষঙ্গ। ঘরোয়া আড্ডায় হাসতে হাসতে সাংঘাতিক সত্য বলে ফেলতেন তিনি। তবে তাঁর রচনা কখনোই স্লোগাননির্ভর ছিল না। ইলিয়াস ছিলেন লেখকের লেখক।

বিশিষ্ট লেখক-ঔপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ৭৮তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেছেন। রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্সে আজ শুক্রবার বিকেলে ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস জন্মোৎসব’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফিটস ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানে আলোচকেরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যচর্চা ও তাঁর রচনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন কবি-লেখক ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক। একপর্যায়ে অনুষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মাহবুব বোরহান এবং এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক আবু নাসের। আলোচক হিসেবে ছিলেন ওবায়দুল্লাহ সাগর, মাসুদুল হক, আকমল হোসেন, সৌমিত্র দেব, হামীম কামরুল হক, তারিক মঞ্জুর, সঞ্জীব পুরোহিত ও ফারুক সুমন।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন আয়োজক ফিটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা। অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি বলেন, মানুষ সব সময় শিকড়ে ফিরে যায়। তাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর লেখায় সব সময় বগুড়ার গাবতলী বা সারিয়াকান্দিতে ফিরে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক তারিক মঞ্জুর বলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পাঠকের মন নিয়ে খেলতেন। তিনি আবেগবর্জিত রচনা লিখেছেন। তাঁর রচনার উপজীব্য ছিল ইতিহাস ও রাজনীতি।
কলেজশিক্ষক ও কবি ফারুক সুমনের মতে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। লেখক দুই রকমের হয়—পাঠকের লেখক ও লেখকের লেখক। ইলিয়াস ছিলেন দ্বিতীয়টি।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণা করে দর্শনের শিক্ষক মাসুদুল হক বলেন, তিনি বিদ্রূপপ্রবণ লেখক ছিলেন। ঘরোয়া আড্ডায় হাসতে হাসতে সাংঘাতিক সত্য কথা বলতেন তিনি। ইলিয়াস ছিলেন অত্যন্ত রাজনীতি–সচেতন। বাম ধারার রাজনীতির প্রতি তিনি আকৃষ্ট ছিলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হামীম কামরুল হকের মতে, বাংলাদেশের উপন্যাসকে একটি শক্ত শিরদাঁড়া দিয়েছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এ ধরনের লেখকেরা নানা ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করেন বলে তাঁদের রচনা পাঠের কাজটি একটু কঠিন হয়।

শিক্ষক, কবি ও লেখক আকমল হোসেন মনে করেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনা পাঠের জন্য যে চর্চা এ দেশে হওয়া দরকার, তা হয়ে ওঠেনি। এ চর্চার প্রচার ও প্রসার হয়নি। এটি এ দেশের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ওয়াকিবহাল মানুষদেরই ব্যর্থতা।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি আবু নাসের বলেন, ইলিয়াস সমাজতন্ত্রী ছিলেন। সমাজে বিদ্যমান শোষণ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিল তাঁর অবস্থান। আর এ দুই দিকই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মাহবুব বোরহান বলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মানুষের কথা বলেছেন। তাঁর লেখায় জীবনের কথাই উঠে এসেছে। তাঁর এমন কোনো রচনা নেই, যার একটি লাইনেও রাজনীতি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তা স্লোগাননির্ভর বা প্রোপাগান্ডামূলক ছিল না। ইলিয়াসের রচনার অন্যতম শক্তি ভাষা। তিনি শিল্পমূল্যের কথা ভাবেননি, বরং জীবনকে ভাষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

‘খোয়াবনামা’কে বাংলা ভাষা ও পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে অভিহিত করে কবি ও লেখক আনিসুল হক বলেন, শিল্পের একটা মগ্নতা লাগে, জেদ লাগে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের তা ছিল। তাঁর গল্পে সেন্স অব হিউমারের ব্যবহার ছিল দারুণ। ব্যক্তি হিসেবেও সে গুণ ছিল তাঁর। বাংলা ভাষার ধারণ করার ক্ষমতাকে বাড়ানোর পরীক্ষা তিনি করেছিলেন। আনিসুল হক আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি তিনি (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) শুরু করেছিলেন। তা আর লিখে যেতে পারেননি। এই আক্ষেপ আমাদের রয়ে যাবে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন