default-image

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আর ভারতের ঘনিষ্ঠতার শুরু। গত ৫০ বছরে নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এক দশকে এই সম্পর্ক এখন বিশেষ পর্যায়ে। তাই গত পাঁচ দশকের সম্পর্কের মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের পথনকশা কেমন হবে, সেটাই ঠিক করতে চায় দুই দেশ। আগামীকাল শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁদের একান্ত আর সহযোগীদের নিয়ে বসে সম্পর্কের ভবিষ্যতের ছবিটা কেমন হতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত দেবেন।

সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, দুই প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আলোচনাতে সম্পর্কের অতীত পর্যালোচনা করবেন। সেই সঙ্গে আগামী এক–দুই দশকে সম্পর্কটাকে কোথায় দেখতে চান, তা নিয়ে কথা বলবেন। দ্বিপক্ষীয় ওই বৈঠকে সইয়ের জন্য চারটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে।

সইয়ের জন্য তৈরি হওয়া সমঝোতা স্মারকগুলো হচ্ছে দুর্যোগ দমনে সহযোগিতা, ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশে অশুল্ক বাধা দূরের পদক্ষেপ, তথ্য–যোগাযোগ এবং রাজশাহীতে খেলার মাঠ বিষয়ে দুই প্রকল্প বাস্তবায়ন। তবে শেষ মুহূর্তে এই সংখ্যা বাড়তে পারে বলে সরকারের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের সফরে আজ শুক্রবার সকালে ঢাকায় এসেছেন। আজ বিকেলে তিনি জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে মুজিব চিরন্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধু–বাপু ডিজিটাল জাদুঘর।

সফরের দ্বিতীয় দিনে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রী একান্তে আলোচনা করবেন।
বাংলাদেশের কূটনীতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত এক দশকে ভারতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দূর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সহযোগিতা করেছে। যা দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তাই সম্পর্কের ভবিষ্যতের স্বার্থে বাংলাদেশ এখন ব্যবসা–বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর বাণিজ্য বাড়াতে হলে সংযুক্তি অপরিহার্য। আর সংযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সহযোগিতাটা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমিত না রেখে নেপাল ও ভুটানকেও যুক্ত করতে চায়। কারণ, একসঙ্গে চার দেশের উন্নতি একটি নতুন দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন গত বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেপালের প্রেসিডেন্ট ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় সংযুক্তিতে বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনাতেও প্রসঙ্গটি তুলবেন।

দুই শীর্ষ নেতার আলোচনায় সংযুক্তি, ব্যবসার পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও প্রাধান্য পাবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

সংযুক্তির কেন্দ্রে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় ভারত সাম্প্রতিক সময়ে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মনোযোগী। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক, রেল, নৌ আর সমুদ্রপথে ভারতের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সংযুক্তির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছে। তাই বাংলাদেশ দুই দেশের বিদ্যমান নৌ প্রটোকলের আওতায় নেপালকে এ দেশের নৌপথ ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করতে দিতে চায়। এর পাশাপাশি ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভুটানে পণ্য পরিবহন করতে চায়। এমন এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভারতকে সড়ক ও রেলপথে নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে সংযুক্তির জন্য পাঁচটি রুটে পণ্যবাহী যান চলাচলের অনুরোধ জানিয়েছে। ঢাকার বৈঠকে বিষয়টি তুলে তা দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ। সড়কপথে নেপালের জন্য মেছিনগর, বিরাটনগর, বীরগঞ্জ ও রেলপথে রোহনপুর-সিংহাবাদে অনুমতির অনুরোধ জানিয়েছে। আর ভুটানের সঙ্গে রেলপথে চিলাহাটি-হলদিবাড়ীতে যুক্ত হতে অনুমতির অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ঢাকার কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, নেপাল ও ভুটানের পাশাপাশি বাংলাদেশ এ অঞ্চলের অন্য দেশ মিয়ানমারের সঙ্গেও সংযুক্তিতে আগ্রহী। এই লক্ষ্য থেকে সম্প্রতি ভারতকে ত্রিদেশীয় মহাসড়কে যুক্ত হতে আগ্রহী দেখিয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে, ভারতের সহযোগিতায় থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সঙ্গে ওই নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া সহজ হবে।

উদ্বোধন হবে যে প্রকল্পগুলো

দুই নিকট প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীদের আলোচনার পর এখন পর্যন্ত আটটি প্রকল্প উদ্বোধনের কথা রয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু–বাপু ডিজিটাল জাদুঘর উদ্বোধন হবে আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে।

এছাড়া অন্য সাতটি প্রকল্প কাল শনিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আলোচনা শেষে উদ্বোধন করা হবে। এই প্রকল্পগুলো হচ্ছে শিলাইদহের সংস্কারকৃত কুঠিবাড়ি, মেহেরপুরের মুজিবনগর থেকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া হয়ে কলকাতা পর্যন্ত স্বাধীনতা সড়ক, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসমাধি, বাংলাদেশের কাছে ভারতের ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর, চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন, দুটি সীমান্ত হাট এবং স্মারক ডাকটিকিটের মোড়ক উন্মোচন।

তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে প্রক্রিয়াগত সমস্যা থাকায় স্বাধীনতা সড়কে চলাচল এবং চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রুটে যাত্রীবাহী ট্রেনে যাতায়াত শুরু হতে কিছুদিন সময় লাগবে বলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন