default-image

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্গো শাখা থেকে ছয় বছরে লোপাট হয়েছে প্রায় ১১৮ কোটি টাকা। কার্গো শাখার কিছু কর্মকর্তা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য আদায়যোগ্য ওই মাশুল আদায় করেননি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে বিমানের নিরীক্ষা বিভাগের অনুসন্ধানেও কার্গো শাখায় এই জালিয়াতির তথ্য এসেছিল। এরপর বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি এই খাতে ৪১২ কোটি টাকার লোপাটের তথ্য পেয়েছিল। তারপরও এর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিমান কর্তৃপক্ষ উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা বা লুটপাট হওয়া টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা নেয়নি। তখন সংবাদমাধ্যমে খবর বের হওয়ার পর দু-একজনকে লোকদেখানো বদলি করা হয় মাত্র। আবার কেউ কেউ বিদেশে ভালো নিয়োগ পেয়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধান শেষে আজ মঙ্গলবার এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সাবেক পরিচালক আলী আহসান ওরফে বাবু ও কার্গো শাখার সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ইফতেখার হোসেন চৌধুরী।

মামলার এজাহারে বলা হয়, কার্গো শাখায় ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় কার্গো শাখার তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ছিলেন মো. আলী আহসান। বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় এই লোপাটের ঘটনা উদ্‌ঘাটন হওয়ার পর ২০১৭ সালের এপ্রিলে মো. আলী আহসানকে এই শাখা থেকে বদলি করে আরও বড় পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। করা হয় বিক্রয় ও বিপণন শাখার পরিচালক।

২০১২ থেকে ২০১৭ সালে এই লোপাটের জন্য অভিযুক্ত অন্য আসামিদের মধ্যে এখনো বিমানে কর্মরত কার্গো শাখার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক মো. আরিফ উল্লাহ, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে সৌদি আরবের দাম্মামে কান্ট্রি ম্যানেজার মো. শহিদুল ইসলাম, সৌদি আরবের রিয়াদে রিজিওনাল ম্যানেজার আমিনুল হক ভূঁইয়া এবং কার্গো আমদানি শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক মো. ফজলুল হক।

তাঁদের মধ্যে মো. আরিফ উল্লাহর বিদেশযাত্রা রহিত করতে গত মে মাসে ইমিগ্রেশন পুলিশকে চিঠি দিয়েছিল দুদক। এই নিষেধজ্ঞার পরও তিনি দেশ ছেড়ে গেছেন বলে জানা গেছে। কীভাবে তিনি দেশের বাইরে গেলেন—এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দুদকের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।

মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক মো. লুতফে জামাল, মোশাররফ হোসেন তালুকদার, রাজীব হাসান, নাসির উদ্দীন তালুকদার, অনুপ কুমার বড়ুয়া, কে এন আলম, সৈয়দ আহমেদ পাটওয়ারী, মনির আহমেদ মজুমদার, এ কে এম মনজুরুল হক ও মো. শাহজাহান অবসরে চলে গেছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ছয় বছরে অনির্ধারিত মালবাহী ফ্লাইটে (ননশিডিউল ফ্রেইটার) আসা এবং বিদেশে যাওয়া মালামাল থেকে আদায়যোগ্য মাশুল ১ কোটি ৫০ লাখ ৯৩ হাজার মার্কিন ডলার (১১৮ কোটি টাকার বেশি) বিমানের কোষাগারে জমা পড়েনি। আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে সরকারের ওই পরিমাণ অর্থ আদায় না করে বিমান তথা সরকারের ক্ষতিসাধন করেন।

default-image

যেভাবে লোপাট হয়েছে অর্থ

বিমানের কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের ক্ষেত্রে অনির্ধারিত মালবাহী ফ্লাইটে আসা এবং বিদেশে যাওয়া মালামালের জন্য আদায়যোগ্য মাশুল নির্ধারিত আছে। এর বাইরে অতিরিক্ত একটি মাশুলও আছে। বিষয়টি সবাই জানলেও মাত্র কয়েকটি বাদে অধিকাংশ ননশিডিউল ফ্রেইটারের কাছ থেকে কোনো মাশুল আদায় করা হয়নি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত নিরীক্ষায়ও মাশুল আদায় না হওয়ার বিষয়টি উদ্‌ঘাটিত হয়। এর জন্য কার্গো শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়। এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন যখন জমা দেওয়া হয়, তখন প্রধান অভিযুক্ত মো. আলী আহসান ছিলেন বিমানের বিপণন ও বিক্রয় শাখার পরিচালক। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়টি সংবাদপত্রে প্রকাশ পাওয়ার পর তাঁকে চলতি বছরের মে মাসে যাত্রীসেবা শাখার পরিচালক পদে বদলি করা হয়। এর আগে তিনি ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মহাব্যবস্থাপক (কার্গো) ছিলেন।

গত বছরের ২৪ জুলাই কার্গো শাখার এই দুর্নীতির বিষয়ে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আলী আহসান দাবি করেছিলেন, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিষয়টি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কী হারে মাশুল আদায় করা হবে, তার একটা দর থাকতে হয়। কিন্তু মাশুল আদায়ের জন্য কোনো সার্কুলার ছিল না।

তবে আলী আহসানের এই তথ্য ঠিক নয়। সার্কুলার ছিল, যার ভিত্তিতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে মাশুল আদায় হয়েছে এবং তা কোষাগারে জমা পড়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনেই বলা আছে। এ তথ্য জানালে তখন আলী আহসান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বিভিন্ন সময়ে অ্যাডহক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একেক দরে তাঁরা মাশুল আদায় করে থাকেন। চট্টগ্রামে হয়তো সেভাবে আদায় হয়েছে। এখন ঢাকায়ও আদায় করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জনেন্দ্র নাথ সরকারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্গো শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বিমান পরিচালনা পর্ষদের কাছে পাঠানো হলেও দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা এবং টাকা আদায়ের কোনো চেষ্টা-উদ্যোগ নেয়নি বিমান কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক আজ প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ৪১২ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিমান পরিচালনা পর্ষদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। যেসব ফ্রেইটারের কাছে টাকা অনাদায়ি আছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পরিচালনা পর্ষদের।

সচিব মো. মহিবুল হক নিজে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানাতে পারেননি। বিমানের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মোকাব্বির হোসেনও তদন্তের সময় একই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। তিনি এখন দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে মো. মহিবুল হক বলেন, একসময় বিমানে কোনো জবাবদিহি ছিল না। ধীরে ধীরে জবাবদিহি ফিরে আসছে। অনিয়মের অভিযোগে সাবেক এমডির বিরুদ্ধেও কয়েক দিন আগে মামলা হয়েছে। দুর্নীতিবাজেরা আইনের আওতায় আসছে। আর সরকারের টাকা যারা আত্মসাৎ করেছে, তাদের কাছ থেকে ওই টাকা উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0